রংপুরে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ একই পরিবারের চারজনকে হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মামলা তদন্তের জন্য গোয়েন্দা পুলিশে (ডিবি) হস্তান্তর করা হয়েছে। মামলার নতুন তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন ডিবির পরিদর্শক জিন্নাত আলী।
এদিকে, ময়নাতদন্তে অংশ নেওয়া ডোমের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। ভিডিওতে নিহত প্রীতিলতা চক্রবর্তী ও তার মেয়ে পার্থী চক্রবর্তীর শরীর থেকে ‘বীর্য’ পাওয়ার দাবি করেন ডোম যতীন রায়। তবে ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক জানিয়েছেন, ধর্ষণের আশঙ্কায় সংগ্রহ করা আলামত পরীক্ষায় কোনো স্পার্ম পাওয়া যায়নি।
রংপুর মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক বাবুল কুমার বিশ্বাস বলেন, চারজনকেই শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে। দু-একজনের মাথায় সামান্য আঘাতের চিহ্নও পাওয়া গেছে।
তিনি বলেন, ধর্ষণের বিষয়টি নিশ্চিত হতে প্রয়োজনীয় সোয়াব সংগ্রহ করে মাইক্রোবায়োলজি ল্যাবে পাঠানো হয়েছিল। পরীক্ষার প্রতিবেদনে কোনো স্পার্ম পাওয়া যায়নি। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনও প্রস্তুত করা হয়েছে।
ডিবিতে তদন্ত হস্তান্তর
রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের উপ-কমিশনার সনাতন চক্রবর্তী জানান, পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্তের জন্য মামলাটি ডিবিতে হস্তান্তর করা হয়েছে। গত সোমবার মামলার আগের তদন্ত কর্মকর্তা কোতোয়ালি থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মিলন চ্যাটার্জী প্রয়োজনীয় নথিপত্র ও তথ্য-উপাত্ত নতুন তদন্ত কর্মকর্তা জিন্নাত আলীর কাছে হস্তান্তর করেন।
পরে দুই তদন্ত কর্মকর্তা ঘটনাস্থল নগরের মাছুয়াপাড়ায় গণপতি চক্রবর্তীর বাড়িতে যান।
পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এ ঘটনায় গ্রেপ্তার মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাস আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। পুলিশ কমিশনারের দেওয়া প্রাথমিক বক্তব্যের সঙ্গে আদালতে তাদের দেওয়া জবানবন্দিরও মিল রয়েছে বলে দাবি পুলিশের।
ছাদে মাদক সেবন নিয়ে হত্যার দাবি পুলিশের
রোববার সংবাদ সম্মেলনে রংপুর নগর পুলিশ কমিশনার আবদুল মাবুদ জানিয়েছিলেন, বাড়ির ছাদে মাদক সেবনের সময় গণপতি চক্রবর্তী সেখানে উঠলে তাকে হত্যা করা হয়। পরে একে একে তার স্ত্রী ও দুই সন্তানকে হত্যা করা হয়।
গত শনিবার রাতে নগরের মাছুয়াপাড়ায় নিজেদের বাড়ির ছাদ, সিঁড়ি ও ঘর থেকে গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী, মেয়ে পার্থী চক্রবর্তী আগামী এবং ছেলে প্রিয়ম চক্রবর্তী আয়ুশের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তাদের বয়স যথাক্রমে ৬৫, ৫০, ২৫ ও ১২ বছর।
এ ঘটনায় রোববার ভোরে মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাসকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তারা দুজনই মাছুয়াপাড়া এলাকার বাসিন্দা।
স্বজনের দাবি, ‘দুইজনের পক্ষে চারজনকে হত্যা সম্ভব নয়’
মঙ্গলবার নিহতদের বাড়িতে শ্রাদ্ধ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানের আগে গণপতির বড় ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তী বলেন, দুইজনের পক্ষে চারজনকে হত্যা করা সম্ভব নয়। এ হত্যাকাণ্ডের পেছনে আরও কোনো শক্তি রয়েছে কি না, তা তদন্ত করে দেখার দাবি জানান তিনি।
তবে কারও বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ বা সন্দেহের কথা জানাননি গোপীনাথ। তার ভাষ্য, গণপতি ও তার পরিবারের সঙ্গে কারও বিরোধের কথাও তিনি জানতেন না।
রংপুর জিলা স্কুলে স্মরণসভা
নিহত গণপতি চক্রবর্তী ও তার ছেলে প্রিয়ম চক্রবর্তীর স্মরণে রংপুর জিলা স্কুলে প্রার্থনা ও স্মরণসভার আয়োজন করা হয়। মঙ্গলবার দুপুরে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা এতে অংশ নেন।
প্রিয়ম চক্রবর্তী ওই বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। স্মরণসভায় শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা বাবা-ছেলের স্মৃতিচারণ করেন এবং হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে জড়িতদের শনাক্ত করে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানান।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবুল কালাম আজাদ বলেন, গণপতি চক্রবর্তী ছিলেন সজ্জন ও বিনয়ী মানুষ। শিক্ষক-শিক্ষার্থী সবার কাছেই তিনি অত্যন্ত গ্রহণযোগ্য ছিলেন। দ্রুত তদন্ত শেষ করে হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানান তিনি।
চারজনের ময়নাতদন্ত শেষে রোববার মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরে রাত সাড়ে ১০টার দিকে রংপুর নগরের দখিগঞ্জ শ্মশানে তাদের শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়।

ডেস্ক রিপোর্ট 
























