এক সময় পাকিস্তানকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একঘরে করার ঘোষণা দিয়েছিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। কিন্তু প্রায় এক দশক পর বাস্তব চিত্রটা যেন উল্টো। ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক, চীনের অব্যাহত সমর্থন, উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতা এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে নতুন করে সক্রিয় হওয়ার মাধ্যমে পাকিস্তান আবারও গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক খেলোয়াড় হিসেবে উঠে এসেছে। অন্যদিকে, কাশ্মীর নীতি, ইসরায়েলকে ঘিরে অবস্থান, প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ক্রমবর্ধমান দূরত্ব নিয়ে প্রশ্নের মুখে পড়েছে নয়াদিল্লি। আল জাজিরার বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করার ভারতের দীর্ঘদিনের কৌশল কীভাবে শেষ পর্যন্ত দিল্লিকেই উল্টো ফল দিয়েছে এবং দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে।
শুক্রবার (২৯ মে) এক বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা বলছে, মঞ্চের পডিয়ামে মুষ্টি আঘাত করে পাকিস্তানের নেতাদের উদ্দেশে সরাসরি বার্তা দিয়েছিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বর মাস। সেসময় ভারতের দক্ষিণাঞ্চলীয় রাজ্য কেরালায় সমর্থকদের এক সমাবেশে তিনি বলেছিলেন, ‘পাকিস্তানকে আন্তর্জাতিকভাবে বিচ্ছিন্ন করতে সফল হয়েছে ভারত এবং আমরা সেই প্রচেষ্টা আরও জোরদার করব। বিশ্বজুড়ে তোমরা যে একঘরে হয়ে পড়ো, তা আমরা নিশ্চিত করব।’
ভারত-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে কয়েক দিন আগে সশস্ত্র হামলায় ১৮ ভারতীয় সেনা নিহত হওয়ার ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় এ বক্তব্য দিয়েছিলেন তিনি। মোদি তখন বলেছিলেন, ‘পাকিস্তানের নেতারা শুনে রাখুন, আমাদের ১৮ সেনার আত্মত্যাগ বৃথা যাবে না’। কিন্তু প্রায় এক দশক পর পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। পাকিস্তান এখন মোটেও বিচ্ছিন্ন নয়। বরং দেশটি চীনের ঘনিষ্ঠ কৌশলগত মিত্র। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ এ সপ্তাহেই চীন সফর করেছেন। একই সঙ্গে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আমলে যুক্তরাষ্ট্রেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে আবার উঠে এসেছে পাকিস্তান।
গত এক বছরে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনির এবং প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ দুজনই হোয়াইট হাউসে ট্রাম্পের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। চলমান ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের মধ্যেও ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে প্রধান মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করছে ইসলামাবাদ। ট্রাম্পও নিয়মিত পাকিস্তানের নেতৃত্বের প্রশংসা করে আসছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, এর একটি কারণ হলো ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে পাকিস্তানের সফলতা এবং গুরুত্বপূর্ণ ভূরাজনৈতিক ঘটনাগুলোকে কৌশলে কাজে লাগিয়ে বৈশ্বিক কূটনীতিতে নিজেদের গুরুত্ব বাড়ানো। তবে একই সঙ্গে পাকিস্তানের কূটনৈতিক অবস্থান শক্তিশালী হওয়ার বিষয়টি মোদি সরকারের কিছু ভুল পদক্ষেপও তুলে ধরছে। ওয়াশিংটনভিত্তিক থিংকট্যাংক আটলান্টিক কাউন্সিলের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক জ্যেষ্ঠ ফেলো মাইকেল কুগেলম্যান আল জাজিরাকে বলেন, ‘পাকিস্তানকে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিকভাবে দুর্বল এবং বিচ্ছিন্ন করার ভারতের কৌশল বড় ধরনের উল্টো ফল দিয়েছে।’
২০২৫ সালের ১০ মে ট্রাম্প ঘোষণা দেন যে তিনি পারমাণবিক শক্তিধর ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি নিশ্চিত করেছেন। নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে তিনি লেখেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় রাতভর দীর্ঘ আলোচনার পর আমি আনন্দের সঙ্গে ঘোষণা করছি যে ভারত ও পাকিস্তান পূর্ণাঙ্গ ও তাৎক্ষণিক যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে।’
এর কিছুক্ষণ পর পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ যুদ্ধবিরতি কার্যকরে ট্রাম্পের ‘নেতৃত্ব ও সক্রিয় ভূমিকার’ প্রশংসা করেন। চার দিনব্যাপী ওই সংঘাতে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, যুদ্ধবিমান ও ড্রোন ব্যবহার করা হয়েছিল। কয়েক দশকের মধ্যে এটিই ছিল ভারত-পাকিস্তানের সবচেয়ে ভয়াবহ সংঘর্ষ। এতে দুই দেশের সীমান্তের দুই পাশেই বহু মানুষ নিহত হয়।
ভারত-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে বন্দুকধারীদের হামলায় ২৬ পর্যটক নিহত হওয়ার পর ভারত পাকিস্তানের ভেতরে কথিত ‘সন্ত্রাসী ঘাঁটিতে’ হামলা চালায়। এরপরই সংঘাত শুরু হয়। তবে শেহবাজ শরিফের মতো ট্রাম্পকে প্রকাশ্যে ধন্যবাদ জানাননি নরেন্দ্র মোদি। যদিও ভারতের পররাষ্ট্রসচিব যুদ্ধবিরতির বিষয়টি নিশ্চিত করেছিলেন।
কয়েক দিন পর ট্রাম্প আবারও বলেন, তিনি কাশ্মীর সমস্যার সমাধানে ভারত ও পাকিস্তানের সঙ্গে কাজ করতে প্রস্তুত। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসন থেকে স্বাধীনতা লাভের পর থেকেই কাশ্মীর প্রশ্ন দুই দেশের সম্পর্কের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে আছে।
ভারতের জন্য ট্রাম্পের এই অবস্থান অস্বস্তিকর ছিল। কারণ দীর্ঘদিন ধরে নয়াদিল্লির অবস্থান হলো, পাকিস্তানের সঙ্গে বিরোধ সম্পূর্ণ দ্বিপক্ষীয় বিষয় এবং তৃতীয় পক্ষের মধ্যস্থতার কোনও প্রয়োজন নেই। যদিও ১৯৯৯ সালের কারগিল যুদ্ধ অবসানে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের ভূমিকা ছিল।
এরপর একই বছরের জুন মাসে কানাডা সফরের সময় ট্রাম্প মোদিকে ওয়াশিংটনেও আসার আমন্ত্রণ জানান। কিন্তু মোদি তা প্রত্যাখ্যান করেন। পরিবর্তে ফোনে ট্রাম্পকে জানান, ভারত তৃতীয় পক্ষের মধ্যস্থতা মেনে নেবে না এবং মে মাসের যুদ্ধবিরতি কেবল ভারত-পাকিস্তানের দ্বিপক্ষীয় আলোচনার ফল।
তবুও যুদ্ধবিরতি নিয়ে পাল্টাপাল্টি দাবি চলতেই থাকে। এরপর থেকে ট্রাম্প ৩০ বারেরও বেশি বলেছেন যে তিনিই ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে যুদ্ধবিরতির মধ্যস্থতা করেছেন। তিনি দাবি করেছেন, তার উদ্যোগে এমন একটি পারমাণবিক যুদ্ধ ঠেকানো গেছে যাতে লাখো মানুষের মৃত্যু হতে পারত।
এছাড়া সংঘাতের প্রথম দিন ভারতীয় যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হওয়ার কথাও ট্রাম্প উল্লেখ করেন। আর এটি পাকিস্তানের বক্তব্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। পাকিস্তান দাবি করেছিল, তারা ভারতের একাধিক যুদ্ধবিমান গুলি করে ভূপাতিত করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, সংঘাতের সূচনা করা পেহেলগাম হামলায় পাকিস্তানের সম্পৃক্ততার বিষয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সন্তুষ্ট করতে পারেনি ভারত।
মাইকেল কুগেলম্যান বলেন, ‘বিশ্বের কোনও বড় শক্তিধর দেশ ভারতকে হামলা চালাতে উৎসাহ দেয়নি। আন্তর্জাতিক মহল লক্ষ্য করেছে, পেহেলগাম হামলায় পাকিস্তানের সংশ্লিষ্টতার কোনও প্রমাণও ভারত উপস্থাপন করতে পারেনি’। তার মতে, ‘বয়ানের যুদ্ধে পাকিস্তানই এগিয়ে ছিল।’
তিনি আরও বলেন, ‘পাকিস্তান যে সংঘাতে টিকে থাকতে পেরেছে এবং কয়েকটি ভারতীয় যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করেছে— এটি বিশ্বজুড়ে, এমনকি হোয়াইট হাউসেও ব্যাপক মনোযোগ পেয়েছে’।
ভারত প্রায় তিন সপ্তাহ যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হওয়ার বিষয়টি নিয়ে নীরব ছিল। পরে দেশটির শীর্ষ সেনা কর্মকর্তা স্বীকার করেন, পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সংঘাতে ভারত কয়েকটি যুদ্ধবিমান হারিয়েছে। তবে কতগুলো বিমান ভূপাতিত হয়েছে, তা কখনও আনুষ্ঠানিকভাবে জানায়নি ভারত।
বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধবিরতিতে ট্রাম্পের ভূমিকাকে স্বীকৃতি দিতে মোদির অনীহা ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কেও চাপ সৃষ্টি করে। অন্যদিকে পাকিস্তান দ্রুত ট্রাম্পের ভূমিকাকে স্বীকৃতি দেয় এবং তাকে নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য মনোনয়নও দেয়। আর এই পুরস্কারটি পাওয়ার দাবি ট্রাম্প নিজেও বহুবার করেছেন।
প্রথম মেয়াদে পাকিস্তানকে ‘প্রতারণা ও মিথ্যার দেশ’ বলেছিলেন ট্রাম্প। কিন্তু এখন তিনি নিয়মিত পাকিস্তানের নেতৃত্বের প্রশংসা করেন। বিশেষ করে ভারতবিরোধী যুদ্ধ পরিচালনায় নেতৃত্ব দেয়া সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরকে। ভারতের অস্বস্তি আরও বাড়ে যখন ট্রাম্প আসিম মুনিরকে হোয়াইট হাউসে মধ্যাহ্নভোজের আমন্ত্রণ জানান। কোনও পাকিস্তানি সেনাপ্রধানকে এভাবে মার্কিন প্রেসিডেন্টের আতিথ্য দেয়ার ঘটনা এটিই প্রথম।
ট্রাম্প আসিম মুনিরকে নিজের ‘প্রিয় ফিল্ড মার্শাল’ এবং ‘অসাধারণ মানুষ’ বলেও উল্লেখ করেছেন। অথচ ভারত একই ব্যক্তিকে ভারতের বিরুদ্ধে ‘সন্ত্রাসবাদের স্থপতি’ হিসেবে তুলে ধরে।
দীর্ঘদিন ধরে পাকিস্তানকে ঘিরে ভারতের নীতি ছিল ‘কৌশলগত সংযম’ বা স্ট্র্যাটেজিক রেস্ট্রেইন্ট। ১৯৯০-এর দশকে অর্থনীতি উন্মুক্ত করার পর ভারত নিজেকে অর্থনৈতিক উন্নয়নকেন্দ্রিক, দায়িত্বশীল উদীয়মান শক্তি হিসেবে তুলে ধরতে শুরু করে। কূটনৈতিক প্রভাব ও ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক শক্তি ব্যবহার করে পাকিস্তানের ওপর চাপ সৃষ্টি করাই ছিল তাদের লক্ষ্য। একই সঙ্গে দুই পারমাণবিক শক্তিধর দেশের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ এড়াতে চেয়েছিল নয়াদিল্লি।
এই নীতির কারণেই কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন সরকার ২০০৮ সালের মুম্বাই হামলার পরও পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সামরিক হামলা চালায়নি। কিন্তু তখন বিরোধী দলে থাকা নরেন্দ্র মোদির ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) কংগ্রেসের এই সংযমের তীব্র সমালোচনা করেছিল। তবে ক্ষমতায় এসে শুরুতে মোদিও পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা করেছিলেন। তিনি তৎকালীন পাকিস্তানি প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফকে নিজের শপথ অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানান। এমনকি নওয়াজ শরিফের নাতনির বিয়েতে যোগ দিতে লাহোরও সফর করেন।
কিন্তু পাকিস্তানকে দায়ী করে কয়েকটি বড় সশস্ত্র হামলার পর নয়াদিল্লির অবস্থান বদলে যায়। বিশেষ করে ২০১৬ সালের হামলার পর, যার প্রেক্ষিতে মোদি পাকিস্তানকে একঘরে করার ঘোষণা দিয়েছিলেন। এরপর মোদি সরকারের মূল নীতিতে পরিণত হয়— ‘সন্ত্রাস ও আলোচনা একসঙ্গে চলতে পারে না।’
ভারত অভিযোগ করতে থাকে, পাকিস্তান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো হামলা চালাচ্ছে। এসব হামলার জবাবে সামরিক শক্তি ব্যবহারের সীমাও ধীরে ধীরে কমিয়ে আনে নয়াদিল্লি। ২০১৬ সালের হামলার পর ভারতীয় সেনাবাহিনী পাকিস্তান-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে অভিযান চালায়। তাদের দাবি ছিল, সেখানকার কিছু ঘাঁটি ভারতবিরোধী হামলার জন্য ব্যবহৃত হচ্ছিল।
এরপর ২০১৯ সালে ভারত-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের পুলওয়ামায় ৪০ ভারতীয় সেনা নিহত হওয়ার পর ভারতীয় যুদ্ধবিমান পাকিস্তানের বালাকোটে হামলা চালায়। ২০১৬ সালের তুলনায় সেটি ছিল আরও বড় ধরনের সামরিক প্রতিক্রিয়া।
অনেক বছর ধরে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ভারতের কঠোর অবস্থান কার্যকর বলেই মনে হচ্ছিল। ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদ এবং পরবর্তী জো বাইডেন প্রশাসনের সময়ও সেই প্রবণতা দেখা যায়। মোদি নিয়মিত ওয়াশিংটন সফর করেছেন। ট্রাম্প ও বাইডেন দুজনই ভারত সফর করেছেন, কিন্তু কেউ পাকিস্তানে যাননি। তবে গত বছরের সামরিক সংঘাতের পর পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে।
ওয়াশিংটন ও নয়াদিল্লির দুই দশকের বেশি সময়ের কৌশলগত সম্পর্ক আগে থেকেই চাপের মুখে ছিল। ট্রাম্পের শুল্কযুদ্ধের সময় বিশ্বের মধ্যে সর্বোচ্চ হারে শুল্ক আরোপ করা হয়েছিল ভারতের ওপর। পরবর্তীতে বাণিজ্য আলোচনার কারণে সেই শুল্ক কিছুটা কমানো হলেও উত্তেজনা পুরোপুরি দূর হয়নি।
এ সপ্তাহে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ভারত সফরে গেলে দিল্লিতে যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসে আয়োজিত স্বাধীনতার ২৫০ বছর পূর্তি অনুষ্ঠানে অংশ নেন। সেখানে ফোনে যুক্ত হয়ে ট্রাম্প বলেন, তিনি ‘ভারতকে ভালোবাসেন, মোদিকে ভালোবাসেন।’
তবে একই সময়ে ট্রাম্প প্রশাসন বাণিজ্য ইস্যুতে ভারতের ওপর চাপ অব্যাহত রেখেছে। ২৩ মে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে রুবিও লিখেছিলেন, আগামী পাঁচ বছরে ভারত ৫০০ বিলিয়ন ডলারের মার্কিন পণ্য কিনতে সম্মত হয়েছে। এমন সময়ে এই ঘোষণা আসে, যখন ভারতের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে আসছিল।
এ ছাড়া ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বাণিজ্য ঘাটতির কথা উল্লেখ করে ভারতের ওপর ট্রাম্পের শুল্ক আরোপকেও যৌক্তিক বলে ব্যাখ্যা করেন রুবিও। যুক্তরাষ্ট্রের ভারতের পণ্য রপ্তানি আমদানির চেয়ে অনেক বেশি। ভারত সফরে সাংবাদিকেরা ওয়াশিংটনের পাকিস্তান-সম্পর্ক এবং তার প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন করলে রুবিও বলেন, ‘পৃথিবীর কোনও দেশের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ককে আমি ভারতের সঙ্গে আমাদের কৌশলগত জোটের ক্ষতির কারণ হিসেবে দেখি না।’
তবে বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করার ভারতের প্রচেষ্টা দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক সংহতিকেও ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। একই সঙ্গে ভারতের অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক নীতির কিছু পরিবর্তন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তার অবস্থানকে দুর্বল করেছে।
২০১৪ সালের মে মাসে প্রথমবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেয়ার সময় মোদির অনুষ্ঠানে দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশের নেতারা উপস্থিত ছিলেন। সে সময় তিনি তার পররাষ্ট্রনীতিকে ‘প্রতিবেশী প্রথম’ নীতির ওপর ভিত্তি করে গড়ে তোলার কথা বলেছিলেন। কিন্তু দুই বছর পর ২০১৬ সালের ওই হামলার পর মোদি সরকার ঘোষণা দেয় যে তারা দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা বা সার্কের শীর্ষ সম্মেলন বয়কট করবে। কারণ সেসময় এর আয়োজক দেশ ছিল পাকিস্তান।
ফলে সম্মেলনটি বাতিল হয়ে যায়। এরপর থেকে দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই আঞ্চলিক জোটের শীর্ষ পর্যায়ের কোনও বৈঠক আর অনুষ্ঠিত হয়নি। এর পরিবর্তে ভারত পাকিস্তানবিহীন আঞ্চলিক জোট বিমসটেককে শক্তিশালী করার চেষ্টা করে। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো নিয়ে গঠিত এই জোট এখনও উল্লেখযোগ্য প্রভাবশালী প্ল্যাটফর্মে পরিণত হতে পারেনি।
ইসলামাবাদের কায়েদ-ই-আজম বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের এমেরিটাস অধ্যাপক ইশতিয়াক আহমদ বলেন, ‘পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করার প্রচেষ্টায় ভারত কার্যত সার্ককে পরিত্যাগ করেছে।’
এদিকে শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর বাংলাদেশের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্কও উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হয়েছে। শেখ হাসিনাকে ভারতঘনিষ্ঠ নেতা হিসেবে দেখা হতো। অন্যদিকে চীনের সঙ্গে পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের কৌশলগত সম্পর্ক গত বছরের সংঘাতের সময় আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। পাকিস্তান চীনের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং যুদ্ধবিমান ব্যবহার করে।
এ সপ্তাহের শুরুতে প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফের চীন সফরের সময় দেশটির প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং পাকিস্তানের সঙ্গে বেইজিংয়ের ‘অটুট’ সম্পর্কের প্রশংসা করেন। তবে মোদির আমলে ভারত শুধু সার্ক থেকেই দূরে সরে যায়নি। কিছু বিশ্লেষকের মতে, দেশটি তার ঐতিহ্যগত ‘কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন’ নীতিও অনেকটা পরিত্যাগ করেছে।
এই নীতির মূল ধারণা ছিল বিশ্বের সব আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক রাখা, কিন্তু কোনও একটি শক্তির বলয়ে সম্পূর্ণভাবে ঢুকে না পড়া। ১৯৬০-এর দশকের শুরু থেকে ভারত জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছিল। নতুন স্বাধীনতা পাওয়া ১২০টি দেশের এই জোট যুক্তরাষ্ট্র বা সোভিয়েত ইউনিয়ন, কোনও পক্ষের সামরিক জোটে যোগ দেয়নি।
এমনকি জাতিসংঘ অনুমোদন না দিলে অন্য দেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ বা নিষেধাজ্ঞার মতো পদক্ষেপ সমর্থন করত না ভারত।
ব্রাসেলসভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক প্রভীন দন্থি আল জাজিরাকে বলেন, ‘গত এক দশকে অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধির কারণে ভারত আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আরও আত্মবিশ্বাসী ও উচ্চাভিলাষী হয়েছে। ফলে ভারসাম্যপূর্ণ ও অনেকটাই জোটনিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতি থেকে সরে গিয়ে দেশটি আরও বেশি লেনদেনভিত্তিক কূটনীতির দিকে ঝুঁকেছে।’
এই পরিবর্তনের প্রাথমিক ইঙ্গিত অবশ্য মোদির পূর্বসূরি মনমোহন সিংয়ের সময়েই দেখা যায়। ২০১৩ সালে বারাক ওবামা প্রশাসন ইরানের ওপর চাপ বাড়াতে বিভিন্ন দেশকে তেহরানের কাছ থেকে তেল কেনা কমাতে বললে ভারতও ইরানি তেল আমদানি কমিয়ে দেয়।
আর ২০১৮ সালে ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে ‘সর্বোচ্চ চাপ’ নীতি গ্রহণ করে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলে মোদি সরকার পুরোপুরি ইরানি তেল আমদানি বন্ধ করে দেয়।
ভারতের অন্যতম প্রভাবশালী সংবাদপত্র ‘দ্য হিন্দু’র কূটনৈতিক সম্পাদক সুহাসিনী হায়দার ২২ এপ্রিল এক নিবন্ধে লেখেন, ‘এসব নিষেধাজ্ঞা শুধু ভারতের অর্থনীতিকেই ক্ষতিগ্রস্ত করে না, বরং ভারতের পররাষ্ট্রনীতিকে অন্যের ইচ্ছার কাছে নত করতেও বাধ্য করে। এটি ভারতের গর্বের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের নীতির জন্যও আঘাত।’
ইসরায়েল-ফিলিস্তিন প্রশ্নেও ভারতের অবস্থানে বড় পরিবর্তন এসেছে। ১৯৭৪ সালে ভারত ছিল প্রথম অ-আরব দেশ, যারা ফিলিস্তিনি জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে প্যালেস্টাইন লিবারেশন অর্গানাইজেশন (পিএলও)-কে স্বীকৃতি দেয়। ১৯৮৮ সালে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেয়া প্রথম দিকের দেশগুলোর মধ্যেও ছিল ভারত। অন্যদিকে, ইসরায়েলের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করা হয় ১৯৯২ সালে। যদিও তারও কয়েক বছর আগে থেকে নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা খাতে দুই দেশের মধ্যে গোপন সহযোগিতা চলছিল।
স্নায়ুযুদ্ধ-পরবর্তী দুই দশকে ভারত ধীরে ধীরে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়ালেও একই সঙ্গে ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের দাবির প্রতি দৃঢ় ও সরব সমর্থন বজায় রেখেছিল। কিন্তু মোদির আমলে পরিস্থিতি বদলে যায়। ভারত এখন ইসরায়েলের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্রদের একটি এবং দেশটির সবচেয়ে বড় অস্ত্র ক্রেতা।
জাতিসংঘে ইসরায়েলবিরোধী প্রস্তাবের ভোটে ভারত ক্রমশ বিরত থাকা শুরু করেছে। গত মাসে ব্রিকস জোটের এক সম্মেলনে ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাত নিয়ে যৌথ ঘোষণার ভাষা নরম করারও চেষ্টা করে নয়াদিল্লি। এটিকে দীর্ঘদিনের ‘দুই রাষ্ট্র সমাধান’ সমর্থনকারী অবস্থান থেকে বিচ্যুতি হিসেবে দেখা হয়।
গাজায় চলমান গণহত্যারও কোনও পর্যায়ে প্রকাশ্যে নিন্দা জানায়নি ভারত। ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করার মাত্র দুই দিন আগে মোদি ইসরায়েল সফর করেন। এমন এক সময়ে এই সফর হয়, যখন মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলকে ক্রমবর্ধমানভাবে আঞ্চলিক প্রভাবশালী শক্তি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ভারতের বিরোধী দলগুলো এই সফরকে ‘সময়োপযোগী নয়’ বলে সমালোচনা করে। তাদের মতে, এতে ভারতকে মধ্যপ্রাচ্যে নিরপেক্ষ নয়, বরং পক্ষপাতদুষ্ট পক্ষ হিসেবে দেখা হতে পারে। অথচ অঞ্চলটি ভারতের জ্বালানি আমদানির প্রধান উৎস। প্রভীন দন্থি বলেন, ‘ইরান যুদ্ধ ভারতের জন্য কঠিন পরিস্থিতি তৈরি করেছে, কারণ ইসরায়েলের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক অনেক গভীর হয়েছে।’
আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) গ্রেপ্তারি পরোয়ানা থাকা সত্ত্বেও মোদি ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুকে নিজের বন্ধু বলে উল্লেখ করেছেন। বিশ্লেষকদের মতে, ইসরায়েলের প্রতি এই প্রকাশ্য সমর্থন উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে ভারতের সম্পর্ককে জটিল করে তুলেছে। ঠিক একই সময়ে পাকিস্তান তেলসমৃদ্ধ উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদ (জিসিসি)ভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতা আরও জোরদার করেছে।
গাজা, পশ্চিম তীর, লেবানন, ইরান, কাতার ও সিরিয়াকে ঘিরে ইসরায়েলের ধারাবাহিক সামরিক অভিযান ও যুদ্ধের পর উপসাগরীয় দেশগুলোও ধীরে ধীরে যুক্তরাষ্ট্রনির্ভর নিরাপত্তা ব্যবস্থার বাইরে নতুন বিকল্প খুঁজতে শুরু করেছে। গত সেপ্টেম্বর সৌদি আরব পাকিস্তানের সঙ্গে পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি ঘোষণা করে। পারমাণবিক অস্ত্রধারী একমাত্র মুসলিম দেশ হলো পাকিস্তান। কিছু প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উপসাগরীয় আরও কয়েকটি দেশ এবং এই অঞ্চলের অন্যতম শক্তিশালী সামরিক শক্তি তুরস্কও ভবিষ্যতে এই প্রতিরক্ষা কাঠামোয় যুক্ত হতে পারে।
গত মে মাসের ভারত-পাকিস্তান সংঘাত পাকিস্তানকে একটি নির্ভরযোগ্য নিরাপত্তা অংশীদার হিসেবেও তুলে ধরেছে। এরপর থেকে পাকিস্তানি যুদ্ধবিমানের চাহিদা বেড়েছে এবং চীনা সামরিক প্রযুক্তিও বিশ্বজুড়ে নতুন করে আলোচনায় এসেছে। অন্যদিকে ভারতে মোদি সরকারের মুসলিমবিরোধী নীতির অভিযোগ দেশটির প্রতিবেশী বাংলাদেশ থেকে শুরু করে মালদ্বীপ পর্যন্ত বিভিন্ন দেশের সঙ্গে উত্তেজনা বাড়িয়েছে। উপসাগরীয় দেশগুলো থেকেও মাঝেমধ্যে সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছে নয়াদিল্লিকে।
২০২২ সালের মে মাসে বিজেপির তৎকালীন মুখপাত্র নূপুর শর্মা মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) সম্পর্কে অবমাননাকর মন্তব্য করেন। এতে উপসাগরীয় অঞ্চলে ব্যাপক ক্ষোভ তৈরি হয়। বিভিন্ন দেশ ভারতীয় কূটনীতিকদের তলব করে এবং প্রকাশ্যে নিন্দা জানায়। পরিস্থিতি সামাল দিতে পরে বিজেপি নূপুর শর্মাকে দলীয় কার্যক্রম থেকে দূরে সরিয়ে দেয়।
২০১৪ সালে মোদি ক্ষমতায় আসার পর থেকে মুসলিমদের ওপর গণপিটুনি, মসজিদ ভাঙচুর, রাষ্ট্রীয়ভাবে বৈষম্যমূলক পদক্ষেপ এবং মুসলিমদের ধর্মীয় অনুষ্ঠান ও ইবাদতের ওপর বিধিনিষেধের ঘটনা বারবার সংবাদ শিরোনামে এসেছে। মানবাধিকার সংগঠন ও পর্যবেক্ষক সংস্থাগুলো ভারতে সংখ্যালঘুদের প্রতি বাড়তে থাকা বৈষম্য ও নির্যাতন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
পাকিস্তান এসব ঘটনাকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ভারতের বিরুদ্ধে ব্যবহার করেছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের আমলে ইসলামাবাদ জাতিসংঘে ভারতসহ বিভিন্ন দেশে বাড়তে থাকা ইসলামবিদ্বেষের বিষয়টি জোরালোভাবে তুলে ধরে। ইসলামিক সহযোগিতা সংস্থা (ওআইসি)-এর সঙ্গে সমন্বয় করে পাকিস্তান জাতিসংঘকে ১৫ মার্চকে ‘আন্তর্জাতিক ইসলামোফোবিয়া প্রতিরোধ দিবস’ ঘোষণার জন্য সফলভাবে চাপ দেয়।
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ট্রাম্প ক্ষমতায় ফেরার পর পাকিস্তান তার প্রশাসনের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ খনিজসম্পদ ও ক্রিপ্টোকারেন্সি খাতকে কাজে লাগিয়েছে।

ডেস্ক রিপোর্ট 


















