ঢাকা , মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬, ৬ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম ::
জামায়াত নেতার ভাইরাল ভিডিওটি এআই নয়, আসল: রিউমর স্ক্যানার জামায়াতের এমপির ভাইরাল ভিডিও নিয়ে যা জানা যাচ্ছে ব্যর্থতা অনেক গভীর, এই ক্ষত সারতে সময় লাগবে: মেসি সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানি অর্ধেকে নামিয়ে আনার অঙ্গীকার বাংলাদেশের কুয়েতে ব্যাপক হামলা ইরানের, মার্কিন রাডার ও ঘাঁটি ধ্বংসের দাবি আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে তদন্তে নামছে ফিফা, বড় নিষেধাজ্ঞার শঙ্কা লক্ষ্মীপুরে বিশ্বকাপ ফাইনাল খেলা দেখতে বাধা দেওয়ায় স্ত্রীকে বেধড়ক পিটুনি বীরের বেশে দেশে ফিরল বিশ্বচ্যাম্পিয়ন স্পেন, রাজকীয় সংবর্ধনা স্পেনের জয়ে ‘মালামাল’ মিয়া খালিফাও, আয় করলেন ১৬ কোটি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি বুঝতে ঢাকায় আসছেন মার্কিন বিশেষ দূত

আর্জেন্টিনাকে কাঁদানো ফেরান তোরেসের জীবনের গল্প

  • ডেস্ক রিপোর্ট
  • আপডেট সময় ১০:২৮:১২ অপরাহ্ন, সোমবার, ২০ জুলাই ২০২৬
  • ৯ বার পড়া হয়েছে

বিশ্বকাপ ফাইনালের মঞ্চে নায়ক হওয়ার গল্প অনেক ফুটবলারেরই থাকে। তবে ফেরান তোরেসের গল্পটা যেন সিনেমার চিত্রনাট্য। দুই বিশ্বকাপ মিলিয়ে তার গোল সংখ্যা মোটে তিনটি। তার মধ্যে কাতার বিশ্বকাপে দুটি; বাকি একটি গোল গতকালের ফাইনালে, যা রূপকথার জন্ম দিয়ে নায়ক বানিয়েছে তাকে। পুরো টুর্নামেন্টজুড়ে সমালোচনার মুখে থাকা, একাদশে জায়গা হারানো এবং আত্মবিশ্বাসের সংকটে ভোগা সেই খেলোয়াড়ই শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপ ফাইনালে গোলে করে লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনার স্বপ্ন ভেঙে স্পেনকে এনে দিয়েছেন বিশ্বসেরার মুকুট।

 

২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের ফাইনালে অতিরিক্ত সময়ের ১০৬তম মিনিটে ফেরান তোরেসের একমাত্র গোলে আর্জেন্টিনাকে ১-০ ব্যবধানে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয় স্পেন। বদলি হিসেবে মাঠে নেমে করা তার সেই ঐতিহাসিক গোলই তাকে রাতারাতি সমালোচিত খেলোয়াড় থেকে জাতীয় বীরে পরিণত করেছে।

 

স্থানীয় সময় রোববার (১৯ জুলাই) যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের নিউজার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ফাইনালে নির্ধারিত ৯০ মিনিটে কোনো দলই গোলের দেখা পায়নি। আর্জেন্টিনার গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্টিনেজ একের পর এক আক্রমণ ঠেকিয়ে যাচ্ছিলেন। ম্যাচ যখন টাইব্রেকারের দিকে এগোচ্ছিল, তখনই নিকো উইলিয়ামসের পাস থেকে দুর্দান্ত হাফ-ভলিতে বল জালে পাঠান তোরেস। তার সেই এক শটেই বদলে যায় ম্যাচের ভাগ্য।

 

 

তোরেসের গোল শুধু স্পেনকে বিশ্বকাপ জেতায়নি, শেষ করে দিয়েছে আর্জেন্টিনার স্বপ্নও। ২০২২ বিশ্বকাপ জয়ী এবং টানা তিনবারের কোপা আমেরিকা চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার আধিপত্যের ইতি ঘটে ওই এক গোলেই। বিশ্বকাপের শেষ ম্যাচে ৩৯ বছর বয়সী লিওনেল মেসির দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্নও ভেঙে যায়।

 

 

রোনালদো জানতেন স্পেন অনায়াসেই জিতবে

 

 

ম্যাচ শেষে মাঠে আর্জেন্টিনা খেলোয়াড়দের হতাশা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ট্রফি হাতছাড়া হওয়ার বেদনায় মেসির নীরবে মাঠে বসে থাকার দৃশ্য ফুটবলপ্রেমীদের হৃদয় ছুঁয়ে যায়। ফাইনালের পর তোরেস বলেন, ‘ফাইনাল ম্যাচ সবসময় কঠিন হয়। আর প্রতিপক্ষ দলে যখন মেসির মতো খেলোয়াড় থাকে, তখন ভয় তো থাকেই। কিন্তু আজ মনে হয়েছে, আমাদের ভাগ্য আগেই লেখা ছিল।’

 

 

ফোইওসের ছোট্ট শহর থেকে বিশ্বকাপের মঞ্চে

 

 

ফেরান তোরেসের জন্ম স্পেনের ভ্যালেন্সিয়া প্রদেশের ছোট্ট শহর ফোইওসে। ২০০০ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি জন্ম নেওয়া তোরেস অধিবর্ষের সন্তান, ফলে চার বছর পরপর আসে তার জন্মদিন। ছোটবেলা থেকেই ফুটবলের প্রতি তার ছিল প্রবল আগ্রহ। দাদার কাছ থেকেই বাড়ির বাগানে প্রথম ফুটবলের পাঠ নেন তিনি। মাত্র ছয় বছর বয়সে স্থানীয় ইপিএলএ স্কুলে ফুটসাল খেলার মাধ্যমে শুরু হয় তার আনুষ্ঠানিক ফুটবল যাত্রা।

 

 

তার প্রতিভা নজর কাড়ে ভ্যালেন্সিয়া ক্লাবের। মাত্র ছয় বছর বয়সে ক্লাবটির যুব একাডেমিতে যোগ দেন তিনি। দীর্ঘ এক দশক বয়সভিত্তিক দলে কাটানোর পর ২০১৬ সালের ১৫ অক্টোবর মায়োর্কা বি দলের বিপক্ষে সিনিয়র দলে অভিষেক হয় তার।

 

 

পরের বছর ১৬ ডিসেম্বর রিয়াল এইবারের বিপক্ষে লা লিগায় অভিষেকের মাধ্যমে ইতিহাস গড়েন তোরেস। ২০০০ সালের পর জন্ম নেওয়া প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে স্পেনের শীর্ষ লিগে মাঠে নামেন তিনি। ভ্যালেন্সিয়ার হয়ে ২০১৯ সালে কোপা দেল রে শিরোপাও জেতেন এই ফরোয়ার্ড।

 

 

গার্দিওলার অধীনে পরিবর্তন

 

 

২০২০ সালে ফেরান তোরেস যোগ দেন ইংলিশ জায়ান্ট ম্যানচেস্টার সিটিতে। কোচ পেপ গার্দিওলার অধীনে উইঙ্গার থেকে আরও কার্যকর ফরোয়ার্ডে পরিণত হন তিনি। সিটির হয়ে প্রিমিয়ার লিগ ও ইএফএল কাপ জয়ের স্বাদ পান।

 

 

তবে ইংল্যান্ডের সময়টা পুরোপুরি সুখকর ছিল না। করোনা মহামারি ও চোটের কারণে নিজের সেরা ছন্দ ধরে রাখতে পারেননি তিনি। সেই কঠিন সময়ে বোন আরান্তক্সা তাকে মানসিক শক্তি জোগান। নিজেদের লড়াইয়ের প্রতীক হিসেবে তারা গোড়ালিতে নোঙরের ট্যাটু করান। যার অর্থ—‘আমি ডুবতে রাজি নই।’

 

 

বার্সেলোনায় ব্যর্থতা ও ‘দ্য শার্ক’ হয়ে ফিরে আসা

 

২০২২ সালের জানুয়ারিতে ৫৫ মিলিয়ন ইউরোর বিনিময়ে বার্সেলোনা ফেরান তোরেসকে ফিরিয়ে আনে। কিন্তু ক্যাম্প ন্যুতে তার শুরুটা ছিল কঠিন। গোলের সুযোগ নষ্ট, ফর্মহীনতা এবং প্রত্যাশার চাপ তাকে ঘিরে সমালোচনার জন্ম দেয়। অনেক সময় সমর্থকদের কাছ থেকেও শুনতে হয় নেতিবাচক মন্তব্য।

 

এই কঠিন পরিস্থিতিতে মানসিকভাবে ঘুরে দাঁড়াতে স্পোর্টস সাইকোলজিস্টের সাহায্য নেন তোরেস। তিনি নিজেই জানিয়েছিলেন, একসময় নিজেকে এমন এক অবস্থায় পেয়েছিলেন, যেখান থেকে বের হওয়ার পথ খুঁজে পাচ্ছিলেন না।

 

তোরেস বলেন, ‘আমি আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছিলাম। সবকিছু আমাকে প্রভাবিত করছিল। তখনই একজন মনোবিজ্ঞানীর সঙ্গে কাজ করার সিদ্ধান্ত নিই।’

 

মনোবিজ্ঞানীর সহায়তায় নিজের মানসিকতা বদলে ফেলেন তিনি। গোল করার অতিরিক্ত চাপ থেকে বেরিয়ে নিজের স্বাভাবিক খেলায় ফিরতে শেখেন। নিজের নতুন মানসিকতার নাম দেন ‘এল তিবুরন’ বা ‘দ্য শার্ক’—অর্থাৎ হাঙরের মতো লড়াই করার মানসিকতা।

 

এরপর ধীরে ধীরে বার্সেলোনায় নিজের জায়গা ফিরে পান তিনি। ২০২৪-২৫ মৌসুমে ক্লাবের ঘরোয়া ট্রেবল জয়ে ভূমিকা রাখেন এবং পরের মৌসুমে ২১ গোল করে ক্যারিয়ারের সেরা মৌসুম কাটান।

 

সমালোচিত খেলোয়াড় থেকে বিশ্বকাপের নায়ক

২০২০ সালে জাতীয় দলে অভিষেক হওয়া তোরেস এর আগে ইউরো ২০২৪ জয়ী দলের সদস্য ছিলেন। তবে বিশ্বকাপ ফাইনালের গোলই হয়ে ওঠে তার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় অর্জন। কিন্তু বিশ্বকাপে তোরেসের শুরুটা ছিল হতাশার। লামিনে ইয়ামাল ও নিকো উইলিয়ামসের দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের কারণে মূল একাদশে জায়গা হারান তিনি। বেশিরভাগ ম্যাচেই তাকে বদলি হিসেবে মাঠে নামতে হয়েছে।

 

গ্রুপ পর্বে একাধিক গোলের সুযোগ নষ্ট করায় সমালোচনার মুখে পড়েন তিনি। তার ফিনিশিং, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা এবং মাঠের পারফরম্যান্স নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। কিন্তু ফাইনালের সেই একটি মুহূর্ত সবকিছু বদলে দেয়। আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ১০৬তম মিনিটের গোল তাকে স্পেনের ইতিহাসে বিশেষ জায়গা এনে দেয়।

 

খেলা শেষে তোরেস বলেন, ‘গোল করে বিরাট স্বস্তি পেয়েছি। পুরো টুর্নামেন্ট জুড়েই আমি সমালোচিত হয়েছি, কিন্তু আগেও যেমনটা বলেছি, ভাগ্য লেখাই ছিল।’

 

অন্য এক তোরেস

মাঠের বাইরে ফেরান তোরেস একজন বড় পশুপ্রেমী। গৃহহীন ও অবহেলিত কুকুরদের পুনর্বাসনে কাজ করা ‘ওয়াইল্ড অ্যাট হার্ট ফাউন্ডেশন’-এর সঙ্গে যুক্ত তিনি। নিজের পোষা কুকুর মিন্নি ও লুনার সঙ্গে সময় কাটানো তার মানসিক শান্তির অন্যতম মাধ্যম। তোরেসের মতে, কুকুরদের ড্রিবলিং করে কাটানোর এই খেলাই ছোটবেলায় তার ফুটবল দক্ষতা বাড়াতে সাহায্য করেছিল।

 

ফুটবলে তার শৈশবের আদর্শ ছিলেন স্পেনের সাবেক স্ট্রাইকার ডেভিড ভিয়া। ভ্যালেন্সিয়ার কিংবদন্তি গাইৎসকা মেন্দিয়েতার নামেও ছোটবেলায় নিজের প্রথম জার্সি তৈরি করেছিলেন তিনি।

 

একসময় যাকে ঘিরে ছিল হতাশা ও সমালোচনা, সেই ফেরান তোরেসই এখন স্পেনের বিশ্বজয়ের নায়ক। তার গল্প মনে করিয়ে দেয়—ফুটবলে কখনো কখনো একটি মুহূর্তই বদলে দিতে পারে পুরো ক্যারিয়ার।

ট্যাগস

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

জনপ্রিয় সংবাদ

জামায়াত নেতার ভাইরাল ভিডিওটি এআই নয়, আসল: রিউমর স্ক্যানার

আর্জেন্টিনাকে কাঁদানো ফেরান তোরেসের জীবনের গল্প

আপডেট সময় ১০:২৮:১২ অপরাহ্ন, সোমবার, ২০ জুলাই ২০২৬

বিশ্বকাপ ফাইনালের মঞ্চে নায়ক হওয়ার গল্প অনেক ফুটবলারেরই থাকে। তবে ফেরান তোরেসের গল্পটা যেন সিনেমার চিত্রনাট্য। দুই বিশ্বকাপ মিলিয়ে তার গোল সংখ্যা মোটে তিনটি। তার মধ্যে কাতার বিশ্বকাপে দুটি; বাকি একটি গোল গতকালের ফাইনালে, যা রূপকথার জন্ম দিয়ে নায়ক বানিয়েছে তাকে। পুরো টুর্নামেন্টজুড়ে সমালোচনার মুখে থাকা, একাদশে জায়গা হারানো এবং আত্মবিশ্বাসের সংকটে ভোগা সেই খেলোয়াড়ই শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপ ফাইনালে গোলে করে লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনার স্বপ্ন ভেঙে স্পেনকে এনে দিয়েছেন বিশ্বসেরার মুকুট।

 

২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের ফাইনালে অতিরিক্ত সময়ের ১০৬তম মিনিটে ফেরান তোরেসের একমাত্র গোলে আর্জেন্টিনাকে ১-০ ব্যবধানে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয় স্পেন। বদলি হিসেবে মাঠে নেমে করা তার সেই ঐতিহাসিক গোলই তাকে রাতারাতি সমালোচিত খেলোয়াড় থেকে জাতীয় বীরে পরিণত করেছে।

 

স্থানীয় সময় রোববার (১৯ জুলাই) যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের নিউজার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ফাইনালে নির্ধারিত ৯০ মিনিটে কোনো দলই গোলের দেখা পায়নি। আর্জেন্টিনার গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্টিনেজ একের পর এক আক্রমণ ঠেকিয়ে যাচ্ছিলেন। ম্যাচ যখন টাইব্রেকারের দিকে এগোচ্ছিল, তখনই নিকো উইলিয়ামসের পাস থেকে দুর্দান্ত হাফ-ভলিতে বল জালে পাঠান তোরেস। তার সেই এক শটেই বদলে যায় ম্যাচের ভাগ্য।

 

 

তোরেসের গোল শুধু স্পেনকে বিশ্বকাপ জেতায়নি, শেষ করে দিয়েছে আর্জেন্টিনার স্বপ্নও। ২০২২ বিশ্বকাপ জয়ী এবং টানা তিনবারের কোপা আমেরিকা চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার আধিপত্যের ইতি ঘটে ওই এক গোলেই। বিশ্বকাপের শেষ ম্যাচে ৩৯ বছর বয়সী লিওনেল মেসির দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্নও ভেঙে যায়।

 

 

রোনালদো জানতেন স্পেন অনায়াসেই জিতবে

 

 

ম্যাচ শেষে মাঠে আর্জেন্টিনা খেলোয়াড়দের হতাশা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ট্রফি হাতছাড়া হওয়ার বেদনায় মেসির নীরবে মাঠে বসে থাকার দৃশ্য ফুটবলপ্রেমীদের হৃদয় ছুঁয়ে যায়। ফাইনালের পর তোরেস বলেন, ‘ফাইনাল ম্যাচ সবসময় কঠিন হয়। আর প্রতিপক্ষ দলে যখন মেসির মতো খেলোয়াড় থাকে, তখন ভয় তো থাকেই। কিন্তু আজ মনে হয়েছে, আমাদের ভাগ্য আগেই লেখা ছিল।’

 

 

ফোইওসের ছোট্ট শহর থেকে বিশ্বকাপের মঞ্চে

 

 

ফেরান তোরেসের জন্ম স্পেনের ভ্যালেন্সিয়া প্রদেশের ছোট্ট শহর ফোইওসে। ২০০০ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি জন্ম নেওয়া তোরেস অধিবর্ষের সন্তান, ফলে চার বছর পরপর আসে তার জন্মদিন। ছোটবেলা থেকেই ফুটবলের প্রতি তার ছিল প্রবল আগ্রহ। দাদার কাছ থেকেই বাড়ির বাগানে প্রথম ফুটবলের পাঠ নেন তিনি। মাত্র ছয় বছর বয়সে স্থানীয় ইপিএলএ স্কুলে ফুটসাল খেলার মাধ্যমে শুরু হয় তার আনুষ্ঠানিক ফুটবল যাত্রা।

 

 

তার প্রতিভা নজর কাড়ে ভ্যালেন্সিয়া ক্লাবের। মাত্র ছয় বছর বয়সে ক্লাবটির যুব একাডেমিতে যোগ দেন তিনি। দীর্ঘ এক দশক বয়সভিত্তিক দলে কাটানোর পর ২০১৬ সালের ১৫ অক্টোবর মায়োর্কা বি দলের বিপক্ষে সিনিয়র দলে অভিষেক হয় তার।

 

 

পরের বছর ১৬ ডিসেম্বর রিয়াল এইবারের বিপক্ষে লা লিগায় অভিষেকের মাধ্যমে ইতিহাস গড়েন তোরেস। ২০০০ সালের পর জন্ম নেওয়া প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে স্পেনের শীর্ষ লিগে মাঠে নামেন তিনি। ভ্যালেন্সিয়ার হয়ে ২০১৯ সালে কোপা দেল রে শিরোপাও জেতেন এই ফরোয়ার্ড।

 

 

গার্দিওলার অধীনে পরিবর্তন

 

 

২০২০ সালে ফেরান তোরেস যোগ দেন ইংলিশ জায়ান্ট ম্যানচেস্টার সিটিতে। কোচ পেপ গার্দিওলার অধীনে উইঙ্গার থেকে আরও কার্যকর ফরোয়ার্ডে পরিণত হন তিনি। সিটির হয়ে প্রিমিয়ার লিগ ও ইএফএল কাপ জয়ের স্বাদ পান।

 

 

তবে ইংল্যান্ডের সময়টা পুরোপুরি সুখকর ছিল না। করোনা মহামারি ও চোটের কারণে নিজের সেরা ছন্দ ধরে রাখতে পারেননি তিনি। সেই কঠিন সময়ে বোন আরান্তক্সা তাকে মানসিক শক্তি জোগান। নিজেদের লড়াইয়ের প্রতীক হিসেবে তারা গোড়ালিতে নোঙরের ট্যাটু করান। যার অর্থ—‘আমি ডুবতে রাজি নই।’

 

 

বার্সেলোনায় ব্যর্থতা ও ‘দ্য শার্ক’ হয়ে ফিরে আসা

 

২০২২ সালের জানুয়ারিতে ৫৫ মিলিয়ন ইউরোর বিনিময়ে বার্সেলোনা ফেরান তোরেসকে ফিরিয়ে আনে। কিন্তু ক্যাম্প ন্যুতে তার শুরুটা ছিল কঠিন। গোলের সুযোগ নষ্ট, ফর্মহীনতা এবং প্রত্যাশার চাপ তাকে ঘিরে সমালোচনার জন্ম দেয়। অনেক সময় সমর্থকদের কাছ থেকেও শুনতে হয় নেতিবাচক মন্তব্য।

 

এই কঠিন পরিস্থিতিতে মানসিকভাবে ঘুরে দাঁড়াতে স্পোর্টস সাইকোলজিস্টের সাহায্য নেন তোরেস। তিনি নিজেই জানিয়েছিলেন, একসময় নিজেকে এমন এক অবস্থায় পেয়েছিলেন, যেখান থেকে বের হওয়ার পথ খুঁজে পাচ্ছিলেন না।

 

তোরেস বলেন, ‘আমি আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছিলাম। সবকিছু আমাকে প্রভাবিত করছিল। তখনই একজন মনোবিজ্ঞানীর সঙ্গে কাজ করার সিদ্ধান্ত নিই।’

 

মনোবিজ্ঞানীর সহায়তায় নিজের মানসিকতা বদলে ফেলেন তিনি। গোল করার অতিরিক্ত চাপ থেকে বেরিয়ে নিজের স্বাভাবিক খেলায় ফিরতে শেখেন। নিজের নতুন মানসিকতার নাম দেন ‘এল তিবুরন’ বা ‘দ্য শার্ক’—অর্থাৎ হাঙরের মতো লড়াই করার মানসিকতা।

 

এরপর ধীরে ধীরে বার্সেলোনায় নিজের জায়গা ফিরে পান তিনি। ২০২৪-২৫ মৌসুমে ক্লাবের ঘরোয়া ট্রেবল জয়ে ভূমিকা রাখেন এবং পরের মৌসুমে ২১ গোল করে ক্যারিয়ারের সেরা মৌসুম কাটান।

 

সমালোচিত খেলোয়াড় থেকে বিশ্বকাপের নায়ক

২০২০ সালে জাতীয় দলে অভিষেক হওয়া তোরেস এর আগে ইউরো ২০২৪ জয়ী দলের সদস্য ছিলেন। তবে বিশ্বকাপ ফাইনালের গোলই হয়ে ওঠে তার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় অর্জন। কিন্তু বিশ্বকাপে তোরেসের শুরুটা ছিল হতাশার। লামিনে ইয়ামাল ও নিকো উইলিয়ামসের দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের কারণে মূল একাদশে জায়গা হারান তিনি। বেশিরভাগ ম্যাচেই তাকে বদলি হিসেবে মাঠে নামতে হয়েছে।

 

গ্রুপ পর্বে একাধিক গোলের সুযোগ নষ্ট করায় সমালোচনার মুখে পড়েন তিনি। তার ফিনিশিং, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা এবং মাঠের পারফরম্যান্স নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। কিন্তু ফাইনালের সেই একটি মুহূর্ত সবকিছু বদলে দেয়। আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ১০৬তম মিনিটের গোল তাকে স্পেনের ইতিহাসে বিশেষ জায়গা এনে দেয়।

 

খেলা শেষে তোরেস বলেন, ‘গোল করে বিরাট স্বস্তি পেয়েছি। পুরো টুর্নামেন্ট জুড়েই আমি সমালোচিত হয়েছি, কিন্তু আগেও যেমনটা বলেছি, ভাগ্য লেখাই ছিল।’

 

অন্য এক তোরেস

মাঠের বাইরে ফেরান তোরেস একজন বড় পশুপ্রেমী। গৃহহীন ও অবহেলিত কুকুরদের পুনর্বাসনে কাজ করা ‘ওয়াইল্ড অ্যাট হার্ট ফাউন্ডেশন’-এর সঙ্গে যুক্ত তিনি। নিজের পোষা কুকুর মিন্নি ও লুনার সঙ্গে সময় কাটানো তার মানসিক শান্তির অন্যতম মাধ্যম। তোরেসের মতে, কুকুরদের ড্রিবলিং করে কাটানোর এই খেলাই ছোটবেলায় তার ফুটবল দক্ষতা বাড়াতে সাহায্য করেছিল।

 

ফুটবলে তার শৈশবের আদর্শ ছিলেন স্পেনের সাবেক স্ট্রাইকার ডেভিড ভিয়া। ভ্যালেন্সিয়ার কিংবদন্তি গাইৎসকা মেন্দিয়েতার নামেও ছোটবেলায় নিজের প্রথম জার্সি তৈরি করেছিলেন তিনি।

 

একসময় যাকে ঘিরে ছিল হতাশা ও সমালোচনা, সেই ফেরান তোরেসই এখন স্পেনের বিশ্বজয়ের নায়ক। তার গল্প মনে করিয়ে দেয়—ফুটবলে কখনো কখনো একটি মুহূর্তই বদলে দিতে পারে পুরো ক্যারিয়ার।