আরবি শব্দ জাহান্নাম বা দোজখ (ফারসি শব্দ) গুনাহগারদের জন্য যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির আবাসস্থল। কিয়ামতের দিন যাদের আমলনামার ওপর মহান আল্লাহ তা’আলা অসন্তুষ্ট থাকবেন, তাদের শাস্তির ঠিকানা হবে জাহান্নাম। এর সাতটি স্তর রয়েছে। বিভিন্ন হাদিসে জাহান্নামের ভয়াবহ শাস্তির কথাও এসেছে।
এর মধ্যে সবচেয়ে হালকা আযাবও (শাস্তি) অত্যন্ত ভয়ংকর। এ বিষয়ে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, জাহান্নামীদের মধ্যে সবচেয়ে হালকা আযাব ওই ব্যক্তির হবে, যাকে এমন দু’টি জুতা পরিয়ে দেয়া হবে, যার তলা ও ফিতা হবে আগুনের। ফলে এর দহনে (চুলার ওপরে রাখা) পাতিলের মতো মগজ উতলাতে থাকবে। আর তার মনে হবে যে, সে-ই বুঝি সবচেয়ে বেশি শান্তি ভোগ করছে। অথচ, এটি হচ্ছে সবচেয়ে হালকা আযাব। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৪১০)
দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী সফর শেষে পরকালে সফল হতে তাই বিভিন্ন সময়ে বর্ণিত হাদিসে নবীজি (সা.) যেমন উম্মতদের উত্তম আমল করার পাশাপাশি নানা বিষয়ে আদেশ-নিষেধের কথা জানিয়েছেন, তেমনি বাতলে দিয়েছেন মহান রবের সন্তুষ্টি অর্জনের পথও। নিচে ১৩ শ্রেণির মানুষের কথা তুলে ধরা হলো, আখিরাতে যাদের ঠিকানা হবে চিরশাস্তির জাহান্নাম।
কাফির ও মুশরিক
কাফির ও মুশরিকরা জান্নাতে প্রবেশ করবে না। আখিরাতে তাদের ঠিকানা হবে জাহান্নাম। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে, নিশ্চয়ই কিতাবীদের মধ্যে যারা কুফরি করেছে ও মুশরিকরা জাহান্নামের আগুনে থাকবে স্থায়ীভাবে। তারাই হলো নিকৃষ্ট সৃষ্টি। (সুরা আল-বাইয়্যিনাহ, আয়াত: ৬)
অন্যদিকে আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত একটি হাদিসে এসেছে, ওমর ইবনু খাত্তাব (রা.) বলেছেন- খায়বারের যুদ্ধ শেষে রাসুল (সা.) এর একদল সাহাবী এসে বলতে লাগল, অমুক শহিদ, অমুক শহিদ। এভাবে কথাবার্তা চলছিল, অবশেষে এক ব্যক্তির প্রসঙ্গ আসলে তারা বললেন, সেও শহিদ হয়েছে। ওই সময় রাসুল (সা.) বললেন, কখনই না। আমি তাকে জাহান্নামে দেখেছি, চাদর বা জোব্বার কারণে (যা সেই ব্যক্তি গণিমতের মাল থেকে আত্মসাৎ করেছিল)। এরপর নবীজি (সা.) বললেন, হে খাত্তাবের পুত্র! যাও লোকদের মধ্যে ঘোষণা করে দাও যে, জান্নাতে কেবলমাত্র প্রকৃত মুমিন ব্যক্তিরাই প্রবেশ করবে। এরপর ওমর ইবনু খাত্তাব (রা.) বলেন, তারপর আমি বের হলাম এবং ঘোষণা করে দিলাম- ‘সাবধান! শুধু প্রকৃত মুমিনরাই জান্নাতে প্রবেশ করবে।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২১০)
শিরককারী ও অহংকারী ব্যক্তি
শিরক কবিরা গুনাহের (বড় গুনাহ) মধ্যে সবচেয়ে বড় গুনাহ। মহান আল্লাহ শিরক করাকে ক্ষমা করেন না। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর সঙ্গে শরিক করাকে ক্ষমা করেন না। তিনি ক্ষমা করেন এছাড়া অন্যান্য পাপ, যা তিনি চান। আর যে আল্লাহর সঙ্গে শরিক করে, সে অবশ্যই মহাপাপ রচনা করে। (সুরা নিসা, আয়াত: ৪৮)
অন্যদিকে আবদুল্লাহ ইবনু মাসঊদ (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যার অন্তরে সরিষার দানা পরিমাণ ঈমান থাকবে, সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে না। আর যে ব্যক্তির অন্তরে এক সরিষার দানা পরিমাণ অহমিকা (অহংকার) থাকবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৬৮)
আমানতের খিয়ানতকারী ও প্রতারণাকারী
রাসুল (সা.) বলেছেন- পাঁচ প্রকার মানুষ জাহান্নামী হবে। ১) এমন দুর্বল মানুষ, যাদের মধ্যে (ভাল-মন্দ) পার্থক্য করার বুদ্ধি নেই, যারা তোমাদের এমন তাবেদার যে, না তারা পরিবার-পরিজন চায়, না ধনৈশ্বর্য। ২) এমন খিয়নতকারী মানুষ, সাধারণ বিষয়েও যে খিয়ানত করে, যার লোভ কারও কাছেই লুকায়িত নেই। ৩) ওই লোক, যে তোমার পরিবার-পরিজন এবং ধন-সম্পদের ব্যাপারে তোমার সঙ্গে সকাল-সন্ধ্যা প্রতারণা করে। ৪) কৃপণতা ও ৫) নবীজি (সা.) মিথ্যা বলার কথাও উল্লেখ করেছেন। আর বলেছেন- ‘শিনজীর’। শিনজীর হলো চরম অশ্লীলতাবাদী। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৬৯৪৩)
মিথ্যা কসমকারী
প্রয়োজনে আল্লাহর নামে কসম কাটা জায়েজ থাকলেও মিথ্যা কসম কাটায় কঠোর নিষেধ রয়েছে। আখিরাতে মিথ্যা কসমকারীর জন্য রয়েছে ভয়ংকর শাস্তি। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই যারা আল্লাহর সঙ্গে কৃত অঙ্গীকার এবং নিজেদের শপথকে তুচ্ছ মূল্যে বিক্রয় করে, এরা আখিরাতের কোনো অংশই পাবে না এবং আল্লাহ কিয়ামতের দিন তাদের সঙ্গে কথা বলবেন না, তাদের প্রতি দৃষ্টিপাত করবেন না এবং তাদের পবিত্র করবেন না, বস্তুত তাদের জন্য আছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি। (সুরা আল-ইমরান, আয়াত: ৭৭)
অন্যদিকে মিথ্যা কসম কাটা কবিরা গুনাহের (বড় পাপ) মধ্যে অন্যতম। আবদুল্লাহ ইবনু আমর (রা.) সূত্রে মুহাম্মদ ইবনু মুকাতিল (রহ.) থেকে বর্ণিত হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন- কবিরা গুনাহসমূহের অন্যতম হচ্ছে আল্লাহ তা’আলার সঙ্গে শরিক করা, পিতা-মাতার নাফরমানী করা, কাউকে হত্যা করা এবং মিথ্যা কসম করা। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬২১৯)
এছাড়াও মিথ্যা কসমকারীর জন্য পরকালে জাহান্নাম অবধারিত। ইমরান ইবন হুসাইন (রা.) থেকে বর্ণিত একটি হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি কোনো হাকিমের (বিচারক) আদালতে বন্দি থাকা অবস্থায় মিথ্যা কসম খায়, সে যেন তার আবাসস্থল জাহান্নামে বানিয়ে নেয়। (সুনান আবু দাউদ, হাদিস: ৩২২৭)
সর্বদা মদ্যপায়ী ও পিতা-মাতার অবাধ্য সন্তান
ইবনু উমার (রা.) থেকে বর্ণিত একটি হাদিসে আরও ৩ শ্রেণির জাহান্নামীদের কথা এসেছে। হাদিসটি হলো- রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন- ৩ শ্রেণির লোকের জন্য আল্লাহ তা’আলা জান্নাত হারাম করে দিয়েছেন। সর্বদা মদ্যপায়ী, পিতা-মাতার অবাধ্য সন্তান এবং দাইয়ূস (পাপাচারের মতো কাজে যে পরিবারকে বাধা দেয় না)। (মেশকাত, হাদিস: ৩৬৫৫)

ডেস্ক রিপোর্ট 


















