ঢাকা , শনিবার, ২৯ অগাস্ট ২০২৬, ১৪ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম ::
‘যুদ্ধবাজ’ ইসরায়েল মধ্যপ্রাচ্যের শান্তির জন্য হুমকি: এরদোগান প্রাণের ভয়ে গৃহবন্দী জীবন কাটাচ্ছেন ট্রাম্পের ছোট ছেলে বিকেলের মধ্যে ২৮৯৪ মেগাওয়াট লোডশেডিংয়ের শঙ্কা, ভোগাবে রাতেও সরকারের একার পক্ষে সবকিছু করা সম্ভব নয়: আইনমন্ত্রী মক্কা চুক্তির বিষয়ে সবকিছু বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেবে সরকার: আইনমন্ত্রী গুম-খুনের শিকার ও শহীদ পরিবারের হাতে চাকরির নিয়োগপত্র দিলেন প্রধানমন্ত্রী ব্রাহ্মণবাড়িয়া ইস্যুতে সরকারকে চাপে ফেলতে গিয়ে নিজেই ‘বিপাকে’ হাসনাত আবদুল্লাহ বিদ্যুৎ ও জ্বালানিসংকট : প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক হলেই মিলবে সমাধান ইরান তেল বিক্রি করতে না পারলে কেউ পারবে না: গালিবাফ কওমি শিক্ষার্থীদের সজাগ থাকতে বললেন রাশেদ খাঁন

গ্যাস বিদ্যুৎ সংকটের দায় এড়িয়ে বিএনপি কী করছে?

  • ডেস্ক রিপোর্ট
  • আপডেট সময় ০১:১৬:৩৬ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৯ অগাস্ট ২০২৬
  • ২০ বার পড়া হয়েছে

বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর প্রথম ছয় মাসেই তেল, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে সামনে এসেছে। গ্রাম থেকে শহর—ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে ভোগান্তিতে সাধারণ মানুষ। এর প্রভাব পড়েছে শিল্প উৎপাদন, ব্যবসা-বাণিজ্যেও।

বৃহস্পতিবার বিকেলেও সারাদেশে লোডশেডিং সাড়ে তিন হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যায়। চলতি বছরের ১০ আগস্ট সর্বোচ্চ তিন হাজার ৭৫৭ মেগাওয়াট লোডশেডিংয়ের রেকর্ড হয়।

সরকারের পক্ষ থেকে বর্তমান সংকটের জন্য এলএনজি টার্মিনালে দুর্ঘটনা, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ এবং অতীত সরকারের আমলে নেওয়া জ্বালানি নীতিকে দায়ী করা হচ্ছে। তবে জ্বালানি বিশ্লেষকদের কেউ কেউ বলছেন, সংকটের পেছনে পুরোনো সমস্যার পাশাপাশি বর্তমান সরকারের ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতাও রয়েছে।

তেল-গ্যাস-খনিজসম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির সাবেক সদস্যসচিব অধ্যাপক আনু মুহাম্মদের মতে, ছয় মাসে দীর্ঘদিনের সংকট পুরোপুরি সমাধান করা সম্ভব নয়। তবে পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকারের ব্যবস্থাপনায় আরও সক্রিয়তা প্রয়োজন ছিল।

তার অভিযোগ, সংকটের কারণ চিহ্নিত করে দ্রুত সমাধানের পথ বের করার বদলে সরকার এখনো কার্যকর কোনো রোডম্যাপ দিতে পারেনি।

অন্যদিকে পাওয়ার সেলের সাবেক মহাপরিচালক বি ডি রহমতউল্লাহর মতে, সংকট মোকাবিলায় সরকারের তাৎক্ষণিক বা ‘ক্রাশ প্রোগ্রাম’ প্রয়োজন ছিল। তার অভিযোগ, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার কথা বলা হলেও বর্তমান লোডশেডিং কমাতে জরুরি পদক্ষেপ দৃশ্যমান নয়।

তবে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, পরিস্থিতি সামাল দিতে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এরই মধ্যে সাগরে গ্যাস অনুসন্ধান, নতুন এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ, দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন বাড়ানো এবং ভোলার গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

এ ছাড়া আগামী পাঁচ বছরে ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রাও নির্ধারণ করেছে সরকার।

তবে বিশ্লেষকদের প্রশ্ন, এসব দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগের পাশাপাশি তাৎক্ষণিক বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় কী করা হচ্ছে?

বাংলাদেশে বর্তমানে আমদানি ও ক্যাপটিভ বিদ্যুৎ মিলিয়ে ৩৩ হাজার মেগাওয়াটের বেশি উৎপাদন সক্ষমতা রয়েছে। ফলে বিদ্যমান সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে লোডশেডিং কিছুটা কমানো সম্ভব বলে মনে করছেন কেউ কেউ।

বিশ্লেষকদের মতে, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন বাড়ানো, পিক আওয়ারে তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর ব্যবহার বাড়ানো এবং দেশীয় গ্যাস ও এলএনজির দক্ষ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে স্বল্পমেয়াদে পরিস্থিতির উন্নতি করা যেতে পারে।

তবে সংকটের পেছনে আন্তর্জাতিক বাস্তবতাও রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এবং হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে অনিশ্চয়তায় তেল-গ্যাস আমদানি ব্যাহত হচ্ছে। ফলে স্পট মার্কেট থেকে বাড়তি দামে জ্বালানি কিনতে হচ্ছে, যা সরকারের ভর্তুকির ওপরও চাপ বাড়াচ্ছে।

একই সঙ্গে গত কয়েক বছরে গুরুত্বপূর্ণ বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ না হওয়া এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের বড় অংশকে সরিয়ে দেওয়ার প্রভাবও পড়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

আনু মুহাম্মদের মতে, গত দুই দশকের আমদানিনির্ভর জ্বালানি নীতিরই পরিণতি বর্তমান সংকট। তার মতে, দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানের পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে গুরুত্ব বাড়াতে হবে।

সরকার অবশ্য বলছে, বর্তমান সংকট একদিনে তৈরি হয়নি। দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত সমস্যার সঙ্গে যুদ্ধ ও আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা যুক্ত হয়েছে। তবে ব্যবস্থাপনায় কিছু সমস্যা থাকতে পারে—এটিও সরকার পুরোপুরি অস্বীকার করছে না।

সব মিলিয়ে, বর্তমান সরকারের সামনে এখন বড় প্রশ্ন—দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি পরিকল্পনার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের লোডশেডিংয়ের ভোগান্তি কমাতে কত দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া যায়। কারণ বিদ্যুৎ ও গ্যাসের এই সংকট শুধু ঘরের আলো-ফ্যানেই সীমাবদ্ধ নয়; এর প্রভাব পড়ছে শিল্প, ব্যবসা এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতেও।

ট্যাগস

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

জনপ্রিয় সংবাদ

‘যুদ্ধবাজ’ ইসরায়েল মধ্যপ্রাচ্যের শান্তির জন্য হুমকি: এরদোগান

গ্যাস বিদ্যুৎ সংকটের দায় এড়িয়ে বিএনপি কী করছে?

আপডেট সময় ০১:১৬:৩৬ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৯ অগাস্ট ২০২৬

বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর প্রথম ছয় মাসেই তেল, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে সামনে এসেছে। গ্রাম থেকে শহর—ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে ভোগান্তিতে সাধারণ মানুষ। এর প্রভাব পড়েছে শিল্প উৎপাদন, ব্যবসা-বাণিজ্যেও।

বৃহস্পতিবার বিকেলেও সারাদেশে লোডশেডিং সাড়ে তিন হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যায়। চলতি বছরের ১০ আগস্ট সর্বোচ্চ তিন হাজার ৭৫৭ মেগাওয়াট লোডশেডিংয়ের রেকর্ড হয়।

সরকারের পক্ষ থেকে বর্তমান সংকটের জন্য এলএনজি টার্মিনালে দুর্ঘটনা, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ এবং অতীত সরকারের আমলে নেওয়া জ্বালানি নীতিকে দায়ী করা হচ্ছে। তবে জ্বালানি বিশ্লেষকদের কেউ কেউ বলছেন, সংকটের পেছনে পুরোনো সমস্যার পাশাপাশি বর্তমান সরকারের ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতাও রয়েছে।

তেল-গ্যাস-খনিজসম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির সাবেক সদস্যসচিব অধ্যাপক আনু মুহাম্মদের মতে, ছয় মাসে দীর্ঘদিনের সংকট পুরোপুরি সমাধান করা সম্ভব নয়। তবে পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকারের ব্যবস্থাপনায় আরও সক্রিয়তা প্রয়োজন ছিল।

তার অভিযোগ, সংকটের কারণ চিহ্নিত করে দ্রুত সমাধানের পথ বের করার বদলে সরকার এখনো কার্যকর কোনো রোডম্যাপ দিতে পারেনি।

অন্যদিকে পাওয়ার সেলের সাবেক মহাপরিচালক বি ডি রহমতউল্লাহর মতে, সংকট মোকাবিলায় সরকারের তাৎক্ষণিক বা ‘ক্রাশ প্রোগ্রাম’ প্রয়োজন ছিল। তার অভিযোগ, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার কথা বলা হলেও বর্তমান লোডশেডিং কমাতে জরুরি পদক্ষেপ দৃশ্যমান নয়।

তবে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, পরিস্থিতি সামাল দিতে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এরই মধ্যে সাগরে গ্যাস অনুসন্ধান, নতুন এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ, দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন বাড়ানো এবং ভোলার গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

এ ছাড়া আগামী পাঁচ বছরে ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রাও নির্ধারণ করেছে সরকার।

তবে বিশ্লেষকদের প্রশ্ন, এসব দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগের পাশাপাশি তাৎক্ষণিক বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় কী করা হচ্ছে?

বাংলাদেশে বর্তমানে আমদানি ও ক্যাপটিভ বিদ্যুৎ মিলিয়ে ৩৩ হাজার মেগাওয়াটের বেশি উৎপাদন সক্ষমতা রয়েছে। ফলে বিদ্যমান সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে লোডশেডিং কিছুটা কমানো সম্ভব বলে মনে করছেন কেউ কেউ।

বিশ্লেষকদের মতে, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন বাড়ানো, পিক আওয়ারে তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর ব্যবহার বাড়ানো এবং দেশীয় গ্যাস ও এলএনজির দক্ষ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে স্বল্পমেয়াদে পরিস্থিতির উন্নতি করা যেতে পারে।

তবে সংকটের পেছনে আন্তর্জাতিক বাস্তবতাও রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এবং হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে অনিশ্চয়তায় তেল-গ্যাস আমদানি ব্যাহত হচ্ছে। ফলে স্পট মার্কেট থেকে বাড়তি দামে জ্বালানি কিনতে হচ্ছে, যা সরকারের ভর্তুকির ওপরও চাপ বাড়াচ্ছে।

একই সঙ্গে গত কয়েক বছরে গুরুত্বপূর্ণ বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ না হওয়া এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের বড় অংশকে সরিয়ে দেওয়ার প্রভাবও পড়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

আনু মুহাম্মদের মতে, গত দুই দশকের আমদানিনির্ভর জ্বালানি নীতিরই পরিণতি বর্তমান সংকট। তার মতে, দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানের পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে গুরুত্ব বাড়াতে হবে।

সরকার অবশ্য বলছে, বর্তমান সংকট একদিনে তৈরি হয়নি। দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত সমস্যার সঙ্গে যুদ্ধ ও আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা যুক্ত হয়েছে। তবে ব্যবস্থাপনায় কিছু সমস্যা থাকতে পারে—এটিও সরকার পুরোপুরি অস্বীকার করছে না।

সব মিলিয়ে, বর্তমান সরকারের সামনে এখন বড় প্রশ্ন—দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি পরিকল্পনার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের লোডশেডিংয়ের ভোগান্তি কমাতে কত দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া যায়। কারণ বিদ্যুৎ ও গ্যাসের এই সংকট শুধু ঘরের আলো-ফ্যানেই সীমাবদ্ধ নয়; এর প্রভাব পড়ছে শিল্প, ব্যবসা এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতেও।