১৪ জুন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি কাঠামোগত সমঝোতায় যুদ্ধ অবসানের বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেয়া, লেবাননে বোমাবর্ষণ বন্ধ হওয়া এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো- হত্যাকাণ্ড থেমে যাওয়ার কথা। শতাধিক দিনের যুদ্ধে হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের সংকটের পর এই যুদ্ধবিরতিকে দুর্বল হলেও একটি নতুন সূর্যালোকের শুরু হিসেবে দেখছেন অনেকে।
তবে এই যুদ্ধ কেন শুরু হলো এবং এর আগে ধারাবাহিকভাবে যে যুদ্ধগুলো ঘটেছে, তার কারণ বিশ্লেষণ করে একটি মতামত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা। নিবন্ধটিতে একটি মূল ধারণাকে কেন্দ্রীয় কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সেটি হলো- ‘গ্রেটার ইসরায়েল’ ধারণা।
এই ধারণা অনুযায়ী, ‘গ্রেটার ইসরায়েল’ বলতে বর্তমান রাষ্ট্র ইসরায়েলকে নয়, বরং একটি রাজনৈতিক ও আদর্শিক ধারণাকে বোঝানো হচ্ছে, যা অত্যন্ত বিপজ্জনক। এই ধারণা অনুযায়ী ইসরায়েলের ভূখণ্ড জর্ডান নদী থেকে ভূমধ্যসাগর পর্যন্ত পুরো ঐতিহাসিক ফিলিস্তিন এবং পার্শ্ববর্তী আরব অঞ্চলের অংশ পর্যন্ত বিস্তৃত।
ইসরায়েলে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবি একজন কট্টরপন্থি প্রোটেস্ট্যান্ট। তিনি বলেছেন, ‘গ্রেটার ইসরায়েল নীল নদ থেকে ইউফ্রেটিস নদী পর্যন্ত বিস্তৃত। পাশাপাশি ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুও অতীতে এই ধরনের ভূ-রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রতি তার সমর্থনের ইঙ্গিত দিয়েছেন।’
এই ধরনের বিপজ্জনক মতবাদ মূলত দুই ধরনের রাজনৈতিক চিন্তার সমন্বয়। একদিকে রয়েছে নেতানিয়াহুর মতো ধর্মনিরপেক্ষ কট্টরপন্থি রাজনীতিবিদরা, যারা মনে করেন নিরাপত্তার জন্য পুরো ভূখণ্ড নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি। এছাড়া তারা এও মনে করেন, এ লক্ষ্যের পথে বাধা হয়ে থাকা ৮০ লাখ ফিলিস্তিনিকে নরকে পাঠানো উচিত।
অন্যদিকে রয়েছে ধর্মভিত্তিক ইহুদি আধিপত্যবাদী মতাদর্শ, যার অন্যতম প্রতিনিধি অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচ ও জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভির। স্মোট্রিচ বলেন, ‘ফিলিস্তিন বলে কিছু নেই এবং ইসরায়েলকে পশ্চিম তীর, গাজা, লেবানন ও সিরিয়ার কিছু অংশে সামরিক নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে হবে। এই লক্ষ্য অর্জনে কোনো ছাড় দেয়া হবে না। তাদের খুশি করার জন্য আমরা আত্মহত্যা করব না।’
এই ‘গ্রেটার ইসরায়েল’ ধারণা একটি ভয়, আধিপত্যবাদ ও ধর্মীয় উগ্রতার মিশ্রণ, যা দীর্ঘদিন ধরে ইসরায়েলের পররাষ্ট্র ও সামরিক নীতিকে প্রভাবিত করছে। এই ধারণাকে কেন্দ্র করেই গত তিন দশকে মধ্যপ্রাচ্যে একের পর এক যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে- সংঘাত ছড়িয়ে পড়েছে ইরাক, গাজা, লেবানন, সিরিয়া ও ইরানসহ বিভিন্ন অঞ্চলে।
ইরানের সঙ্গে সাম্প্রতিক যুদ্ধকে এই ধারণাকে কেন্দ্র করে সর্বশেষ সংঘাত। তবে, তা ব্যর্থ হয়েছে। যদিও এর ফলে হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু ও বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট দেখা দিয়েছে। এর আগে সিরিয়ায় প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদকে ক্ষমতাচ্যুত করার পরিকল্পনাও একই ধরনের দ্রুত বিজয়ের ধারণা থেকে শুরু হয়েছিল, পরে তা দীর্ঘমেয়াদি রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে পরিণত হয় এবং দেশটি পরিণত হয় ধ্বংসস্তূপে।
যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক ও বর্তমান নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়ায় ইসরায়েলপন্থি লবির প্রভাব নিয়েও সমালোচনা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের কিছু ধর্মীয় ও রাজনৈতিক গোষ্ঠী এই যুদ্ধনীতিকে সমর্থন দিয়ে আসছে। সর্বশেষ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকেও এই লক্ষ্য পূরণের পথের সঙ্গী বানিয়ে বোকা বানিয়েছেন ইসরায়েলি প্রেসিডেন্ট নেতানিয়াহু।
তবে, যুদ্ধে ব্যর্থ হয়ে ব্যাপকভাবে সমালোচিত হয়েছেন ট্রাম্প। তাই তিনি ইরানের সঙ্গে নতুন চুক্তির মাধ্যমে এমন এক অর্থহীন যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসার উপায় খুঁজছেন। আর এই শান্তি উদ্যোগকে বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করছে ইসরায়েলের কিছু রাজনৈতিক শক্তি। কারণ ইরানের সঙ্গে শান্তি স্থাপন ‘গ্রেটার ইসরায়েল’ ধারণার পরিপন্থি।
আর এ কারণেই হয়তো শান্তি চুক্তি কার্যকর হওয়ার পরও লেবাননে হামলা অব্যাহত রয়েছে এবং এতে বহু মানুষের মৃত্যু ঘটেছে এবং এখনও ঘটছে, যা যুদ্ধবিরতির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। বর্তমান সংকটের মূল সমস্যা হলো- একটি রাষ্ট্র যখন নিজের নিরাপত্তা নয়, বরং একটি বিস্তৃত ভূখণ্ডগত ও আদর্শিক লক্ষ্যকে অগ্রাধিকার দেয়, তখন তা দীর্ঘমেয়াদে সংঘাত বাড়িয়ে তোলে।
‘গ্রেটার ইসরায়েল’ ধারণা ইসরায়েলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করছে না, বরং এটি দেশটির অস্তিত্বকেই ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বলে মনে করা হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার একমাত্র পথ হলো এই ধারণা পরিত্যাগ করা, গাজা যুদ্ধ বন্ধ করা, পশ্চিম তীরের অবরোধ তুলে নেয়া এবং ১৯৬৭ সালের সীমারেখার ভিত্তিতে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা।
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিরতি প্রমাণ করেছে যে আলোচনার মাধ্যমেই শান্তি সম্ভব। তবে এই শান্তিকে স্থায়ী করতে হলে রাজনৈতিক নেতৃত্বকে যুদ্ধনির্ভর আদর্শ থেকে সরে আসতে হবে। একইসঙ্গে এই অঞ্চলে টেকসই শান্তির জন্য যুক্তরাষ্ট্র, আরব বিশ্ব এবং ইরানকে জোর দিয়ে বলতে হবে, ‘বৃহত্তর ইসরায়েল’ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়াই স্থায়ী শান্তির একমাত্র পথ।

ডেস্ক রিপোর্ট 


















