ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ০৭ মে ২০২৬, ২৩ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম ::
‘কামব্যাক কমরেড’, মির্জা আব্বাসের উদ্দেশে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী শুনেছি খালেদা জিয়ার দৃঢ়তার সঙ্গে আমার মিল আছে: মেঘনা আলম পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচন পরবর্তী সহিংসতায় চারজন নিহত যুবলীগের কর্মী অর্ঘ্য হচ্ছেন সাতক্ষীরা জেলা ছাত্রদলের সদস্য সচিব সরকার এমন একটি প্রশাসন চায়, যেখানে মানুষ হয়রানি মুক্ত সেবা পাবে: প্রধানমন্ত্রী আমি পদত্যাগ করব না, রাষ্ট্রপতি শাসন হলে হোক: মমতা স্ত্রীকে নিয়ে গাড়ি চালিয়ে আগারগাঁও গেলেন প্রধানমন্ত্রী সীমান্তে সাপ-কুমির ছাড়ার খবর সঠিক নয়, দাবি বিক্রম মিশ্রির চাঁদা দাবির অভিযোগে যুবদল নেতাসহ গ্রেপ্তার ২ ‘অন্তর্বর্তীকালীন মুখ্যমন্ত্রী’ হতে পারেন মমতা

পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচন পরবর্তী সহিংসতায় চারজন নিহত

 

পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে গত ৪ মে বিজেপির নিরঙ্কুশ জয়ের পর নির্বাচন পরবর্তী সহিংসতায় মঙ্গলবার (৫ মে) রাত পর্যন্ত প্রাণ হারিয়েছেন চারজন রাজনৈতিক কর্মী। এদের মধ্যে দুজন বিজেপি কর্মী ও দুজন তৃণমূল কংগ্রেসের কর্মী। ইতোমধ্যেই এসব হত্যার ঘটনায় একাধিক সন্দেহভাজন অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। যাদের মধ্যে কয়েকজনকে বাংলাদেশ সীমান্ত থেকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

 

পুলিশ জানিয়েছে, হত্যার পর বাংলাদেশে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন অভিযুক্তরা। এ ছাড়া সহিংসতা থামাতে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হয়েছেন রাজ্য পুলিশের দুজন সদস্য ও তিনজন বিএসএফ জওয়ান।

 

নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতায় প্রথম হত্যার অভিযোগ ওঠে সোমবার, কলকাতার পার্শ্ববর্তী জেলা হাওড়ার উদয়নারায়ণপুরে। সেখানকার এক বিজেপি কর্মীকে কুপিয়ে ও পিটিয়ে খুনের অভিযোগ ওঠে তৃণমূলের বিরুদ্ধে।

 

বিজেপি সূত্রে জানানো হয়, নিহতের নাম যাদব বর। বয়স ৪৮ বছর। বিজেপির জয়ের আনন্দে সোমবার রাতে আবির খেলায় মেতেছিলেন তিনি। তার পরেই তাকে তৃণমূলের সমর্থকরা আটক করে কুপিয়ে ও পিটিয়ে খুন করে।

 

উদয়নারায়ণপুর বিধানসভার দেবীপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের ১৪৮ নম্বর বুথ এলাকার বাসিন্দা ছিলেন যাদব। পরিবার জানিয়েছে, যাদব বিজেপির সমর্থক। রাজ্যজুড়ে বিজেপির জয়ের আনন্দ দলের সতীর্থদের সঙ্গে উদযাপন করছিলেন তিনি। সোমবার রাত ১১টা নাগাদ তিনি বাড়ি ফিরছিলেন। সেই সময় তাকে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যান কয়েকজন। ধারালো অস্ত্র দিয়ে কোপানো হয় তাকে। খবর পেয়ে পুলিশ ও স্থানীয়রা মরদেহ উদ্ধার করে।

 

মঙ্গলবার ২৪ পরগনা জেলার নিউটাউনে বিজেপির বিজয় মিছিলে হামলা চালিয়ে এক বিজেপি কর্মীকে হত্যার অভিযোগ উঠেছে তৃণমূলের কংগ্রেসের বিরুদ্ধে। নিউ টাউন থানা এলাকার বালিগুটিতে মঙ্গলবার বিকেলে এই খুনের ঘটনা ঘটে। এরপর উত্তেজিত স্থানীয় মানুষজন বেশ কয়েকটি তৃণমূল কর্মীদের বাড়ি ভাঙচুর করে। পরে এলাকায় বিশাল পুলিশ বাহিনী মোতায়েন করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। আর মরদেহ উদ্ধার করে পাঠানো হয় মর্গে।

 

ভোট-পরবর্তী সহিংসতায় নিহত হয়েছেন দুই তৃণমূল কংগ্রেস কর্মীও। কলকাতার বেলেঘাটায় ভোটের ফল ঘোষণার পর থেকেই নিখোঁজ ছিলেন তৃণমূল কংগ্রেস কর্মী বিশ্বজিৎ পট্টনায়েক। পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, একটি ফোন আসার পর বাড়ি থেকে বেরিয়ে যান তিনি। মঙ্গলবার বাড়ির সামনে থেকেই তার রক্তাক্ত দেহ উদ্ধার করা হয়। হাসপাতালে নিয়ে গেলে বিশ্বজিৎ পট্টনায়ককে মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসকরা। এ ঘটনায় বেলেঘাটা পুলিশে অভিযোগ দায়ের করেছে নিহতের পরিবার।

 

বিশ্বজিৎ পট্টনায়ক কেবল সক্রিয় তৃণমূল কর্মীই ছিলেন না, সদ্য সমাপ্ত নির্বাচনে দলীয় বুথ এজেন্টের দায়িত্বও সামলেছিলেন। তার এই আকস্মিক ও রহস্যজনক মৃত্যুকে কেন্দ্র করে রণক্ষেত্রের চেহারা নেয় এলাকা। পরিবারের স্পষ্ট অভিযোগ, রাজনীতিই কেড়ে নিয়েছে তাদের ঘরের ছেলের প্রাণ। অভিযোগ তোলা হয়েছে বিজেপির দিকে।

 

এ ছাড়া বীরভূম জেলার নানুর সন্তোষপুরে এক তৃণমূল কংগ্রেস কর্মীকে হত্যার অভিযোগ উঠেছে বিজেপির বিরুদ্ধে। আবির শেখ (৪৫) নামে ওই তৃণমূল কর্মীর পরিবারের অভিযোগ, বিজেপির কর্মী-সমর্থকেরা তাকে রাস্তায় একা পেয়ে কুপিয়ে হত্যা করেছে।

 

আবিরের স্বজন মহসিনা বেগম বলেন, মঙ্গলবার তার বাড়ি এসেছিলেন আবির। বাড়ি থেকে বেরিয়ে নিজের বাড়ি যাওয়ার পথেই বিজেপি সমর্থকদের রোষের মুখে পড়েন তিনি। ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। ঘটনার পরে নানুর থানার বিশাল পুলিশ বাহিনী ঘটনাস্থলে গেলে মরদেহ উদ্ধারেও বাধা দেওয়া হয় বলে অভিযোগ।

 

ঘটনার সময় আবিরের সঙ্গে ছিলেন চাঁদু শেখ নামে আরও এক ব্যক্তি। তিনিও গুরুতর আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। তাকে বোলপুর মহকুমা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

 

এদিকে তৃণমূল কংগ্রেস ও বিজেপির সংঘর্ষ থামাতে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হয়েছেন দুই পুলিশ কর্মী ও তিনজন বিএসএফ জওয়ান। উত্তর ২৪ পরগনা জেলার সন্দেশখালি এলাকায় মাছের ভেড়ি দখলকে কেন্দ্র করে বিজেপি-তৃণমূল সংঘর্ষ চরমে উঠল তা থামাতে বিশাল পুলিশ বাহিনী নিয়ে যান সন্দেশখালি থানার ওসি ভরত প্রসূন কর। এ সময় তাদের লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয় বলে অভিযোগ।

 

গুলিবিদ্ধ হন ওসি ভরত ও একজন মহিলা কনস্টেবল। তাদের উদ্ধার করতে এলে গুলিবিদ্ধ হন আরও তিনজন বিএসএফ জওয়ান। ওসি ও ওই মহিলা কনস্টেবলকে প্রথমে চিত্তরঞ্জন হাসপাতালে ও পরে বাইপাসের কাছের একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। গুলিবিদ্ধ তিন বিএসএফ জওয়ানকে বিএসএফের হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। জানা গেছে, প্রত্যেকেই পায়ে গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। প্রাণহানির আশঙ্কা নেই।

 

তৃণমূল কংগ্রেস নেতা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের অভিযোগ, অন্তত ৩০০-৪০০ দলীয় কার্যালয়ে ভাঙচুর চালানো হয়েছে, অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে অথবা দখল করা হয়েছে। ১৫০ প্রার্থীর বাড়িতে হামলা চালানো হয়েছে। নির্বাচন কমিশন হিংসা প্রতিরোধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। বিজেপি ‘ভয় আউট, ভরসা ইন’ স্লোগান দিয়ে পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতায় এসেছিল, কিন্তু ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বিজেপি তাদের ভরসার মডেল দেখিয়ে দিল।

 

তবে বিজেপি এসবের দায় স্বীকার করেনি। বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমিক ভট্টাচার্য বলেছেন, সহিংসতা-ভাঙচুরে তাদের কোনো কর্মী জড়িত নন। বিজেপির পতাকা নিয়ে যদি তৃণমূল কংগ্রেস তৃণমূল কংগ্রেসের ওপর আক্রমণ করে, তার দায় বিজেপি নেবে না। এ কারণেই নেবে না, কারণ এখনও পর্যন্ত আমরা সরকার গঠন করিনি।

 

তিনি বলেন, দুষ্কৃতিকারীরা বিজেপির নাম ব্যবহার করে অশান্তি পাকানোর চেষ্টা করছে। আমাদেরও দুজন কর্মী হত্যার শিকার হয়েছেন। নতুন সরকার দায়িত্ব না নেওয়া পর্যন্ত বিদায়ি রাজ্য সরকার ও নির্বাচন কমিশনকে দায়িত্ব নিতে হবে। শমিকের দাবি নির্বাচন পূর্ববর্তী, পরবর্তী যে কোনো সহিংসতা বন্ধ হওয়া প্রয়োজন।

 

তবে এসবের মধ্যেই নিউটাউনের বালিগড়িতে বিজেপি কর্মী মধু মণ্ডল খুনের ঘটনায় প্রধান অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তৃণমূল নেতা কমল মন্ডল ও তার তিন সহযোগীকে বুধবার ভোরে উত্তর ২৪ পরগনার গোপালনগর সীমান্ত এলাকা দিয়ে বাংলাদেশে পালানোর সময় গ্রেপ্তার করেছে টেকনোসিটি থানার পুলিশ।

 

এদিকে সহিংসতা রুখতে কঠোর হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার। কোথাও ভাঙচুর বা সহিংসতার ঘটনা দেখলেই অভিযুক্তদের অবিলম্বে গ্রেপ্তার করতে বলেছেন তিনি। রাজ্যের মুখ্যসচিব, রাজ্য পুলিশের মহাপরিচালক, কলকাতার পুলিশ কমিশনার এবং কেন্দ্রীয় সশস্ত্র বাহিনীর মহাপরিচালককে সতর্ক থাকারও নির্দেশনা দিয়েছেন তিনি। প্রস্তুত থাকতে বলেছেন জেলা কর্তৃপক্ষ এবং পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের।

 

একই ভাবে কলকাতা পুলিশের কমিশনার অজয় নন্দা সংবাদ সম্মেলন করে বুধবার কঠোর হুঁশিয়ারি দেন। তিনি বলেন, ভোট শান্তিপূর্ণভাবে হয়েছে। মানুষ ভোট দিয়েছে। সবাই শান্ত থাকবেন। গুজবে কান দেবেন না। কেন্দ্রীয় বাহিনী আছে, কিউআরটি আছে। বিজয় মিছিল পুলিশের অনুমতি নিয়েই করতে হবে, জেসিবি নিয়ে র‌্যালি হবে না। জেসিবি যারা ভাড়া দিচ্ছে, তাদেরকেও বলা হচ্ছে- যদি ধরা পড়ে, তাহলে জেসিবি বাজেয়াপ্ত করা হবে। আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

 

তিনি বলেন, সিএপিএফের সঙ্গে কলকাতা পুলিশ কন্ট্রোল রুম চালাচ্ছে। কলকাতায় ৮০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অস্ত্র উদ্ধার হয়েছে। সব মিলিয়ে গোটা রাজ্যে প্রায় দুই হাজারের বেশি গ্রেপ্তার করা হয়েছে। নিউমার্কেট এলাকায় যাদের বুলডোজার চালিয়ে দোকানপাট ভাঙচুর করতে দেখা গেছে, তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ভাঙচুর চালানো যাবে না।

 

মুখ্যমন্ত্রী মমতা ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নিরাপত্তা বেষ্টনী তুলে নেওয়া প্রসঙ্গে কলকাতা পুলিশের কমিশনার বলেন, আগের মতই তারা জেট প্লাস ক্যাটাগরির নিরাপত্তা পাবেন। তবে ক্যাটাগরি অনুযায়ী বিশেষ নিরাপত্তা তোলা হয়েছে।

ট্যাগস

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

জনপ্রিয় সংবাদ

‘কামব্যাক কমরেড’, মির্জা আব্বাসের উদ্দেশে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী

পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচন পরবর্তী সহিংসতায় চারজন নিহত

আপডেট সময় ১১:৫২:২৮ অপরাহ্ন, বুধবার, ৬ মে ২০২৬

 

পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে গত ৪ মে বিজেপির নিরঙ্কুশ জয়ের পর নির্বাচন পরবর্তী সহিংসতায় মঙ্গলবার (৫ মে) রাত পর্যন্ত প্রাণ হারিয়েছেন চারজন রাজনৈতিক কর্মী। এদের মধ্যে দুজন বিজেপি কর্মী ও দুজন তৃণমূল কংগ্রেসের কর্মী। ইতোমধ্যেই এসব হত্যার ঘটনায় একাধিক সন্দেহভাজন অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। যাদের মধ্যে কয়েকজনকে বাংলাদেশ সীমান্ত থেকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

 

পুলিশ জানিয়েছে, হত্যার পর বাংলাদেশে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন অভিযুক্তরা। এ ছাড়া সহিংসতা থামাতে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হয়েছেন রাজ্য পুলিশের দুজন সদস্য ও তিনজন বিএসএফ জওয়ান।

 

নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতায় প্রথম হত্যার অভিযোগ ওঠে সোমবার, কলকাতার পার্শ্ববর্তী জেলা হাওড়ার উদয়নারায়ণপুরে। সেখানকার এক বিজেপি কর্মীকে কুপিয়ে ও পিটিয়ে খুনের অভিযোগ ওঠে তৃণমূলের বিরুদ্ধে।

 

বিজেপি সূত্রে জানানো হয়, নিহতের নাম যাদব বর। বয়স ৪৮ বছর। বিজেপির জয়ের আনন্দে সোমবার রাতে আবির খেলায় মেতেছিলেন তিনি। তার পরেই তাকে তৃণমূলের সমর্থকরা আটক করে কুপিয়ে ও পিটিয়ে খুন করে।

 

উদয়নারায়ণপুর বিধানসভার দেবীপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের ১৪৮ নম্বর বুথ এলাকার বাসিন্দা ছিলেন যাদব। পরিবার জানিয়েছে, যাদব বিজেপির সমর্থক। রাজ্যজুড়ে বিজেপির জয়ের আনন্দ দলের সতীর্থদের সঙ্গে উদযাপন করছিলেন তিনি। সোমবার রাত ১১টা নাগাদ তিনি বাড়ি ফিরছিলেন। সেই সময় তাকে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যান কয়েকজন। ধারালো অস্ত্র দিয়ে কোপানো হয় তাকে। খবর পেয়ে পুলিশ ও স্থানীয়রা মরদেহ উদ্ধার করে।

 

মঙ্গলবার ২৪ পরগনা জেলার নিউটাউনে বিজেপির বিজয় মিছিলে হামলা চালিয়ে এক বিজেপি কর্মীকে হত্যার অভিযোগ উঠেছে তৃণমূলের কংগ্রেসের বিরুদ্ধে। নিউ টাউন থানা এলাকার বালিগুটিতে মঙ্গলবার বিকেলে এই খুনের ঘটনা ঘটে। এরপর উত্তেজিত স্থানীয় মানুষজন বেশ কয়েকটি তৃণমূল কর্মীদের বাড়ি ভাঙচুর করে। পরে এলাকায় বিশাল পুলিশ বাহিনী মোতায়েন করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। আর মরদেহ উদ্ধার করে পাঠানো হয় মর্গে।

 

ভোট-পরবর্তী সহিংসতায় নিহত হয়েছেন দুই তৃণমূল কংগ্রেস কর্মীও। কলকাতার বেলেঘাটায় ভোটের ফল ঘোষণার পর থেকেই নিখোঁজ ছিলেন তৃণমূল কংগ্রেস কর্মী বিশ্বজিৎ পট্টনায়েক। পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, একটি ফোন আসার পর বাড়ি থেকে বেরিয়ে যান তিনি। মঙ্গলবার বাড়ির সামনে থেকেই তার রক্তাক্ত দেহ উদ্ধার করা হয়। হাসপাতালে নিয়ে গেলে বিশ্বজিৎ পট্টনায়ককে মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসকরা। এ ঘটনায় বেলেঘাটা পুলিশে অভিযোগ দায়ের করেছে নিহতের পরিবার।

 

বিশ্বজিৎ পট্টনায়ক কেবল সক্রিয় তৃণমূল কর্মীই ছিলেন না, সদ্য সমাপ্ত নির্বাচনে দলীয় বুথ এজেন্টের দায়িত্বও সামলেছিলেন। তার এই আকস্মিক ও রহস্যজনক মৃত্যুকে কেন্দ্র করে রণক্ষেত্রের চেহারা নেয় এলাকা। পরিবারের স্পষ্ট অভিযোগ, রাজনীতিই কেড়ে নিয়েছে তাদের ঘরের ছেলের প্রাণ। অভিযোগ তোলা হয়েছে বিজেপির দিকে।

 

এ ছাড়া বীরভূম জেলার নানুর সন্তোষপুরে এক তৃণমূল কংগ্রেস কর্মীকে হত্যার অভিযোগ উঠেছে বিজেপির বিরুদ্ধে। আবির শেখ (৪৫) নামে ওই তৃণমূল কর্মীর পরিবারের অভিযোগ, বিজেপির কর্মী-সমর্থকেরা তাকে রাস্তায় একা পেয়ে কুপিয়ে হত্যা করেছে।

 

আবিরের স্বজন মহসিনা বেগম বলেন, মঙ্গলবার তার বাড়ি এসেছিলেন আবির। বাড়ি থেকে বেরিয়ে নিজের বাড়ি যাওয়ার পথেই বিজেপি সমর্থকদের রোষের মুখে পড়েন তিনি। ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। ঘটনার পরে নানুর থানার বিশাল পুলিশ বাহিনী ঘটনাস্থলে গেলে মরদেহ উদ্ধারেও বাধা দেওয়া হয় বলে অভিযোগ।

 

ঘটনার সময় আবিরের সঙ্গে ছিলেন চাঁদু শেখ নামে আরও এক ব্যক্তি। তিনিও গুরুতর আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। তাকে বোলপুর মহকুমা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

 

এদিকে তৃণমূল কংগ্রেস ও বিজেপির সংঘর্ষ থামাতে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হয়েছেন দুই পুলিশ কর্মী ও তিনজন বিএসএফ জওয়ান। উত্তর ২৪ পরগনা জেলার সন্দেশখালি এলাকায় মাছের ভেড়ি দখলকে কেন্দ্র করে বিজেপি-তৃণমূল সংঘর্ষ চরমে উঠল তা থামাতে বিশাল পুলিশ বাহিনী নিয়ে যান সন্দেশখালি থানার ওসি ভরত প্রসূন কর। এ সময় তাদের লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয় বলে অভিযোগ।

 

গুলিবিদ্ধ হন ওসি ভরত ও একজন মহিলা কনস্টেবল। তাদের উদ্ধার করতে এলে গুলিবিদ্ধ হন আরও তিনজন বিএসএফ জওয়ান। ওসি ও ওই মহিলা কনস্টেবলকে প্রথমে চিত্তরঞ্জন হাসপাতালে ও পরে বাইপাসের কাছের একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। গুলিবিদ্ধ তিন বিএসএফ জওয়ানকে বিএসএফের হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। জানা গেছে, প্রত্যেকেই পায়ে গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। প্রাণহানির আশঙ্কা নেই।

 

তৃণমূল কংগ্রেস নেতা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের অভিযোগ, অন্তত ৩০০-৪০০ দলীয় কার্যালয়ে ভাঙচুর চালানো হয়েছে, অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে অথবা দখল করা হয়েছে। ১৫০ প্রার্থীর বাড়িতে হামলা চালানো হয়েছে। নির্বাচন কমিশন হিংসা প্রতিরোধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। বিজেপি ‘ভয় আউট, ভরসা ইন’ স্লোগান দিয়ে পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতায় এসেছিল, কিন্তু ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বিজেপি তাদের ভরসার মডেল দেখিয়ে দিল।

 

তবে বিজেপি এসবের দায় স্বীকার করেনি। বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমিক ভট্টাচার্য বলেছেন, সহিংসতা-ভাঙচুরে তাদের কোনো কর্মী জড়িত নন। বিজেপির পতাকা নিয়ে যদি তৃণমূল কংগ্রেস তৃণমূল কংগ্রেসের ওপর আক্রমণ করে, তার দায় বিজেপি নেবে না। এ কারণেই নেবে না, কারণ এখনও পর্যন্ত আমরা সরকার গঠন করিনি।

 

তিনি বলেন, দুষ্কৃতিকারীরা বিজেপির নাম ব্যবহার করে অশান্তি পাকানোর চেষ্টা করছে। আমাদেরও দুজন কর্মী হত্যার শিকার হয়েছেন। নতুন সরকার দায়িত্ব না নেওয়া পর্যন্ত বিদায়ি রাজ্য সরকার ও নির্বাচন কমিশনকে দায়িত্ব নিতে হবে। শমিকের দাবি নির্বাচন পূর্ববর্তী, পরবর্তী যে কোনো সহিংসতা বন্ধ হওয়া প্রয়োজন।

 

তবে এসবের মধ্যেই নিউটাউনের বালিগড়িতে বিজেপি কর্মী মধু মণ্ডল খুনের ঘটনায় প্রধান অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তৃণমূল নেতা কমল মন্ডল ও তার তিন সহযোগীকে বুধবার ভোরে উত্তর ২৪ পরগনার গোপালনগর সীমান্ত এলাকা দিয়ে বাংলাদেশে পালানোর সময় গ্রেপ্তার করেছে টেকনোসিটি থানার পুলিশ।

 

এদিকে সহিংসতা রুখতে কঠোর হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার। কোথাও ভাঙচুর বা সহিংসতার ঘটনা দেখলেই অভিযুক্তদের অবিলম্বে গ্রেপ্তার করতে বলেছেন তিনি। রাজ্যের মুখ্যসচিব, রাজ্য পুলিশের মহাপরিচালক, কলকাতার পুলিশ কমিশনার এবং কেন্দ্রীয় সশস্ত্র বাহিনীর মহাপরিচালককে সতর্ক থাকারও নির্দেশনা দিয়েছেন তিনি। প্রস্তুত থাকতে বলেছেন জেলা কর্তৃপক্ষ এবং পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের।

 

একই ভাবে কলকাতা পুলিশের কমিশনার অজয় নন্দা সংবাদ সম্মেলন করে বুধবার কঠোর হুঁশিয়ারি দেন। তিনি বলেন, ভোট শান্তিপূর্ণভাবে হয়েছে। মানুষ ভোট দিয়েছে। সবাই শান্ত থাকবেন। গুজবে কান দেবেন না। কেন্দ্রীয় বাহিনী আছে, কিউআরটি আছে। বিজয় মিছিল পুলিশের অনুমতি নিয়েই করতে হবে, জেসিবি নিয়ে র‌্যালি হবে না। জেসিবি যারা ভাড়া দিচ্ছে, তাদেরকেও বলা হচ্ছে- যদি ধরা পড়ে, তাহলে জেসিবি বাজেয়াপ্ত করা হবে। আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

 

তিনি বলেন, সিএপিএফের সঙ্গে কলকাতা পুলিশ কন্ট্রোল রুম চালাচ্ছে। কলকাতায় ৮০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অস্ত্র উদ্ধার হয়েছে। সব মিলিয়ে গোটা রাজ্যে প্রায় দুই হাজারের বেশি গ্রেপ্তার করা হয়েছে। নিউমার্কেট এলাকায় যাদের বুলডোজার চালিয়ে দোকানপাট ভাঙচুর করতে দেখা গেছে, তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ভাঙচুর চালানো যাবে না।

 

মুখ্যমন্ত্রী মমতা ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নিরাপত্তা বেষ্টনী তুলে নেওয়া প্রসঙ্গে কলকাতা পুলিশের কমিশনার বলেন, আগের মতই তারা জেট প্লাস ক্যাটাগরির নিরাপত্তা পাবেন। তবে ক্যাটাগরি অনুযায়ী বিশেষ নিরাপত্তা তোলা হয়েছে।