ঢাকা , সোমবার, ১৩ এপ্রিল ২০২৬, ৩০ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম ::
প্রয়োজনে আমরা আবারও জীবন দিতে প্রস্তুত: জামায়াতে আমির ট্রাম্প মানসিকভাবে ভারসাম্যহীন, পদচ্যুতি দরকার: সাবেক সিআইএ পরিচালক লেবানন-ইরানে হামলাকে তুরস্কের ওপর হামলা হিসেবে দেখা হবে: ইসরাইলকে এরদোগানের হুঁশিয়ারি ১০০ টাকা রিচার্জে সেবা মেলে মাত্র ৬২ টাকার, পদক্ষেপ নিচ্ছে সরকার ইরান ক্ষেপণাস্ত্র তাক করতেই হরমুজ থেকে ‘পালাল’ মার্কিন যুদ্ধজাহাজ আগামী সপ্তাহ থেকে ভারতীয় ভিসা পাবেন বাংলাদেশিরা অনলাইন জুয়াই মাদরাসার ৭০ হাজার টাকা হারিয়ে শিক্ষকের আত্মহত্যা হামলার মাত্র ৫ দিনেই ক্ষতিগ্রস্ত রেলপথ মেরামত করলো ইরান, যোগাযোগ স্বাভাবিক পারমাণবিক অস্ত্রের চেয়েও বড় যে অস্ত্র এখন ইরানের হাতে ট্রাম্পের নৌ অবরোধের হুমকি ‘অত্যন্ত হাস্যকর’: ইরানের নৌবাহিনী প্রধান

আজ ভাগ্য নির্ধারণের রাত ‘লাইলাতুল কদর’

  • ডেস্ক রিপোর্ট
  • আপডেট সময় ০১:৩৮:১৮ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৬ মার্চ ২০২৬
  • ৭৫ বার পড়া হয়েছে

মানুষের জীবনে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যেগুলো সময়ের সাধারণ ধারার অংশ নয়; বরং নিয়তির বিশেষ জানালা। শবে কদর তেমনই এক মহামুহূর্তএক রাত, কিন্তু প্রভাব হাজার মাসের চেয়েও বিস্তৃত; এক সময়, কিন্তু বিস্তার পুরো জীবনের গন্তব্যজুড়ে। রমজানের শেষ দশকের নিঃশব্দ গভীরতায় যখন পৃথিবী ঘুমিয়ে পড়ে, তখন আসমান জেগে ওঠে। আর ঠিক সেই জাগরণের কেন্দ্রে লুকিয়ে থাকে এক রাত; যাকে আল্লাহ নিজেই মহিমান্বিত করেছেনলাইলাতুল কদর, ভাগ্য নির্ধারণের রাত, সিদ্ধান্তের রাত, নতুন শুরুর রাত। কদর শব্দের অর্থ মর্যাদা, পরিমাপ, সিদ্ধান্ত, তাকদির। অর্থাৎ এ রাত শুধু মর্যাদাপূর্ণ নয়; এটি নির্ধারণের রাতও। এ রাতে লিখিত হয় আগামী বছরের তাকদির, রিজিক, জীবন, মৃত্যু, সুখ ও দুঃখ। এ রাতে সবকিছুর সিদ্ধান্ত আল্লাহর হুকুমে ফেরেশতাদের হাতে ন্যস্ত হয়। এই এক রাতেই জীবনের নতুন ভাগ্যলিপি রচিত হয়।

কুরআন ঘোষণা করেছে, লাইলাতুল কদর হাজার মাসের চেয়েও উত্তম। হাজার মাস মানে প্রায় ৮৩ বছর ৪ মাসএকটি পূর্ণ মানবজীবনের সমান সময়। অর্থাৎ যে ব্যক্তি এই এক রাত ইবাদতে কাটালো, সে যেন একটি পূর্ণ জীবন ইবাদতে কাটানোর সওয়াব অর্জন করলো। এখানেই শবে কদরের অবাক বিস্ময়আল্লাহ সময়কে সংকুচিত করে দিয়েছেন, যাতে অল্প সময়েই বান্দা অগণিত নেকি অর্জন করতে পারে। শবে কদর কেবল তাকদিরের রাত নয়; এটি হিদায়াতের রাতও। এই রাতেই কুরআন অবতরণের সূচনা হয়েছিল; যা মানবসভ্যতার ইতিহাসে সবচেয়ে বড় আলোকঘটনা। অন্ধকার যুগে নেমে এসেছিল নূরের বাণী, অজ্ঞতার মরুভূমিতে নেমেছিল হিদায়াতের বৃষ্টি। তাই শবে কদর শুধু ব্যক্তিগত পরিবর্তনের রাত নয়; এটি মানবজাতির ভাগ্য পরিবর্তনের রাতও।

কুরআন বলে, এই রাতে ফেরেশতারা এবং রূহ (জিবরাইল আ.) নেমে আসে। ভাবুন, পৃথিবীর আকাশ ভরে গেছে ফেরেশতাদের অবতরণে! প্রতিটি মসজিদ, প্রতিটি সিজদাস্থল, প্রতিটি তাওবার অশ্রু, ফেরেশতাদের সাক্ষী হয়ে আছে। এ যেন আসমান থেকে নেমে আসা নূরের মিছিল; যা পুরো পৃথিবীকে আচ্ছন্ন করে ফেলে। শবে কদরকে কুরআন বলেছে, সালাম, শান্তিময়। মাগরিব থেকে ফজর পর্যন্ত এ রাত শান্তির প্রবাহে ভরা। পাপ মোচন হয়। দোয়া কবুল হয়। অন্তর প্রশান্ত হয়। আত্মা আলোকিত হয়। এ যেন আসমান থেকে নেমে আসা শান্তির নদী; যেখানে আত্মা ডুব দিয়ে পবিত্র হয়ে ওঠে।

মানুষ ভুল করে, এটাই তার স্বভাব। কিন্তু শবে কদর তাকে নতুন করে শুরুর সুযোগ দেয়। হাদিসে এসেছে, যে ব্যক্তি ঈমান ও সওয়াবের আশায় এ রাতে ইবাদত করবে, তার অতীত গুনাহ মাফ করে দেওয়া হবে। অর্থাৎ এক রাতেই অতীত মুছে যেতে পারে, ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল হয়ে উঠতে পারে। এ যেন জীবনের নতুন পৃষ্ঠা খুলে যাওয়ার রাত। শবে কদরের সবচেয়ে শক্তিশালী আমল দোয়া। এই রাতে বান্দার কণ্ঠে উচ্চারিত শব্দগুলো সরাসরি আরশে পৌঁছে যায়। হযরত আয়েশা (রা.) জিজ্ঞেস করেছিলেন, এই রাত পেলে কী দোয়া করবো? উত্তরে শেখানো হয়েছিল, আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুউন, তুহিব্বুল আফওয়া, ফাফু আন্নি।

ক্ষমা চাওয়াই এ রাতের সর্বোচ্চ দোয়া, কারণ ক্ষমাই নতুন ভাগ্যলিপির সূচনা। শবে কদরের নির্দিষ্ট তারিখ স্পষ্ট করে দেওয়া হয়নি। কেন? যাতে মানুষ এক রাতেই সীমাবদ্ধ না থাকে; বরং শেষ দশকের প্রতিটি রাত জাগে। অর্থাৎ আল্লাহ বান্দাকে শুধু পুরস্কার দিতে চাননি; তিনি তাকে ধারাবাহিক ইবাদতে অভ্যস্ত করতে চেয়েছেন। যে ব্যক্তি শবে কদর পেয়েও ইবাদত করলো না, সে কী হারালো? সে হারালো, হাজার মাসের সওয়াব, গুনাহ মাফের সুযোগ, তাকদির বদলের সম্ভাবনা, আল্লাহর বিশেষ নৈকট্য। এ ক্ষতি পার্থিব কোনও ক্ষতির সঙ্গে তুলনীয় নয়। শবে কদরে নতুন ভাগ্যলিপি লেখা মানে শুধু রিজিক বৃদ্ধি নয়; বরং আধ্যাত্মিক পরিবর্তনও। পাপী মানুষ হেদায়াত পায়। গাফেল মানুষ জেগে ওঠে। কঠিন হৃদয় নরম হয়। জীবন নতুন পথে মোড় নেয়। অর্থাৎ ভাগ্যলিপি কেবল ভবিষ্যৎ ঘটনার নয়; ভবিষ্যৎ চরিত্রেরও।

শবে কদর প্রমাণ করে, আল্লাহ চাইলে এক রাতেই মানুষের জীবন বদলে দিতে পারেন। যে মানুষ বছরের পর বছর দূরে ছিল, সে এক রাতেই নিকটবর্তী হয়ে যায়। যে মানুষ পাপে ডুবে ছিল, সে এক রাতেই পবিত্র হয়ে ওঠে। এ রাত সময়ের সীমা ভেঙে দেয়, অল্প সময়কে দীর্ঘ সওয়াবে, ছোট ইবাদতকে বিশাল পুরস্কারে রূপ দেয়। যখন শবে কদরের রাত নামে, তখন আকাশ নিঃশব্দ থাকে, কিন্তু রহমত ঝরে অবিরাম। যে জাগে, সে পায়। যে কাঁদে, সে পায়। যে ফিরে আসে, সে পায়। আর তখনই তার জীবনের নতুন ভাগ্যলিপি লেখা হয়, পাপমুক্ত অতীত, আলোকিত বর্তমান, আর আশাময় ভবিষ্যৎ নিয়ে। তখন সে উপলব্ধি করে, শবে কদর সত্যিই এক রাত নয়; এটি একটি নতুন জীবন শুরু হওয়ার মুহূর্ত, যেখানে তাকদিরও বদলে যায়, মানুষও বদলে যায়।

ট্যাগস

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

জনপ্রিয় সংবাদ

প্রয়োজনে আমরা আবারও জীবন দিতে প্রস্তুত: জামায়াতে আমির

আজ ভাগ্য নির্ধারণের রাত ‘লাইলাতুল কদর’

আপডেট সময় ০১:৩৮:১৮ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৬ মার্চ ২০২৬

মানুষের জীবনে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যেগুলো সময়ের সাধারণ ধারার অংশ নয়; বরং নিয়তির বিশেষ জানালা। শবে কদর তেমনই এক মহামুহূর্তএক রাত, কিন্তু প্রভাব হাজার মাসের চেয়েও বিস্তৃত; এক সময়, কিন্তু বিস্তার পুরো জীবনের গন্তব্যজুড়ে। রমজানের শেষ দশকের নিঃশব্দ গভীরতায় যখন পৃথিবী ঘুমিয়ে পড়ে, তখন আসমান জেগে ওঠে। আর ঠিক সেই জাগরণের কেন্দ্রে লুকিয়ে থাকে এক রাত; যাকে আল্লাহ নিজেই মহিমান্বিত করেছেনলাইলাতুল কদর, ভাগ্য নির্ধারণের রাত, সিদ্ধান্তের রাত, নতুন শুরুর রাত। কদর শব্দের অর্থ মর্যাদা, পরিমাপ, সিদ্ধান্ত, তাকদির। অর্থাৎ এ রাত শুধু মর্যাদাপূর্ণ নয়; এটি নির্ধারণের রাতও। এ রাতে লিখিত হয় আগামী বছরের তাকদির, রিজিক, জীবন, মৃত্যু, সুখ ও দুঃখ। এ রাতে সবকিছুর সিদ্ধান্ত আল্লাহর হুকুমে ফেরেশতাদের হাতে ন্যস্ত হয়। এই এক রাতেই জীবনের নতুন ভাগ্যলিপি রচিত হয়।

কুরআন ঘোষণা করেছে, লাইলাতুল কদর হাজার মাসের চেয়েও উত্তম। হাজার মাস মানে প্রায় ৮৩ বছর ৪ মাসএকটি পূর্ণ মানবজীবনের সমান সময়। অর্থাৎ যে ব্যক্তি এই এক রাত ইবাদতে কাটালো, সে যেন একটি পূর্ণ জীবন ইবাদতে কাটানোর সওয়াব অর্জন করলো। এখানেই শবে কদরের অবাক বিস্ময়আল্লাহ সময়কে সংকুচিত করে দিয়েছেন, যাতে অল্প সময়েই বান্দা অগণিত নেকি অর্জন করতে পারে। শবে কদর কেবল তাকদিরের রাত নয়; এটি হিদায়াতের রাতও। এই রাতেই কুরআন অবতরণের সূচনা হয়েছিল; যা মানবসভ্যতার ইতিহাসে সবচেয়ে বড় আলোকঘটনা। অন্ধকার যুগে নেমে এসেছিল নূরের বাণী, অজ্ঞতার মরুভূমিতে নেমেছিল হিদায়াতের বৃষ্টি। তাই শবে কদর শুধু ব্যক্তিগত পরিবর্তনের রাত নয়; এটি মানবজাতির ভাগ্য পরিবর্তনের রাতও।

কুরআন বলে, এই রাতে ফেরেশতারা এবং রূহ (জিবরাইল আ.) নেমে আসে। ভাবুন, পৃথিবীর আকাশ ভরে গেছে ফেরেশতাদের অবতরণে! প্রতিটি মসজিদ, প্রতিটি সিজদাস্থল, প্রতিটি তাওবার অশ্রু, ফেরেশতাদের সাক্ষী হয়ে আছে। এ যেন আসমান থেকে নেমে আসা নূরের মিছিল; যা পুরো পৃথিবীকে আচ্ছন্ন করে ফেলে। শবে কদরকে কুরআন বলেছে, সালাম, শান্তিময়। মাগরিব থেকে ফজর পর্যন্ত এ রাত শান্তির প্রবাহে ভরা। পাপ মোচন হয়। দোয়া কবুল হয়। অন্তর প্রশান্ত হয়। আত্মা আলোকিত হয়। এ যেন আসমান থেকে নেমে আসা শান্তির নদী; যেখানে আত্মা ডুব দিয়ে পবিত্র হয়ে ওঠে।

মানুষ ভুল করে, এটাই তার স্বভাব। কিন্তু শবে কদর তাকে নতুন করে শুরুর সুযোগ দেয়। হাদিসে এসেছে, যে ব্যক্তি ঈমান ও সওয়াবের আশায় এ রাতে ইবাদত করবে, তার অতীত গুনাহ মাফ করে দেওয়া হবে। অর্থাৎ এক রাতেই অতীত মুছে যেতে পারে, ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল হয়ে উঠতে পারে। এ যেন জীবনের নতুন পৃষ্ঠা খুলে যাওয়ার রাত। শবে কদরের সবচেয়ে শক্তিশালী আমল দোয়া। এই রাতে বান্দার কণ্ঠে উচ্চারিত শব্দগুলো সরাসরি আরশে পৌঁছে যায়। হযরত আয়েশা (রা.) জিজ্ঞেস করেছিলেন, এই রাত পেলে কী দোয়া করবো? উত্তরে শেখানো হয়েছিল, আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুউন, তুহিব্বুল আফওয়া, ফাফু আন্নি।

ক্ষমা চাওয়াই এ রাতের সর্বোচ্চ দোয়া, কারণ ক্ষমাই নতুন ভাগ্যলিপির সূচনা। শবে কদরের নির্দিষ্ট তারিখ স্পষ্ট করে দেওয়া হয়নি। কেন? যাতে মানুষ এক রাতেই সীমাবদ্ধ না থাকে; বরং শেষ দশকের প্রতিটি রাত জাগে। অর্থাৎ আল্লাহ বান্দাকে শুধু পুরস্কার দিতে চাননি; তিনি তাকে ধারাবাহিক ইবাদতে অভ্যস্ত করতে চেয়েছেন। যে ব্যক্তি শবে কদর পেয়েও ইবাদত করলো না, সে কী হারালো? সে হারালো, হাজার মাসের সওয়াব, গুনাহ মাফের সুযোগ, তাকদির বদলের সম্ভাবনা, আল্লাহর বিশেষ নৈকট্য। এ ক্ষতি পার্থিব কোনও ক্ষতির সঙ্গে তুলনীয় নয়। শবে কদরে নতুন ভাগ্যলিপি লেখা মানে শুধু রিজিক বৃদ্ধি নয়; বরং আধ্যাত্মিক পরিবর্তনও। পাপী মানুষ হেদায়াত পায়। গাফেল মানুষ জেগে ওঠে। কঠিন হৃদয় নরম হয়। জীবন নতুন পথে মোড় নেয়। অর্থাৎ ভাগ্যলিপি কেবল ভবিষ্যৎ ঘটনার নয়; ভবিষ্যৎ চরিত্রেরও।

শবে কদর প্রমাণ করে, আল্লাহ চাইলে এক রাতেই মানুষের জীবন বদলে দিতে পারেন। যে মানুষ বছরের পর বছর দূরে ছিল, সে এক রাতেই নিকটবর্তী হয়ে যায়। যে মানুষ পাপে ডুবে ছিল, সে এক রাতেই পবিত্র হয়ে ওঠে। এ রাত সময়ের সীমা ভেঙে দেয়, অল্প সময়কে দীর্ঘ সওয়াবে, ছোট ইবাদতকে বিশাল পুরস্কারে রূপ দেয়। যখন শবে কদরের রাত নামে, তখন আকাশ নিঃশব্দ থাকে, কিন্তু রহমত ঝরে অবিরাম। যে জাগে, সে পায়। যে কাঁদে, সে পায়। যে ফিরে আসে, সে পায়। আর তখনই তার জীবনের নতুন ভাগ্যলিপি লেখা হয়, পাপমুক্ত অতীত, আলোকিত বর্তমান, আর আশাময় ভবিষ্যৎ নিয়ে। তখন সে উপলব্ধি করে, শবে কদর সত্যিই এক রাত নয়; এটি একটি নতুন জীবন শুরু হওয়ার মুহূর্ত, যেখানে তাকদিরও বদলে যায়, মানুষও বদলে যায়।