২০২৫ সালে পেহেলগাম হত্যাকাণ্ড ঘিরে সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে পাকিস্তান ও ভারত। স্বল্পমেয়াদি ওই যুদ্ধে ভারতের বিমানবাহিনীর বহরে থাকা অত্যাধুনিক রাফায়েল যুদ্ধবিমান ভূপাতিতের দাবি করেছিল ইসলামাবাদ। যুদ্ধকালীন সময় ফ্রান্সের তৈরি রাফায়েল যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করতে পাকিস্তানকে কারিগরি সহায়তা করার কথা অবশেষে স্বীকার করেছে চীন।
বৃহস্পতিবার (৭ মে) চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার মাধ্যম সিসিটিভিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এ কথা স্বীকার করেন এভিয়েশন ইন্ডাস্ট্রি করপোরেশন অব চায়নার (এভিআইসি) চেংডু এয়ারক্রাফট ডিজাইন অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটের প্রকৌশলী ঝাং হেং। এই প্রকৌশলী পাকিস্তানকে প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদানকারীদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন। চেংডু এয়ারক্রাফট চীনের উন্নত যুদ্ধবিমান ও ড্রোনের নকশার অন্যতম প্রধান নির্মাতা।
সাক্ষাৎকারে ঝাং হেং বলেন, ‘সহায়ক ঘাঁটিতে আমরা প্রায়ই যুদ্ধবিমানের উড্ডয়নের গর্জন ও বিমান হামলার সাইরেনের একটানা আর্তনাদ শুনতাম। মে মাসের বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গেই তাপমাত্রা প্রায় ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি পৌঁছে যেত। এটা আমাদের জন্য মানসিক ও শারীরিকভাবে এক চরম অগ্নিপরীক্ষা ছিল।’
রাফায়েল যুদ্ধবিমান ভূপাতিতে চীনের তৈরি জে-১০সিই যুদ্ধবিমান ব্যবহার করেছিল পাকিস্তানের বিমানবাহিনী। ঝাং হেং জানান, তার দল মূলত এই লক্ষ্য থেকেই কাজ করছে যে, ঘটনাস্থলে সহায়তা আরও কার্যকরভাবে দেওয়া যায় এবং তাদের সরঞ্জাম যেন পুরো যুদ্ধক্ষমতা অনুযায়ী সঠিকভাবে কাজ করতে পারে।
তিনি বলেন, রাফায়েল ভূপাতিত করা শুধু জে-১০সিই-এর সক্ষমতার স্বীকৃতিই ছিল না; বরং রাতদিন একসেঙ্গ কাজ করার মাধ্যমে আমাদের মধ্যে যে গভীর বন্ধন তৈরি হয়েছে, এটি তারও একটি প্রমাণ।
চেংডু এয়ারক্রাফটের আরেক কর্মকর্তা জু দা জে-১০সিই যুদ্ধবিমানকে ‘সন্তানের’ সঙ্গে তুলনা করেছেন। তিনি বলেন, আমরা যুদ্ধবিমানটি সন্তানের মতো লালনপালন করেছি, যত্ন নিয়েছি। অবশেষে ব্যবহারকারীর হাতে তুলে দিয়েছি। আর এটি বড় পরীক্ষার সম্মুখীন হয়েছিল। জে-১০সিই যে অসাধারণ ফলাফল অর্জন করেছে, তাতে আমরা খুব একটা অবাক হইনি।
সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে জু দা আরও বলেন, আসলে, এই ফলাফল অবশ্যম্ভাবী বলেই মনে হয়েছিল। বিমানটির শুধু সঠিক সুযোগের প্রয়োজন ছিল। আর যখন সেই মুহূর্তটি এলো, এটি ঠিক তেমনই ফল দিয়েছে যেমনটা আমরা আশা করতাম।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, চীন প্রথমবারের মতো নিশ্চিত করেছে যে, গত বছর ভারতের সঙ্গে পাকিস্তানের যুদ্ধের সময় তারা ঘটনাস্থলে কারিগরি সহায়তা প্রদান করেছিল। নয়াদিল্লিতে এই যুদ্ধটি ‘অপারেশন সিঁদুর’ নামে পরিচিত। ইসলামাবাদে পরিচিত ‘অপারেশন বুনিয়ান-উন-মারসুস’ নামে।
গত বছর ২২ এপ্রিল জম্মু ও কাশ্মীরের পেহেলগামে সন্ত্রাসী হামলায় ২৬ জন নিহত হওয়ার পর ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধি পায়। ওই ঘটনার জন্য পাকিস্তানকে দায়ী করে থাকে ভারত। এর জবাবে ভারত ‘অপারেশন সিঁদুর’ পরিচালনা করে, যার লক্ষ্য ছিল পাকিস্তান ও পাকিস্তান-অধিকৃত কাশ্মীরে অবস্থিত ‘সন্ত্রাসী’ নয়টি স্থান। ভারতের এই পদক্ষেপের ফলে জইশ-ই-মোহাম্মদ, লস্কর-ই-তৈবা এবং হিজবুল মুজাহিদিনসহ বিভিন্ন গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত ১০০ জনেরও বেশি ‘সন্ত্রাসী’ নিহত হয়।
চীনের সামরিক ‘পরীক্ষাগার’ পাকিস্তান
জে-১০সি ৪.৫ প্রজন্মের যুদ্ধবিমানের রপ্তানি সংস্করণ জে-১০সিই-কে জে-১০ সিরিজের সবচেয় উন্নত মডেল হিসেবে বিবেচনা করা হয়। চীনের বাইরে জে-১০সি-এর একমাত্র ব্যবহারকারী দেশ হলো পাকিস্তান। ২০২০ সালে বেইজিংয়ের কাছে এই যুদ্ধবিমান ৩৬টি এবং ২৫০টি পিএল-১৫ ক্ষেপণাস্ত্রের অর্ডার দিয়েছিল ইসলামাবাদ।
২০২৫ সালের জুলাই মাসে ভারতীয় সেনাবাহিনী জানায়, পাকিস্তানের সামরিক সরঞ্জামের ৮১ শতাংশই চীনে উৎপাদিত। আর চীন তার সামরিক প্রযুক্তি পরীক্ষার জন্য পাকিস্তানকে ‘জীবন্ত পরীক্ষাগার’ হিসেবে ব্যবহার করছে।
স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (এসআইপিআরআই) মতে, চীন ২০১৫ সাল থেকে পাকিস্তানের কাছে ৮ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার মূল্যের অস্ত্র বিক্রি করেছে। ২০২০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে চীন বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম অস্ত্র রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে স্থান করে নেয়। এই রপ্তানির প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ বা ৬৩ শতাংশ পাকিস্তানে গেছে, যা ইসলামাবাদকে চীনের সবচেয়ে বড় অস্ত্র ক্রেতায় পরিণত করেছে।

ডেস্ক রিপোর্ট 






















