একজন প্রিয় মানুষকে হারানোর বেদনা হয়তো একসময় চোখের জলে প্রকাশ করা যায়। কিন্তু সেই মানুষটি কোথায়—বেঁচে আছেন, নাকি আর নেই—তা না জেনে বছরের পর বছর অপেক্ষা করার যন্ত্রণা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন।
আজ ৩০ আগস্ট, আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস। দিনটি শুধু গুমের শিকার মানুষদের স্মরণ করার নয়; একই সঙ্গে তাদের স্বজনদের দীর্ঘ অপেক্ষা, অনিশ্চয়তা ও কষ্টের কথাও মনে করিয়ে দেয়।
বাংলাদেশও গত দেড় দশকে গুমের অভিযোগ নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক ও উদ্বেগের মধ্য দিয়ে গেছে। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর গুমের অভিযোগ তদন্তে অন্তর্বর্তী সরকার একটি তদন্ত কমিশন গঠন করে।
কমিশনের কাছে জমা পড়া ১ হাজার ৯১৩টি অভিযোগ যাচাই-বাছাইয়ের পর ১ হাজার ৫৬৯টি ঘটনাকে গুম হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। এর মধ্যে ২৮৭টি ঘটনাকে ‘মিসিং অ্যান্ড ডেড’ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়েছে। কমিশনের সদস্যদের মতে, প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে।
কমিশনের প্রতিবেদনে ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ১ হাজার ৫৬৪টি গুমের ঘটনা নথিভুক্ত করার কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে ২০১৬ সালে সর্বোচ্চ ২১৫টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়। পরবর্তী বছরগুলোতেও গুমের বহু অভিযোগ সামনে এসেছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, রাজনৈতিক পরিচয় পাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক গুমের শিকার হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।
তবে এসব সংখ্যা শুধু পরিসংখ্যান নয়। প্রতিটি সংখ্যার পেছনে রয়েছে একটি পরিবার। রয়েছেন একজন মা, বাবা, স্ত্রী কিংবা সন্তান। রয়েছে একটি অসমাপ্ত স্বপ্ন এবং প্রিয়জনকে ফিরে পাওয়ার দীর্ঘ অপেক্ষা।
গুমের সবচেয়ে নির্মম দিক এখানেই। মৃত্যুর খবর পেলে একসময় মানুষ বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে শোক করার চেষ্টা করতে পারেন। কিন্তু প্রিয়জন বেঁচে আছেন কি না, কোথায় আছেন—এই প্রশ্নের উত্তর না পেলে শোকও যেন অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
কেউ বছরের পর বছর দরজার দিকে তাকিয়ে থাকেন। কোনো মা বিশ্বাস করেন, একদিন তার সন্তান ফিরে আসবে। কোনো স্ত্রী অপেক্ষা করেন স্বামীর ফেরার। আবার কোনো সন্তান বাবার একটি পুরোনো ছবিকেই সবচেয়ে মূল্যবান স্মৃতি হিসেবে আঁকড়ে ধরে বড় হয়।
বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলীর নিখোঁজ হওয়ার ঘটনাও বাংলাদেশের গুমের আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি। ২০১২ সালের ১৭ এপ্রিল নিখোঁজ হওয়ার পর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও তার পরিবারের অপেক্ষার অবসান হয়নি।
গুমের অভিযোগ নিয়ে তৈরি হওয়া এই বাস্তবতা শুধু রাজনৈতিক প্রশ্ন নয়; এটি মানবাধিকার, আইনের শাসন এবং রাষ্ট্রের জবাবদিহির প্রশ্নও।
ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর দাবি—তারা সত্য জানতে চান, প্রিয়জনদের কী হয়েছিল তা জানতে চান এবং দায়ীদের বিচার চান।
তবে সেই বিচার হতে হবে নিরপেক্ষ তদন্ত, যথাযথ প্রমাণ এবং আইনের ভিত্তিতে। প্রতিশোধ নয়, ন্যায়বিচারই হওয়া উচিত রাষ্ট্রের পথ।
একই সঙ্গে ভবিষ্যতে যাতে আর কোনো নাগরিক বেআইনিভাবে নিখোঁজ না হন, সেটিও নিশ্চিত করা জরুরি। গুম প্রতিরোধে কার্যকর আইন, জবাবদিহি এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর কার্যকর নজরদারি প্রতিষ্ঠা এখন সময়ের দাবি।
আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবসে তাই প্রশ্ন—একটি পরিবার কি প্রিয়জন বেঁচে আছেন, নাকি মারা গেছেন, সেটুকুও না জেনে বছরের পর বছর অপেক্ষা করবে?
অবশ্যই না।
প্রতিটি পরিবারের সত্য জানার অধিকার রয়েছে। নিখোঁজ ব্যক্তির স্বজনদের ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার রয়েছে। আর রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো সেই সত্য অনুসন্ধান করা এবং দায়ীদের আইনের আওতায় আনা।
সবচেয়ে বড় অঙ্গীকার হওয়া উচিত—বাংলাদেশ আর কখনো গুমের অন্ধকারে ফিরে যাবে না।
কোনো মানুষ তার রাজনৈতিক মত, পরিচয় বা অবস্থানের কারণে বেআইনিভাবে নিখোঁজ হবেন না। কোনো পরিবারকে বছরের পর বছর অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকতে হবে না।
কারণ মানুষের জীবন ও মর্যাদার চেয়ে বড় কোনো রাজনৈতিক স্বার্থ হতে পারে না। ন্যায়বিচার, মানবিকতা ও আইনের শাসনের ভিত্তিতেই গড়ে উঠুক এমন বাংলাদেশ—যেখানে কোনো মানুষ আর কখনো অন্ধকারে হারিয়ে যাবেন না।

ডেস্ক রিপোর্ট 



















