ঢাকা , মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬, ৯ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মেসির ‘ইয়ারবা মাতে’ আসলে কি, আর্জেন্টিনার এই পানীয় নিয়ে কেন এত মাতামাতি?

  • ডেস্ক রিপোর্ট
  • আপডেট সময় ১০:০০:১৭ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬
  • ১৬ বার পড়া হয়েছে

মাঠে নামার আগে, বিমানে বসে, অনুশীলনের ফাঁকে কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডায় একটি জিনিস প্রায়ই দেখা যায় লিওনেল মেসির হাতে। সেটি কোনো সফট ড্রিংক নয়, কফিও নয়। একটি ছোট কাপ আর ধাতব স্ট্র। আর সেই কাপে থাকে ‘ইয়ারবা মাতে’। বিশ্বকাপ জয়ের পর এক হাতে ট্রফি আর অন্য হাতে ইয়ারবা মাতের কাপ নিয়ে মেসির সেই ছবি এখন ফুটবল ইতিহাসেরই অংশ। এরপর থেকেই বিশ্বের বিভিন্ন দেশে, এমনকি বাংলাদেশেও অনেক মেসিভক্তের কৌতূহল, কী আছে এই পানীয়তে আর কেন মেসি এত পছন্দ করেন এটি?

 

কেন ইয়ারবা মাতে নিয়ে মাতামাতি

ক্যাফেইনযুক্ত ইয়ারবা মাতে দক্ষিণ আমেরিকার একটি ঐতিহ্যবাহী পানীয়। আর্জেন্টিনা, উরুগুয়ে, প্যারাগুয়ে ও ব্রাজিলের কিছু অঞ্চলে এটি শুধু পানীয় নয়, সংস্কৃতিরও অংশ। পরিবার, বন্ধু কিংবা সহকর্মীদের সঙ্গে একই কাপ থেকে চুমুক দিয়ে মাতে পান করা সেখানে সামাজিক বন্ধনের প্রতীক।

বিশেষ এক ধরনের গাছের শুকনো পাতা গরম পানিতে ভিজিয়ে এই পানীয় তৈরি করা হয়। এর স্বাদ কিছুটা ঘাস, মাটি ও হালকা ধোঁয়াটে সুবাসের মিশেলে তৈরি। দক্ষিণ আমেরিকার মানুষের কাছে এটি প্রতিদিনের সঙ্গী। এমনকি ফুটবল বিশ্বকাপ কেন্দ্র করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও এই পানীয়টির জনপ্রিয়তা ব্যাপকভাবে বেড়েছে। অনেকে খেলা দেখার সময় মাঠে ইয়ারবা মাতে নিয়ে যাচ্ছেন। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্য-পশ্চিমাঞ্চলে ইয়ারবা মাতে আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান ‘ক্যাফে কোরাজন’-এও দেখা গেছে একই উন্মাদনা। প্রতিষ্ঠানটির সহমালিক দুলসিনিয়া হেরেরার ভাষায়, মাতে খুব দ্রুত বিক্রি হয়ে যাচ্ছে। অনেকেই শুধু এই অভিজ্ঞতার অংশ হতে চান। আবার অনেক আর্জেন্টাইন এসে বলেন, এই পানীয় তাদের ঘরের কথা মনে করিয়ে দেয়।

 

ফুটবল তারকাদের কাছেও ইয়ারবা মাতে অত্যন্ত জনপ্রিয়। উরুগুয়ের লুইস সুয়ারেজ ও আর্জেন্টিনার লিওনেল মেসির মতো বিশ্বখ্যাত ফুটবলারদের হাতে প্রায়ই দেখা যায় এই পানীয়। বিশেষ করে ২০২২ সালের বিশ্বকাপ জয়ের পর এক হাতে বিশ্বকাপ ট্রফি ও অন্য হাতে মাতে কাপ নিয়ে মেসির তোলা একটি ছবি সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। সেই ছবি যেন ফুটবল ও ইয়ারবা মাতের সম্পর্ককে নতুন এক প্রতীকে পরিণত করেছে।

 

ইয়ারবা মাতের ইতিহাস রয়েছে। আর এর স্বাদ আর তৈরির ধরন কিন্তু সব দেশে এক নয়। যুক্তরাষ্ট্রের ডিউক বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক নৃবিজ্ঞানী এবং ‘দ্য বুক অব ইয়ারবা মাতে’-এর লেখক ক্রিস্টিন ফলচের মতে, বিভিন্ন সংস্কৃতি নিজেদের মতো করে মাতে পান করার ধরন তৈরি করেছে। প্যারাগুয়ে, উরুগুয়ে, আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলে মাতে পরিবেশনের পাত্র এবং এটি তৈরির পদ্ধতিই সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অংশ হয়ে উঠেছে।

 

বিশ শতকের শুরুতে সিরিয়া ও লেবাননেও ইয়ারবা মাতে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। সে কারণেই বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক মুদি দোকানে সহজেই পাওয়া যায় শুকনো মাতে পাতা। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে এটি প্রাকৃতিক এনার্জি ড্রিংক হিসেবে বিক্রি করা হয়। কিউবান-আমেরিকানদের কেউ কেউ আবার মিষ্টি ও কার্বনেটেড সংস্করণ পছন্দ করেন। জার্মানির বার্লিনে ‘ক্লাব মাতে’ নামে কার্বনেটেড একটি সংস্করণ জনপ্রিয়, যা অনেক সময় অ্যালকোহলের সঙ্গে মিশিয়েও পান করা হয়।

 

ঐতিহ্যগতভাবে মাতে পাতাকে প্রস্তুত করার সময় ধোঁয়ায় শুকানো হয়। এতে পানীয়টিতে এক ধরনের ধোঁয়াটে সুবাস তৈরি হয়, যা এর ঘাসের মতো সতেজ ও মাটির ঘ্রাণযুক্ত স্বাদের সঙ্গে মিশে অনন্য অভিজ্ঞতা দেয়। অনেকের মতে, এটি শরীরে শক্তি ও সতেজতা এনে দেয়।

ইয়ারবা মাতে ও সামাজিক বন্ধন

বাংলাদেশে যেমন চায়ের কাপে জমে ওঠে আড্ডা, আর্জেন্টিনায় সেই জায়গা দখল করে আছে ইয়ারবা মাতে। একটি কাপ কয়েকজন মিলে পালাক্রমে পান করা সেখানে খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার। ক্রিস্টিন ফলচে বলেন, কেউ আপনাকে মাতে পান করার প্রস্তাব দিলে এবং আপনি যদি সেটা গ্রহণ করেন তাহলে বুঝতে হবে আপনি একটি সম্পর্কে প্রবেশ করছেন। মাতে কেবল আপ্যায়ন নয়, বরং বন্ধুত্ব ও সম্পর্কের আমন্ত্রণ হিসেবেও দেখা হয়।

সূত্র: ইন্ডিপেন্ডেন্ট

 

ট্যাগস

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

জনপ্রিয় সংবাদ

মেসির ‘ইয়ারবা মাতে’ আসলে কি, আর্জেন্টিনার এই পানীয় নিয়ে কেন এত মাতামাতি?

আপডেট সময় ১০:০০:১৭ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬

মাঠে নামার আগে, বিমানে বসে, অনুশীলনের ফাঁকে কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডায় একটি জিনিস প্রায়ই দেখা যায় লিওনেল মেসির হাতে। সেটি কোনো সফট ড্রিংক নয়, কফিও নয়। একটি ছোট কাপ আর ধাতব স্ট্র। আর সেই কাপে থাকে ‘ইয়ারবা মাতে’। বিশ্বকাপ জয়ের পর এক হাতে ট্রফি আর অন্য হাতে ইয়ারবা মাতের কাপ নিয়ে মেসির সেই ছবি এখন ফুটবল ইতিহাসেরই অংশ। এরপর থেকেই বিশ্বের বিভিন্ন দেশে, এমনকি বাংলাদেশেও অনেক মেসিভক্তের কৌতূহল, কী আছে এই পানীয়তে আর কেন মেসি এত পছন্দ করেন এটি?

 

কেন ইয়ারবা মাতে নিয়ে মাতামাতি

ক্যাফেইনযুক্ত ইয়ারবা মাতে দক্ষিণ আমেরিকার একটি ঐতিহ্যবাহী পানীয়। আর্জেন্টিনা, উরুগুয়ে, প্যারাগুয়ে ও ব্রাজিলের কিছু অঞ্চলে এটি শুধু পানীয় নয়, সংস্কৃতিরও অংশ। পরিবার, বন্ধু কিংবা সহকর্মীদের সঙ্গে একই কাপ থেকে চুমুক দিয়ে মাতে পান করা সেখানে সামাজিক বন্ধনের প্রতীক।

বিশেষ এক ধরনের গাছের শুকনো পাতা গরম পানিতে ভিজিয়ে এই পানীয় তৈরি করা হয়। এর স্বাদ কিছুটা ঘাস, মাটি ও হালকা ধোঁয়াটে সুবাসের মিশেলে তৈরি। দক্ষিণ আমেরিকার মানুষের কাছে এটি প্রতিদিনের সঙ্গী। এমনকি ফুটবল বিশ্বকাপ কেন্দ্র করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও এই পানীয়টির জনপ্রিয়তা ব্যাপকভাবে বেড়েছে। অনেকে খেলা দেখার সময় মাঠে ইয়ারবা মাতে নিয়ে যাচ্ছেন। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্য-পশ্চিমাঞ্চলে ইয়ারবা মাতে আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান ‘ক্যাফে কোরাজন’-এও দেখা গেছে একই উন্মাদনা। প্রতিষ্ঠানটির সহমালিক দুলসিনিয়া হেরেরার ভাষায়, মাতে খুব দ্রুত বিক্রি হয়ে যাচ্ছে। অনেকেই শুধু এই অভিজ্ঞতার অংশ হতে চান। আবার অনেক আর্জেন্টাইন এসে বলেন, এই পানীয় তাদের ঘরের কথা মনে করিয়ে দেয়।

 

ফুটবল তারকাদের কাছেও ইয়ারবা মাতে অত্যন্ত জনপ্রিয়। উরুগুয়ের লুইস সুয়ারেজ ও আর্জেন্টিনার লিওনেল মেসির মতো বিশ্বখ্যাত ফুটবলারদের হাতে প্রায়ই দেখা যায় এই পানীয়। বিশেষ করে ২০২২ সালের বিশ্বকাপ জয়ের পর এক হাতে বিশ্বকাপ ট্রফি ও অন্য হাতে মাতে কাপ নিয়ে মেসির তোলা একটি ছবি সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। সেই ছবি যেন ফুটবল ও ইয়ারবা মাতের সম্পর্ককে নতুন এক প্রতীকে পরিণত করেছে।

 

ইয়ারবা মাতের ইতিহাস রয়েছে। আর এর স্বাদ আর তৈরির ধরন কিন্তু সব দেশে এক নয়। যুক্তরাষ্ট্রের ডিউক বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক নৃবিজ্ঞানী এবং ‘দ্য বুক অব ইয়ারবা মাতে’-এর লেখক ক্রিস্টিন ফলচের মতে, বিভিন্ন সংস্কৃতি নিজেদের মতো করে মাতে পান করার ধরন তৈরি করেছে। প্যারাগুয়ে, উরুগুয়ে, আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলে মাতে পরিবেশনের পাত্র এবং এটি তৈরির পদ্ধতিই সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অংশ হয়ে উঠেছে।

 

বিশ শতকের শুরুতে সিরিয়া ও লেবাননেও ইয়ারবা মাতে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। সে কারণেই বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক মুদি দোকানে সহজেই পাওয়া যায় শুকনো মাতে পাতা। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে এটি প্রাকৃতিক এনার্জি ড্রিংক হিসেবে বিক্রি করা হয়। কিউবান-আমেরিকানদের কেউ কেউ আবার মিষ্টি ও কার্বনেটেড সংস্করণ পছন্দ করেন। জার্মানির বার্লিনে ‘ক্লাব মাতে’ নামে কার্বনেটেড একটি সংস্করণ জনপ্রিয়, যা অনেক সময় অ্যালকোহলের সঙ্গে মিশিয়েও পান করা হয়।

 

ঐতিহ্যগতভাবে মাতে পাতাকে প্রস্তুত করার সময় ধোঁয়ায় শুকানো হয়। এতে পানীয়টিতে এক ধরনের ধোঁয়াটে সুবাস তৈরি হয়, যা এর ঘাসের মতো সতেজ ও মাটির ঘ্রাণযুক্ত স্বাদের সঙ্গে মিশে অনন্য অভিজ্ঞতা দেয়। অনেকের মতে, এটি শরীরে শক্তি ও সতেজতা এনে দেয়।

ইয়ারবা মাতে ও সামাজিক বন্ধন

বাংলাদেশে যেমন চায়ের কাপে জমে ওঠে আড্ডা, আর্জেন্টিনায় সেই জায়গা দখল করে আছে ইয়ারবা মাতে। একটি কাপ কয়েকজন মিলে পালাক্রমে পান করা সেখানে খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার। ক্রিস্টিন ফলচে বলেন, কেউ আপনাকে মাতে পান করার প্রস্তাব দিলে এবং আপনি যদি সেটা গ্রহণ করেন তাহলে বুঝতে হবে আপনি একটি সম্পর্কে প্রবেশ করছেন। মাতে কেবল আপ্যায়ন নয়, বরং বন্ধুত্ব ও সম্পর্কের আমন্ত্রণ হিসেবেও দেখা হয়।

সূত্র: ইন্ডিপেন্ডেন্ট