এবার ‘ভোলা–বরিশাল সেতু’ নাকি নতুন প্রস্তাবনার ‘ভোলা–মেহেন্দীগঞ্জ সড়ক’ হয়ে বরিশালে আসাসহ রাজধানী ঢাকায় যাবে বিচ্ছিন্ন দ্বীপজেলা ভোলার ২২ লাখ মানুষ? এ নিয়ে কয়েক দিন ধরে চলছে চরম বিতর্ক। ভোলার মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি ভোলা–বরিশাল সেতু নির্মাণের। প্রায় ১১ কিলোমিটার দীর্ঘ সেতু আর সড়ক নির্মাণে ২০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হতে পারে। এ নিয়ে আলোচনার মধ্যেই দেশের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে ভোলাকে যুক্ত করতে ভোলা–মেহেন্দীগঞ্জ–বরিশাল সড়ক নির্মাণের প্রস্তাব অনুমোদন করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ২২ আগস্ট অনুমোদিত প্রস্তাব অনুযায়ী এতে ছয় হাজার কোটি টাকারও কম ব্যয় হবে। আর এ নিয়েই বিতর্ক চলছে। সড়কপথে নয়, সেতুর মাধ্যমে ভোলাকে বরিশালের সঙ্গে যুক্ত করার দাবিতে শুক্রবার রাজধানী ঢাকায় বিক্ষোভ অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছেন ভোলার একদল মানুষ। সড়ক নাকি সেতু, এ নিয়েও চলছে নানা আলোচনা সমালোচনা।
লাভ–লোকসানের হিসাবে ভোলা–বরিশাল সেতু : পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপের (পিপিপি) ভিত্তিতে ভোলা–বরিশাল সেতু করে দেওয়ার একটি প্রস্তাব সরকারের কাছে দিয়েছে জাপানের নির্মাতা প্রতিষ্ঠান মিগাওয়া কেনসেটু কনস্ট্রাকশন। জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহে ঢাকায় অনুষ্ঠিত উচ্চ পর্যায়ের এক বৈঠকে ওই প্রস্তাব দেওয়া হয়। প্রস্তাব অনুযায়ী ভোলা–বরিশাল সেতুর দৈর্ঘ্য হবে ১০ দশমিক ৮৬ কিলোমিটার। সম্ভাব্য ব্যয় ১৭ হাজার ৪৬৬ কোটি টাকা। সেতু নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় জমি অধিগ্রহণ এবং ভ্যাট ট্যাক্স পরিশোধ করতে হবে বাংলাদেশ সরকারকে। সব মিলিয়ে ব্যয় দাঁড়াবে ২০ হাজার কোটি টাকায়। প্রস্তাব অনুযায়ী–জমি অধিগ্রহণ শেষ করে বুঝিয়ে দেওয়ার পর কাজ শুরু করবে মিগাওয়া। সেতু নির্মাণে কমপক্ষে আট বছর লাগবে বলে জানায় মিগাওয়া। টানা ২৫ বছর টোল নেবে তারা। এ সময়ে নির্মাণ ব্যয় না উঠলে বাকি টাকা পরিশোধ করতে হবে বাংলাদেশ সরকারকে।
পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে সড়ক ও সেতু মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, প্রচলিত পদ্ধতি অনুযায়ী জমি অধিগ্রহণসহ সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম শেষে মিগাওয়াকে বুঝিয়ে দিতে কমপক্ষে তিন থেকে চার বছর লাগবে। এরপর আট বছরে মিগাওয়া সেতু নির্মাণ করতে পারলেও মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে ভোলার যুক্ত হতে সময় লাগবে ১২ বছরের বেশি। পাঁচ কিলোমিটার দীর্ঘ পদ্মা সেতুতে প্রাইভেটকারের টোল ৭৫০ টাকা। প্রস্তাবিত ভোলা–বরিশাল সেতু হবে তার দ্বিগুণ দৈর্ঘ্যরে। সেই হিসাবে এ সেতুতে প্রাইভেটকারের টোল হবে ১৬শ থেকে ১৭শ’ টাকা। অন্যসব যানবাহনের টোলও হবে একই হারে। যানবাহন চলাচলের সম্ভাব্য পরিসংখ্যান হিসাব করে দেখা গেছে, এ হারে টোল আদায় করার পরও ২৫ বছরে দুই হাজার কোটি টাকার বেশি আদায় হবে না। এর মানে নির্মাণ ব্যয়ের বাকি ১৮ হাজার কোটি টাকা পরিশোধ করতে হবে বাংলাদেশকে।
যা আছে নতুন প্রস্তাবনায় : বরিশাল হয়ে দেশের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে ভোলাকে যুক্ত করতে সড়ক নির্মাণের যে নতুন প্রস্তাব অনুমোদন দেওয়া হয়েছে সেই সড়কের যাত্রা শুরু হবে বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলার রহমতপুর থেকে। এরপর মুলাদী হয়ে সড়কটি যাবে মেহেন্দীগঞ্জে। সেখান থেকে চর মনিষা হয়ে পৌঁছাবে ভোলায়। এ সড়কের বাবুগঞ্জ ও মুলাদী উপজেলার সংযোগস্থলে থাকা মীরগঞ্জ নদীতে সেতু নির্মাণের কাজ চলছে। মীরগঞ্জ সেতু বাদ দিয়ে রহমতপুর থেকে ভোলা শহর পর্যন্ত সড়ক নেটওয়ার্ক স্থাপনে জমি অধিগ্রহণ ও ভ্যাট ট্যাক্সসহ প্রায় ছয় হাজার কোটি টাকা ব্যয় হবে। প্রকল্পের আওতায় মাসকাটা নদীর ওপর এক হাজার ৩০০ এবং ভোলাসংলগ্ন চর মনিষা এলাকায় এক হাজার ৪০০ মিটার দীর্ঘ দুটি সেতু হবে। এছাড়া কালভার্টসহ নির্মিত হবে আরো ৮৫টি ছোট সেতু। ৫৭ কিলোমিটার দীর্ঘ সড়কটি হবে দুই লেনের। সড়ক ও জনপথ বিভাগ ভোলার নির্বাহী প্রকৌশলী মাইদুল ইসলাম বলেন, এখন পর্যন্ত যে আলোচনা তাতে নিজস্ব অর্থায়নে হবে ছয় হাজার কোটি টাকার প্রকল্প। এক্ষেত্রে জমি অধিগ্রহণসহ পুরো প্রকল্প সম্পন্ন করতে চার বছরের বেশি সময় লাগবে না। তিনি আরও বলেন, ভোলা–বরিশাল সেতু হলে সেতু হয়ে ভোলার সঙ্গে বরিশালের দূরত্ব হবে ৫২ কিলোমিটার। নতুন প্রস্তাবনার সড়কে বিভাগীয় সদরে যেতে পাড়ি দিতে হবে ৭২ কিলোমিটার সড়ক। অবশ্য নতুন সড়ক ধরে গেলে ভোলা থেকে রাজধানী ঢাকার দূরত্ব কমে যাবে বর্তমানের তুলনায় ২০ কিলোমিটার। কারণ বরিশাল শহর হয়ে ভোলা–ঢাকার দূরত্ব ২২৫ কিলোমিটার সেখানে নতুন সড়কে দূরত্ব নেমে আসবে ২০৫ কিলোমিটারে। নতুন প্রস্তাব বাস্তবায়ন হলে আগামী ৪ থেকে ৫ বছরের মধ্যে দেশের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে ভোলা যুক্ত হবে। সেতুর অপেক্ষায় থাকলে সময় লাগবে কমপক্ষে ১২ বছর। সেতুর তুলনায় প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা কম খরচে এ সড়ক যোগাযোগ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
তুরুপের তাস ভোলা–মুলাদী–শরীয়তপুর–ঢাকা সড়ক : সড়ক ও জনপথ বিভাগ বরিশালের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মাসুদ খান জানান, মুলাদী উপজেলার মৃধারহাটসংলগ্ন নদীর ঠিক অপর পাড়ে শরীয়তপুর জেলার আবুপুর গোসাইরহাট। মাঝখানে মাত্র ৫০০ মিটারের ব্যবধান। এখানে সেতু নির্মিত হলে ভোলা থেকে ঢাকাগামী লোকজনকে আর বরিশাল–বাবুগঞ্জ–ভাঙ্গা হয়ে ২০৫ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে ঢাকা যেতে হবে না। গোসাইরহাট থেকে নাওডোবা হয়ে পদ্মা সেতু দিয়ে তারা যেতে পারবেন রাজধানীতে। বহু আগে থেকে গোসাইরহাট থেকে নাওডোবা পর্যন্ত সড়কও রয়েছে। এক্ষেত্রে ভোলার সঙ্গে রাজধানী ঢাকার দূরত্ব হবে ১৫৫ কিলোমিটার। যেতে সময় লাগবে মাত্র ২ ঘণ্টা ৩৫ মিনিট।
সড়ক ও জনপথ বিভাগ বরিশালের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী ফজলে রব্বে জানান, ভোলার মানুষ সেতুপথে বরিশাল হয়ে ঢাকা যেতে চাইলে ২২৫ কিলোমিটার সড়ক পাড়ি দিতে হবে। অথচ প্রস্তাবিত নতুন সড়কে মেহেন্দীগঞ্জ–বাবুগঞ্জ হয়ে গেলে ২০ কিলোমিটার পথ কমে যাবে। আবার মেহেন্দীগঞ্জ–মুলাদীর পর শরীয়তপুরের গোসাইরহাট হয়ে গেলে ঢাকার দূরত্ব কমে যাবে আরও ৬৫ কিলোমিটার। প্রকল্প বাছাই বা গ্রহণের ক্ষেত্রে সবার আগে যে বিষয়টি দেখে সরকার–তা হলো কম খরচে বেশি প্রাপ্তি। এ বিবেচনায় ভোলা–মেহেন্দীগঞ্জ–বরিশাল সড়ক নির্মাণের যে প্রস্তাবনা–সেইটিই বেশি গ্রহণযোগ্য। সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী নতুন প্রকল্প বাস্তবায়নে চূড়ান্ত জরিপসহ প্রাথমিক সব কাজ শুরু হয়েছে। মাঠ পর্যায়ে দুটি টেকনিক্যাল টিম কাজ করছে। আশাকরি আগামী ৪ থেকে ৫ মাসের মধ্যে চূড়ান্ত প্রকল্প প্রস্তাব দাখিল করতে পারব। ভোলা প্রেস ক্লাবের সভাপতি নজরুল হক অনু বলেন, আমরা সড়কপথে যোগাযোগের নতুন প্রস্তাবের বিরুদ্ধে নই। তবে ভোলা–বরিশাল সেতু নির্মাণের দাবি থেকেও সরে আসছি না। আমরা মনে করি–নতুন প্রস্তাব বর্তমান সরকারের পক্ষ থেকে ভোলাবাসীর জন্য সান্ত্বনা পুরস্কার। প্রাথমিকভাবে আমরা এটা মেনে নিয়েছি। কিন্তু আমাদের মূল দাবি ‘ভোলা–বরিশাল সেতু’, আজ হোক বা কাল, সরকারকে করতেই হবে।

ডেস্ক রিপোর্ট 

























