ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ০৮ অক্টোবর ২০২৬, ২২ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম ::
এক সমুদ্রে দুই নিয়ম, নিষেধাজ্ঞা নিয়ে জেলেদের যত ক্ষোভ ১৭ বছর ধরে ক্ষুধার্ত বিএনপি এখন পারলে যেন পুরো বাংলাদেশকেই গিলে ফেলে: সাদিক কায়েম ‘যে দলের জন্য জীবন-যৌবন শেষ করলাম, সেই দল আমাকে বহিষ্কার করল-আলহামদুলিল্লাহ’ ইসরায়েলের বর্বরতা: ২১ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি শিক্ষক-শিক্ষার্থী নিহত মামদানি মেয়র হওয়ার বছরেই বিশ্বের এক নম্বর শহর নিউইয়র্ক গুলশান লেকই যদি ঠিক করতে না পারি, সারাদেশ কীভাবে ঠিক করব: গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী রাজনীতিতে মতপার্থক্য, গঠনমূলক সমালোচনা ও শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য: রাষ্ট্রপতি ফ্যামিলি কার্ডের জন্য টিপসই নিয়ে বিধবার ভুয়া কাবিননামা তৈরির অভিযোগ সালমান মুক্তাদিরকে জিজ্ঞাসাবাদে মিলতে পারে অনেক প্রশ্নের উত্তর ঢাবি ক্যাম্পাসে চলন্ত শাটলে ছাত্রীর কান থেকে স্বর্ণের দুল ছিনতাই

২৪ বছরে ১১২ এতিম মেয়ের বিয়ে দিলেন রুবেল

  • ডেস্ক রিপোর্ট
  • আপডেট সময় ০২:২৭:০০ অপরাহ্ন, শনিবার, ২২ অগাস্ট ২০২৬
  • ৭২ বার পড়া হয়েছে

বাবাকে হারিয়েছেন প্রায় এক দশক আগে। এরপর অন্যের বাড়িতে কাজ করে একমাত্র মেয়েকে বড় করেছেন মা জহুরা খাতুন। অভাবের সংসারে নানা কষ্টের মধ্যেও মেয়েকে মানুষ করলেও বিয়ের বয়সে এসে নতুন দুশ্চিন্তায় পড়েন তিনি। অর্থের অভাবে যখন মেয়ের বিয়ের আয়োজন নিয়ে চিন্তিত, তখনই পাশে দাঁড়ান নাটোরের বড়াইগ্রামের রুহুল আমিন রুবেল।

শুধু বিয়ের খরচ বহন নয়, নিজের মেয়ের মতো করে ধুমধাম আয়োজনের মধ্য দিয়ে বিয়ে দিয়েছেন তিনি। বরযাত্রীদের আপ্যায়ন থেকে শুরু করে খাবারের আয়োজন—কোনো কিছুতেই রাখেননি কমতি।

এভাবেই গত ২৪ বছরে ১১২ জন অসহায়, হতদরিদ্র ও এতিম মেয়ের বিয়ের দায়িত্ব পালন করেছেন রুবেল।

শনিবার রাজশাহীর চারঘাট উপজেলার বালাদিয়া গ্রামের ১৯ বছর বয়সী সুমাইয়া আক্তার তিথির বিয়ের আয়োজনও করেন তিনি।

বিয়েকে ঘিরে সকাল থেকেই তিথিদের বাড়িতে ছিল উৎসবের আমেজ। বাড়ির সামনে তৈরি করা হয় বিয়ের গেট। অতিথি ও বরযাত্রীদের জন্য করা হয় চেয়ার-টেবিলের ব্যবস্থা। রান্না করা হয় গরু, খাসি, মুরগি, ডিম, পোলাওসহ নানা ধরনের খাবার।

অন্যদিকে বাড়ির জরাজীর্ণ একটি কক্ষে তখন বউ সাজানো হচ্ছিল তিথিকে। একদিকে উৎসবের ব্যস্ততা, অন্যদিকে কনের সাজ—সব মিলিয়ে দরিদ্র পরিবারটির ঘরেও যেন নেমে আসে আনন্দের আবহ।

প্রায় ১০ বছর আগে বাবাকে হারান তিথি। এরপর মা জহুরা খাতুনই হয়ে ওঠেন তার একমাত্র অবলম্বন। অন্যের বাড়িতে কাজ করে মেয়ের পড়াশোনা ও সংসারের খরচ চালিয়েছেন তিনি।

মেয়ের বিয়ের সময় আর্থিক সংকট আরও বড় হয়ে দেখা দেয়। একপর্যায়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রুহুল আমিন রুবেলের অসহায় মেয়েদের বিয়ে দেওয়ার উদ্যোগের কথা জানতে পারেন জহুরা খাতুন। যোগাযোগের পর তিথির পরিবারের খোঁজ নেন রুবেল এবং বিয়ের পুরো দায়িত্ব নেওয়ার সিদ্ধান্ত জানান।

শুক্রবার রাতে গায়ে হলুদের মধ্য দিয়ে শুরু হয় আয়োজন। শনিবার জুমার নামাজের পর বর তরিকুল ইসলাম ও তার বরযাত্রীরা কনের বাড়িতে আসেন। সোনার আংটি দিয়ে বরকে বরণ করেন রুবেল। এরপর সম্পন্ন হয় বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা।

তিথির মা জহুরা খাতুন বলেন, মেয়ের বিয়ে নিয়ে তিনি অনেক দুশ্চিন্তায় ছিলেন। রুবেল দায়িত্ব নেওয়ার পর নিজের মেয়ের মতো করে পুরো আয়োজন করেছেন। এমন আয়োজন তাদের পরিবারের কাছে ছিল কল্পনারও বাইরে।

নববধূ তিথি বলেন, বাবা না থাকলেও বিয়ের দিনে তার অভাব খুব একটা অনুভব করেননি। এত বড় আয়োজন দেখে তিনি নিজেই অবাক হয়েছেন।

বর তরিকুল ইসলামও কনে পক্ষের আতিথেয়তা ও আয়োজনের প্রশংসা করেন। নবদম্পতি তাদের নতুন জীবনের জন্য সবার কাছে দোয়া চেয়েছেন।

স্থানীয় ইমাম ও বাসিন্দারাও রুবেলের উদ্যোগের প্রশংসা করেছেন। তাদের মতে, বছরের পর বছর অসহায় ও এতিম মেয়েদের বিয়ের দায়িত্ব নেওয়া নিঃসন্দেহে মহৎ উদ্যোগ। সমাজের সামর্থ্যবান মানুষরা এ ধরনের কাজে এগিয়ে এলে আরও অনেক অসহায় পরিবারের মুখে হাসি ফুটবে।

রুহুল আমিন রুবেল জানান, কোনো প্রচারের উদ্দেশ্যে নয়, পরকালের কথা চিন্তা করেই গত ২৪ বছর ধরে অসহায়, দরিদ্র ও এতিম মেয়েদের বিয়ের দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। তিথির বিয়েটি তার উদ্যোগে ১১২তম বিয়ে।

পেশায় ব্যবসায়ী রুবেলের কাছে মানুষের পাশে দাঁড়ানো শুধু দায়িত্ব নয়, সৌভাগ্যেরও বিষয়।

তিথির জীবনে বাবার শূন্যতা হয়তো কখনো পূরণ হওয়ার নয়। তবে বিয়ের দিনে বাবার মতো পাশে দাঁড়িয়ে রুবেল দেখিয়ে দিলেন—রক্তের সম্পর্কের বাইরেও মানবিকতা ও দায়িত্ববোধ থেকে তৈরি হতে পারে গভীর এক সম্পর্ক।

রুবেলের ১১২টি বিয়ে তাই শুধু একটি সংখ্যা নয়—এ যেন ১১২টি অসহায় পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর গল্প।

ট্যাগস

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

জনপ্রিয় সংবাদ

এক সমুদ্রে দুই নিয়ম, নিষেধাজ্ঞা নিয়ে জেলেদের যত ক্ষোভ

২৪ বছরে ১১২ এতিম মেয়ের বিয়ে দিলেন রুবেল

আপডেট সময় ০২:২৭:০০ অপরাহ্ন, শনিবার, ২২ অগাস্ট ২০২৬

বাবাকে হারিয়েছেন প্রায় এক দশক আগে। এরপর অন্যের বাড়িতে কাজ করে একমাত্র মেয়েকে বড় করেছেন মা জহুরা খাতুন। অভাবের সংসারে নানা কষ্টের মধ্যেও মেয়েকে মানুষ করলেও বিয়ের বয়সে এসে নতুন দুশ্চিন্তায় পড়েন তিনি। অর্থের অভাবে যখন মেয়ের বিয়ের আয়োজন নিয়ে চিন্তিত, তখনই পাশে দাঁড়ান নাটোরের বড়াইগ্রামের রুহুল আমিন রুবেল।

শুধু বিয়ের খরচ বহন নয়, নিজের মেয়ের মতো করে ধুমধাম আয়োজনের মধ্য দিয়ে বিয়ে দিয়েছেন তিনি। বরযাত্রীদের আপ্যায়ন থেকে শুরু করে খাবারের আয়োজন—কোনো কিছুতেই রাখেননি কমতি।

এভাবেই গত ২৪ বছরে ১১২ জন অসহায়, হতদরিদ্র ও এতিম মেয়ের বিয়ের দায়িত্ব পালন করেছেন রুবেল।

শনিবার রাজশাহীর চারঘাট উপজেলার বালাদিয়া গ্রামের ১৯ বছর বয়সী সুমাইয়া আক্তার তিথির বিয়ের আয়োজনও করেন তিনি।

বিয়েকে ঘিরে সকাল থেকেই তিথিদের বাড়িতে ছিল উৎসবের আমেজ। বাড়ির সামনে তৈরি করা হয় বিয়ের গেট। অতিথি ও বরযাত্রীদের জন্য করা হয় চেয়ার-টেবিলের ব্যবস্থা। রান্না করা হয় গরু, খাসি, মুরগি, ডিম, পোলাওসহ নানা ধরনের খাবার।

অন্যদিকে বাড়ির জরাজীর্ণ একটি কক্ষে তখন বউ সাজানো হচ্ছিল তিথিকে। একদিকে উৎসবের ব্যস্ততা, অন্যদিকে কনের সাজ—সব মিলিয়ে দরিদ্র পরিবারটির ঘরেও যেন নেমে আসে আনন্দের আবহ।

প্রায় ১০ বছর আগে বাবাকে হারান তিথি। এরপর মা জহুরা খাতুনই হয়ে ওঠেন তার একমাত্র অবলম্বন। অন্যের বাড়িতে কাজ করে মেয়ের পড়াশোনা ও সংসারের খরচ চালিয়েছেন তিনি।

মেয়ের বিয়ের সময় আর্থিক সংকট আরও বড় হয়ে দেখা দেয়। একপর্যায়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রুহুল আমিন রুবেলের অসহায় মেয়েদের বিয়ে দেওয়ার উদ্যোগের কথা জানতে পারেন জহুরা খাতুন। যোগাযোগের পর তিথির পরিবারের খোঁজ নেন রুবেল এবং বিয়ের পুরো দায়িত্ব নেওয়ার সিদ্ধান্ত জানান।

শুক্রবার রাতে গায়ে হলুদের মধ্য দিয়ে শুরু হয় আয়োজন। শনিবার জুমার নামাজের পর বর তরিকুল ইসলাম ও তার বরযাত্রীরা কনের বাড়িতে আসেন। সোনার আংটি দিয়ে বরকে বরণ করেন রুবেল। এরপর সম্পন্ন হয় বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা।

তিথির মা জহুরা খাতুন বলেন, মেয়ের বিয়ে নিয়ে তিনি অনেক দুশ্চিন্তায় ছিলেন। রুবেল দায়িত্ব নেওয়ার পর নিজের মেয়ের মতো করে পুরো আয়োজন করেছেন। এমন আয়োজন তাদের পরিবারের কাছে ছিল কল্পনারও বাইরে।

নববধূ তিথি বলেন, বাবা না থাকলেও বিয়ের দিনে তার অভাব খুব একটা অনুভব করেননি। এত বড় আয়োজন দেখে তিনি নিজেই অবাক হয়েছেন।

বর তরিকুল ইসলামও কনে পক্ষের আতিথেয়তা ও আয়োজনের প্রশংসা করেন। নবদম্পতি তাদের নতুন জীবনের জন্য সবার কাছে দোয়া চেয়েছেন।

স্থানীয় ইমাম ও বাসিন্দারাও রুবেলের উদ্যোগের প্রশংসা করেছেন। তাদের মতে, বছরের পর বছর অসহায় ও এতিম মেয়েদের বিয়ের দায়িত্ব নেওয়া নিঃসন্দেহে মহৎ উদ্যোগ। সমাজের সামর্থ্যবান মানুষরা এ ধরনের কাজে এগিয়ে এলে আরও অনেক অসহায় পরিবারের মুখে হাসি ফুটবে।

রুহুল আমিন রুবেল জানান, কোনো প্রচারের উদ্দেশ্যে নয়, পরকালের কথা চিন্তা করেই গত ২৪ বছর ধরে অসহায়, দরিদ্র ও এতিম মেয়েদের বিয়ের দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। তিথির বিয়েটি তার উদ্যোগে ১১২তম বিয়ে।

পেশায় ব্যবসায়ী রুবেলের কাছে মানুষের পাশে দাঁড়ানো শুধু দায়িত্ব নয়, সৌভাগ্যেরও বিষয়।

তিথির জীবনে বাবার শূন্যতা হয়তো কখনো পূরণ হওয়ার নয়। তবে বিয়ের দিনে বাবার মতো পাশে দাঁড়িয়ে রুবেল দেখিয়ে দিলেন—রক্তের সম্পর্কের বাইরেও মানবিকতা ও দায়িত্ববোধ থেকে তৈরি হতে পারে গভীর এক সম্পর্ক।

রুবেলের ১১২টি বিয়ে তাই শুধু একটি সংখ্যা নয়—এ যেন ১১২টি অসহায় পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর গল্প।