জামালপুরের মাদারগঞ্জ উপজেলায় বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ সমবায় সমিতিতে জমা রাখা আমানতের টাকা ফেরতের দাবিতে উপজেলা পরিষদ কার্যালয় ঘেরাও করে তীব্র বিক্ষোভ ও অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছেন হাজারো ভুক্তভোগী গ্রাহক। আজ রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) দুপুর ১২টা থেকে শুরু করে বিকেল ৫টা এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত টানা ৫ ঘণ্টা এই ঘেরাও কর্মসূচি চলে। ভুক্তভোগীদের স্পষ্ট ঘোষণা—আত্মসাৎকৃত অর্থ শতভাগ উদ্ধার না হওয়া পর্যন্ত এই ঘেরাও আন্দোলন বিরতিহীনভাবে চলবে।
‘আন্দোলনরত সকল বঞ্চিত গ্রাহক’ ব্যানারে আয়োজিত এই বিশাল কর্মসূচিতে উপজেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা প্রায় দুই হাজার নারী-পুরুষ গ্রাহক অংশ নেন। দুপুরে মাদারগঞ্জ পৌরসভার গাবেরগ্রাম চৌরাস্তার মোড় এলাকা থেকে ‘অর্থ উদ্ধার আন্দোলন’-এর নেতা শিবলুল বারী রাজুর নেতৃত্বে লাঠি হাতে একটি বিশাল বিক্ষোভ মিছিল বের করা হয়। মিছিলটি উপেজলার হাওয়াই রোড প্রদক্ষিণ করে উপজেলা পরিষদ চত্বরে গিয়ে অবস্থান নেয়। একপর্যায়ে বিক্ষুব্ধ আন্দোলনকারীরা উপজেলা পরিষদ ভবন ঘেরাও করে সব ধরনের প্রশাসনিক কার্যক্রম স্থবির করে দেন।
কর্মসূচি চলাকালে চরম উত্তেজনা সৃষ্টি হয় যখন রকিবুল ইসলাম নামে এক গ্রাহকের সাথে আন্দোলনকারীদের কথাকাটাকাটির ঘটনা ঘটে। পরবর্তীতে ওই ব্যক্তি বিক্ষুব্ধ গ্রাহকদের তোপের মুখে পড়লে তাঁকে সহ আরও ৯ নারী গ্রাহককে উপজেলা পরিষদ চত্বরের একটি পরিত্যক্ত ঘরে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়।
জামালপুর জেলা সমবায় দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, মাদারগঞ্জ উপজেলার ২৩টি সমবায় সমিতিকে ইতিমধ্যেই ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। এসব সমিতিতে সাধারণ গ্রাহকের সংখ্যা ৩২ হাজার ৪২৪ জন। প্রাপ্ত তথ্য ও অভিযোগ অনুযায়ী, এই বিপুলসংখ্যক সাধারণ ও নিরীহ গ্রাহকের প্রায় ৭২০ কোটি ১৯ লাখ টাকা সমবায়গুলোর পরিচালনা পর্ষদ আত্মসাৎ করে আটকে রেখেছে। ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, কৃষক, প্রবাসী, দিনমজুর, পোশাক শ্রমিক ও মধ্যবিত্ত চাকরিজীবীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ রয়েছেন, যারা তাঁদের জীবনের সব সঞ্চয় হারিয়ে এখন নিঃস্ব।
আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, এই অর্থখেকো সমবায় সমিতিগুলোর অধিকাংশেরই পরিচালক বিগত আওয়ামীলীগ সরকারের ক্ষমতাশীন দল ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের প্রভাবশালী নেতাকর্মী। পাশাপাশি জামায়াত ইসলামের কিছু নেতারও একাধিক সমবায় সমিতির এই লুটপাটের সঙ্গে প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততা রয়েছে।
অর্থ উদ্ধার আন্দোলনের নেতা শিবলুল বারী রাজু বলেন, “বিগত তিন বছর ধরে আমরা শান্তিপূর্ণ উপায়ে টাকা ফেরতের আন্দোলন করে আসছি, কিন্তু আজ পর্যন্ত কোনো গ্রাহক সঠিকভাবে আমানত ফেরত পাননি। গ্রাহকদের আত্মসাৎকৃত অর্থ উদ্ধার না হওয়া পর্যন্ত আমাদের এই আন্দোলন চলবে। সংসদ সদস্য (এমপি) মহোদয়ের দেওয়া প্রতিশ্রুতি সাধারণ গ্রাহকেরা মেনে নেননি। কারণ, ওই প্রতিশ্রুতি মূলত প্রতারক মালিকপক্ষকের, তা ভুক্তভোগী সাধারণ গ্রাহকদের স্বার্থ রক্ষা করে না।” ঘটনার সময় রকিবুল নামে এক গ্রাহককে অবরুদ্ধ করার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “উক্ত ব্যক্তি চলমান আন্দোলনের মাঝে বিক্ষুব্ধ গ্রাহকদের সামনে উসকানিমূলক ও আপত্তিকর মন্তব্য করায় বিক্ষুব্ধ গ্রাহকরা ক্ষিপ্ত হয়ে তাঁকে ধাওয়া করে।”
মাদারগঞ্জ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) স্নেহাশীষ রায় বলেন, এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোনো লিখিত অভিযোগ পাওয়া যায়নি। অভিযোগ পেলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ঘটনাস্থলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ছয়জন সদস্য দায়িত্ব পালন করছেন।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সুমন চৌধুরী বলেন, এ বিষয়ে এমপি মহোদয় ও অর্থ উদ্ধার কমিটির সঙ্গে কথা হয়েছিল। তারা আন্দোলন করবেন না বলে জানিয়েছিলেন। এখন কী কারণে আবার আন্দোলন করছেন, সে বিষয়ে তিনি অবগত নন। তিনি জেলা পর্যায়ের একটি সভায় আছেন বলে তিনি জানান।

এম আর সাইফুল, জামালপুর প্রতিনিধি 























