ঢাকা , সোমবার, ২৫ মে ২০২৬, ১০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ধর্ষকদের জ্যান্ত শূলে চড়িয়ে শাস্তি দিতেন যে রাজা

  • ডেস্ক রিপোর্ট
  • আপডেট সময় ১১:০৬:১৬ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৪ মে ২০২৬
  • ৫ বার পড়া হয়েছে

 

ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধের শাস্তি হিসেবে যুগে যুগে বিভিন্ন সমাজে অত্যন্ত কঠোর বিধান রাখা হয়েছিল। আধুনিক যুগে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বা ফাঁসির মতো শাস্তির প্রচলন থাকলেও, প্রাচীন যুগ থেকে অপরাধীদের মনে চরম ভীতি সঞ্চার করার জন্য অত্যন্ত কষ্টদায়ক সব শাস্তির ব্যবস্থা ছিল। এর মধ্যে অন্যতম ভয়ংকর পদ্ধতি ছিল অপরাধীকে জ্যান্ত অবস্থায় শূলে চড়ানো।

 

শূলে চড়ানোর শাস্তির কথা উঠলেই ইতিহাসের পাতা থেকে সবার আগে যে নামটি উঠে আসে, তা হলো ১৫শ শতাব্দীর ওয়ালাচিয়ার (বর্তমান রোমানিয়া) শাসক ভ্লাদ তৃতীয়। ইতিহাসে তিনি ‘ভ্লাদ দ্য ইমপ্যালার’ বা ‘ড্রাকুলা’ নামে বেশি পরিচিত।

 

রালফ ফ্লোরেসকা এবং রেমন্ড ম্যাকনালির লেখা বিখ্যাত ইতিহাসভিত্তিক বই ‘ড্রাকুলা, প্রিন্স অব ম্যানি ফেসেস’ এবং সমসাময়িক রোমানিয়ান লোককথা থেকে তার শাসনকালের বিস্তারিত জানা যায়।

 

ধর্ষকের ২১ হাজার ২৫০ বছর কারাদণ্ডের যে ঘটনা ইতিহাসের সর্বোচ্চ শাস্তি

ভ্লাদ তার রাজ্যে অপরাধ দমনে ‘জিরো টলারেন্ বা শূন্য সহনশীলতা নীতি গ্রহণ করেছিলেন। তার রাজ্যে চুরি, ডাকাতি, খুন এবং বিশেষ করে নারীদের ওপর যৌন নির্যাতন বা ধর্ষণের শাস্তি ছিল অবধারিতভাবে শূলে চড়ানো।

 

ঐতিহাসিকদের মতে, ভ্লাদ বিশ্বাস করতেন যে, কেবল চরম নিষ্ঠুরতার মাধ্যমেই সমাজে শান্তি ও শৃঙ্খলা বজায় রাখা সম্ভব।

 

লোককথায় বলা হয়, তার শাসনামলে রাস্তাঘাটে স্বর্ণমুদ্রা পড়ে থাকলেও চুরির ভয়ে কেউ তা স্পর্শ করত না এবং নারীরা সম্পূর্ণ নিরাপদে চলাফেরা করতে পারত, কারণ সবাই জানত ধর্ষণের একমাত্র শাস্তি হলো জ্যান্ত শূলে চড়ানো।

 

এই শাস্তির নির্মমতা ছিল কল্পনাতীত। অপরাধীকে একটি দীর্ঘ, ধারালো কাঠের বা লোহার দণ্ডের ওপর জ্যান্ত অবস্থায় গেঁথে দেওয়া হতো। দণ্ডটি শরীরের নিচের দিক দিয়ে প্রবেশ করিয়ে এমনভাবে বুক, ঘাড় বা মুখ দিয়ে বের করা হতো, যাতে শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ (যেমন হৃৎপিণ্ড বা ফুসফুস) সরাসরি বা খুব দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।

 

ভারতে অপারেশন থিয়েটারে রোগীকে ধর্ষণ করলেন চিকিৎসক

এর ফলে অপরাধী তাৎক্ষণিকভাবে মারা যেত না। জনসমক্ষে খোলা ময়দানে বা রাস্তার পাশে তাকে ওই অবস্থায় খাড়া করে দাঁড় করিয়ে রাখা হতো। মৃত্যু নিশ্চিত হতে ক্ষেত্রবিশেষে কয়েক ঘণ্টা থেকে শুরু করে কয়েক দিন পর্যন্ত সময় লাগত। এই নিদারুণ যন্ত্রণা ভোগ করে তিলে তিলে মৃত্যু হতো ধর্ষকের।

 

ভ্লাদের আগে প্রাচীন মেসোপটেমিয়া, বিশেষ করে প্রাচীন অ্যাসিরীয় সভ্যতায় (খ্রিস্টপূর্ব ১২০০ থেকে ৬ষ্ঠ শতাব্দী) শূলে চড়ানোর প্রচলন ছিল। প্রাচীন ব্যাবিলনের বিখ্যাত ‘হাম্মুরাবির কোড’-এ কুমারী ধর্ষণের জন্য সাধারণত নদীতে ডুবিয়ে হত্যার বিধান ছিল।

 

তবে পার্শ্ববর্তী সাম্রাজ্যগুলোতে রাষ্ট্রদ্রোহিতার পাশাপাশি চরম নৈতিক অবক্ষয় এবং পাশবিক যৌন অপরাধের জন্য জনসমক্ষে শূলে চড়ানোর নজির পাওয়া যায়। পরবর্তীতে বাইজেন্টাইন বা রোমান সাম্রাজ্যেও চরম অপরাধের ক্ষেত্রে এই শাস্তির বিধান ছিল। মধ্যযুগের ইউরোপে সামন্তবাদীরা নিজেদের ক্ষমতা প্রদর্শন এবং সমাজে ত্রাস সৃষ্টির মাধ্যমে অপরাধ দমনে এই পদ্ধতি ব্যবহার করত।

 

প্রাচীন ও মধ্যযুগের শাসকরা মনে করতেন, অপরাধীকে জনসমক্ষে এই নিদারুণ কষ্ট দিয়ে হত্যা করলে তা অন্য সম্ভাব্য অপরাধীদের মনে চিরস্থায়ী ভয় ধরিয়ে দেবে। তখন মানবাধিকারের কোনো বৈশ্বিক বা আধুনিক ধারণা বিকশিত না হওয়ায়, ধর্ষণের মতো চরম অপরাধের ক্ষেত্রে এ ধরনের পাশবিক শাস্তির সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় বৈধতা ছিল। সাধারণ মানুষও নিজেদের নিরাপত্তার স্বার্থে এটিকে ন্যায়বিচার হিসেবেই মেনে নিত।

 

আধুনিক যুগে এমন নিষ্ঠুর ও অমানবিক শাস্তি আইনত পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়েছে। আজকের বিশ্ব মানবাধিকার ও সুষ্ঠু বিচার প্রক্রিয়ায় বিশ্বাস করে। তবে, জ্যান্ত শূলে চড়ানোর মতো অধ্যায়টি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, সমাজ ও সভ্যতার আদিমকাল থেকেই ধর্ষণকে একটি ক্ষমার অযোগ্য, জঘন্য এবং চরম শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হতো।

 

 

ট্যাগস

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

জনপ্রিয় সংবাদ

ধর্ষকদের জ্যান্ত শূলে চড়িয়ে শাস্তি দিতেন যে রাজা

আপডেট সময় ১১:০৬:১৬ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৪ মে ২০২৬

 

ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধের শাস্তি হিসেবে যুগে যুগে বিভিন্ন সমাজে অত্যন্ত কঠোর বিধান রাখা হয়েছিল। আধুনিক যুগে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বা ফাঁসির মতো শাস্তির প্রচলন থাকলেও, প্রাচীন যুগ থেকে অপরাধীদের মনে চরম ভীতি সঞ্চার করার জন্য অত্যন্ত কষ্টদায়ক সব শাস্তির ব্যবস্থা ছিল। এর মধ্যে অন্যতম ভয়ংকর পদ্ধতি ছিল অপরাধীকে জ্যান্ত অবস্থায় শূলে চড়ানো।

 

শূলে চড়ানোর শাস্তির কথা উঠলেই ইতিহাসের পাতা থেকে সবার আগে যে নামটি উঠে আসে, তা হলো ১৫শ শতাব্দীর ওয়ালাচিয়ার (বর্তমান রোমানিয়া) শাসক ভ্লাদ তৃতীয়। ইতিহাসে তিনি ‘ভ্লাদ দ্য ইমপ্যালার’ বা ‘ড্রাকুলা’ নামে বেশি পরিচিত।

 

রালফ ফ্লোরেসকা এবং রেমন্ড ম্যাকনালির লেখা বিখ্যাত ইতিহাসভিত্তিক বই ‘ড্রাকুলা, প্রিন্স অব ম্যানি ফেসেস’ এবং সমসাময়িক রোমানিয়ান লোককথা থেকে তার শাসনকালের বিস্তারিত জানা যায়।

 

ধর্ষকের ২১ হাজার ২৫০ বছর কারাদণ্ডের যে ঘটনা ইতিহাসের সর্বোচ্চ শাস্তি

ভ্লাদ তার রাজ্যে অপরাধ দমনে ‘জিরো টলারেন্ বা শূন্য সহনশীলতা নীতি গ্রহণ করেছিলেন। তার রাজ্যে চুরি, ডাকাতি, খুন এবং বিশেষ করে নারীদের ওপর যৌন নির্যাতন বা ধর্ষণের শাস্তি ছিল অবধারিতভাবে শূলে চড়ানো।

 

ঐতিহাসিকদের মতে, ভ্লাদ বিশ্বাস করতেন যে, কেবল চরম নিষ্ঠুরতার মাধ্যমেই সমাজে শান্তি ও শৃঙ্খলা বজায় রাখা সম্ভব।

 

লোককথায় বলা হয়, তার শাসনামলে রাস্তাঘাটে স্বর্ণমুদ্রা পড়ে থাকলেও চুরির ভয়ে কেউ তা স্পর্শ করত না এবং নারীরা সম্পূর্ণ নিরাপদে চলাফেরা করতে পারত, কারণ সবাই জানত ধর্ষণের একমাত্র শাস্তি হলো জ্যান্ত শূলে চড়ানো।

 

এই শাস্তির নির্মমতা ছিল কল্পনাতীত। অপরাধীকে একটি দীর্ঘ, ধারালো কাঠের বা লোহার দণ্ডের ওপর জ্যান্ত অবস্থায় গেঁথে দেওয়া হতো। দণ্ডটি শরীরের নিচের দিক দিয়ে প্রবেশ করিয়ে এমনভাবে বুক, ঘাড় বা মুখ দিয়ে বের করা হতো, যাতে শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ (যেমন হৃৎপিণ্ড বা ফুসফুস) সরাসরি বা খুব দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।

 

ভারতে অপারেশন থিয়েটারে রোগীকে ধর্ষণ করলেন চিকিৎসক

এর ফলে অপরাধী তাৎক্ষণিকভাবে মারা যেত না। জনসমক্ষে খোলা ময়দানে বা রাস্তার পাশে তাকে ওই অবস্থায় খাড়া করে দাঁড় করিয়ে রাখা হতো। মৃত্যু নিশ্চিত হতে ক্ষেত্রবিশেষে কয়েক ঘণ্টা থেকে শুরু করে কয়েক দিন পর্যন্ত সময় লাগত। এই নিদারুণ যন্ত্রণা ভোগ করে তিলে তিলে মৃত্যু হতো ধর্ষকের।

 

ভ্লাদের আগে প্রাচীন মেসোপটেমিয়া, বিশেষ করে প্রাচীন অ্যাসিরীয় সভ্যতায় (খ্রিস্টপূর্ব ১২০০ থেকে ৬ষ্ঠ শতাব্দী) শূলে চড়ানোর প্রচলন ছিল। প্রাচীন ব্যাবিলনের বিখ্যাত ‘হাম্মুরাবির কোড’-এ কুমারী ধর্ষণের জন্য সাধারণত নদীতে ডুবিয়ে হত্যার বিধান ছিল।

 

তবে পার্শ্ববর্তী সাম্রাজ্যগুলোতে রাষ্ট্রদ্রোহিতার পাশাপাশি চরম নৈতিক অবক্ষয় এবং পাশবিক যৌন অপরাধের জন্য জনসমক্ষে শূলে চড়ানোর নজির পাওয়া যায়। পরবর্তীতে বাইজেন্টাইন বা রোমান সাম্রাজ্যেও চরম অপরাধের ক্ষেত্রে এই শাস্তির বিধান ছিল। মধ্যযুগের ইউরোপে সামন্তবাদীরা নিজেদের ক্ষমতা প্রদর্শন এবং সমাজে ত্রাস সৃষ্টির মাধ্যমে অপরাধ দমনে এই পদ্ধতি ব্যবহার করত।

 

প্রাচীন ও মধ্যযুগের শাসকরা মনে করতেন, অপরাধীকে জনসমক্ষে এই নিদারুণ কষ্ট দিয়ে হত্যা করলে তা অন্য সম্ভাব্য অপরাধীদের মনে চিরস্থায়ী ভয় ধরিয়ে দেবে। তখন মানবাধিকারের কোনো বৈশ্বিক বা আধুনিক ধারণা বিকশিত না হওয়ায়, ধর্ষণের মতো চরম অপরাধের ক্ষেত্রে এ ধরনের পাশবিক শাস্তির সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় বৈধতা ছিল। সাধারণ মানুষও নিজেদের নিরাপত্তার স্বার্থে এটিকে ন্যায়বিচার হিসেবেই মেনে নিত।

 

আধুনিক যুগে এমন নিষ্ঠুর ও অমানবিক শাস্তি আইনত পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়েছে। আজকের বিশ্ব মানবাধিকার ও সুষ্ঠু বিচার প্রক্রিয়ায় বিশ্বাস করে। তবে, জ্যান্ত শূলে চড়ানোর মতো অধ্যায়টি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, সমাজ ও সভ্যতার আদিমকাল থেকেই ধর্ষণকে একটি ক্ষমার অযোগ্য, জঘন্য এবং চরম শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হতো।