ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) আল কুরআন অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষার্থী সাজিদ আব্দুল্লাহ হত্যাকান্ডের ১৩ মাস পার হয়েছে। দীর্ঘসময় যাবৎ এ হত্যাকান্ডের তদন্তকাজ চালিয়ে যাচ্ছেন ক্রিমিনাল ইনভেস্টিগেশন ডিপার্টমেন্ট (সিআইডি)। তবে এখনও হত্যার রহস্য উদঘাটন ও বিচার নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। শিক্ষার্থীদের ধারাবাহিক আন্দোলন, মানববন্ধন ও প্রতিবাদ কর্মসূচির পরও মামলার তদন্তে গতি ফেরেনি। এমনকি তদন্তকারী কর্মকর্তা পরিবর্তনের পরও এগোয়নি তদন্ত। এদিকে এ হত্যাকান্ড নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে রয়েছে বেশকিছু অমীমাংসিত প্রশ্ন।
সেগুলো হলো— হত্যাকান্ডের রাতে সাজিদের রুম সিলগালার পরও এক কর্মকর্তার রুমে প্রবেশ এবং প্রভোস্টের বিনা অনুমতিতে তার মোবাইলে এক্সেস নিয়ে সিসিটিভি ফুটেজ ডিলিট, হত্যাকান্ডের রাতে মেইন গেট দিয়ে ভ্যানে শোয়ানো এক ব্যক্তিসহ চারজনের প্রবেশ, সাজিদের মৃত্যুর পরও কয়েকবার তার মোবাইলে কল রিসিভ হওয়া, সিআইডি ১৩ মাস ধরে সাজিদের মোবাইল ফোনের লক খুলতে না পারা এবং সাজিদের কাছের বন্ধু ইনসানের ফোন ক্লোন হয়ে সাজিদ সম্পর্কিত বিভিন্ন তথ্য ডিলিট হয়ে যাওয়া। এসব প্রশ্নের উত্তর জানতে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মহব্বত হোসেনের সঙ্গে কথা বলেছেন বাংলাভিশনের ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি তালুকদার হাম্মাদ।
১. মৃত্যুর পর সাজিদের সিলগালা করা রুমে এক কর্মচারীর প্রবেশ এবং সিসিটিভি ফুটেজ ডিলিট
জানা যায়, মরদেহ উদ্ধারের পর ওইদিন রাতেই শহীদ জিয়াউর রহমান হলের সাজিদের কক্ষটি সিলগালা করে পুলিশ। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের গঠিত ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটির প্রতিবদেনে উঠে এসেছে, সিলগালা করার পরেও ওই কক্ষে সংশ্লিষ্ট হলের এক থোক বরাদ্দের কর্মচারী আব্দুল কাদের প্রবেশ করে। সিলাগালার সময় কক্ষটি অগোছালো থাকলেও ওই কর্মচারী প্রবেশের পর এটিকে পরিপাটি হিসেবে পাওয়া যায়। এছাড়া হলে নতুন করে সিসিটিভি ক্যামেরা লাগালে ওই কর্মচারী হল প্রভোস্টের বিনা অনুমতিতে তার মোবাইল ফোন থেকে নিজের মোবাইলে ক্যামেরার এক্সেস নিয়ে সেসময়ের ফুটেজ ডিলিট করে দেন।
এ বিষয়ে তদন্তকারী কর্মকর্তা মহব্বত হোসেন বলেন, সিলগালার পর কেউ ঢুকে রুমে ঢুকেছে এটির কোনো সত্যতা আমরা পাইনি। একইসাথে ওই কর্মকর্তা হলের সিসিটিভির এক্সেস নিয়ে ফুটেজ ডিলিট করেছে ব্যাপারটি এমন না। মূলত সে পাসওয়ার্ডটা মোবাইলে দেখার চেষ্টা করছিল। তখন সেটি লক হয়ে যায়। এখানে অন্য কোনো দূরভিসন্ধি ছিল বলে তদন্তে পাওয়া যায়নি।
২. লাশ উদ্ধারের আগের রাতে মেইন গেট দিয়ে ভ্যানে শোয়ানো এক ব্যক্তিসহ চারজনের প্রবেশ
এদিকে সাজিদের লাশ উদ্ধারের আগের রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের দায়িত্বরত আনসার সদস্য সাংবাদিকদের জানান, লাশ উদ্ধারের আগেরদিন মধ্যরাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটক দিয়ে ভ্যানে শোয়ানো এক ব্যক্তিসহ চারজন প্রবেশ করেছিল। ওই বক্তব্য বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশের পর চাপে পড়ে ওই আনসার সদস্য তখন বক্তব্য পাল্টে ঘটনাটি তার একদিন আগের বলে দাবি করেন। তবে শিক্ষার্থীরা সেসময় ‘ওই ভ্যানেই সাজিদের লাশ নিয়ে আসা হয়েছিল কি-না’— সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এমন সন্দেহযুক্ত বিভিন্ন পোস্ট করেছিলেন।
বিষয়টি নিয়ে তদন্তকারী কর্মকর্তা বলেন, মেইনগেইট দিয়ে প্রবেশ করা ভ্যানে শোয়ানো কেউ ছিল না। ভ্যানওয়ালাসহ ভ্যানে থাকা সবাইকে আমরা জিজ্ঞাসাবাদ করেছি। মূলত ওরা ওইদিন এমনিতে পুকুরপাড়ে ঘুরতে গেছিল। এ ঘটনায় হত্যাকান্ডের কোনো ক্লু নেই।
৩. মৃত্যুর পরও কয়েকবার সাজিদের মোবাইলে কল রিসিভ হওয়া
জানা যায়, সাজিদের মরদেহ পুকুরে ভেসে ওঠার পরপর কয়েকবার তার ফোনে কল রিসিভ হয়। সর্বশেষ ক্যাম্পাসে তাকে দেখা যাওয়ার পর থেকে পুকুরে লাশ ভেসে ওঠার মধ্যে প্রায় ২৬ ঘণ্টায় সাজিদের ফোনে মোট পাঁচবার কল রিসিভ হয়। তার ফোনে এসব কল তারই তিনজন সহপাঠী ইমরান জাহান, নুসরাত ঐশী ও ইনসানুল ইমাম করেছিলেন বলে দাবি তাদের। তবে কল রিসিভ হলেও অপরপাশ থেকে কারও কথা শোনা যায়নি বলে দাবি কলদাতাদের। এ ঘটনা আলোচনায় আসলে সেসময় ক্যাম্পাসে নতুন করে চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছিল।
এ নিয়ে তদন্তকারী কর্মকর্তার মন্তব্য, সাজিদের মৃত্যুর পরে আসলেই কয়েকবার কল রিসিভ হয়েছিল। এটা আমরা অ্যানালাইজ করছি। দুইটা টাওয়ারকে ম্যাপ করছি। এ বিষয়ে ফলাফল পেলে জানানো হবে।
৪. ১৩ মাস ধরে সাজিদের মোবাইল ফোনের লক খুলতে না পারা
জানা যায়, ওই বছর ৪ আগস্ট সাজিদের বাবা আহসান হাবিবুল্লাহ অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে ইবি থানায় হত্যা মামলা দায়ের করে। পরে মামলাটি পরিবারের দাবির প্রেক্ষিতে পুলিশ থেকে সিআইডিতে হস্তান্তর করা হয়। কিন্তু দীর্ঘ ১৩ মাস তদন্ত কাজ চালিয়েও তেমন কোনো অগ্রগতি দেখাতে পারেনি সংস্থাটি। এমনকি নিহত সাজিদের ফোনের লকও খুলতে পারেনি তারা।
তদন্তকারী কর্মকর্তার ভাষ্য, সাজিদের ফোনের লক খোলার জন্য আমরা এক্সপার্টে পাঠালেও তারা লক খুলতে পারেনি। রেজাল্ট নেগেটিভ এসেছে। তবে এ বিষয়ে তাদের সাথে পুনরায় কথা বলবো। অন্য কোনো পদ্ধতিতে লক খোলা সম্ভব হলে অবশ্যই সেই পদ্ধতি গ্রহণের ব্যাপারে পদক্ষেপ নেব।
৫. ঘনিষ্ঠ বন্ধু ইনসানের ফোন ক্লোন হয়ে সাজিদ সম্পর্কিত বিভিন্ন তথ্য ডিলিট হয়ে যাওয়া
হত্যাকান্ডের সপ্তাহখানেক পর সাজিদের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ইনসানুল ইমাম নুর তার ফোন হ্যাক হয়েছে দাবি করে ফেসবুকে পোস্ট করেন। তিনি দাবি করেন, সাজিদের সঙ্গে তার কল হিস্ট্রি এবং গ্যালারি থেকে প্রয়োজনীয় স্ক্রিনশট ডিলিট হয়ে গেছে। তার এই ফেসবুক পোস্ট ক্যাম্পাসে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। বিষয়টি সেসময় ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের মধ্যে সাজিদ হত্যা নিয়ে আলোচনায় নতুন মাত্রা দেয়।
এ বিষয়ে তদন্তকারী কর্মকর্তা বলেন, ইনসানের ফোন ক্লোন হওয়ার ব্যাপারটাও তদন্ত করে দেখেছি। ওটা জটিল কোনো বিষয় বা হত্যাকান্ডের সাথে জড়িত কোনো বিষয় বলে মনে হয়নি।
তদন্তের সার্বিক অগ্রগতির বিষয়ে তিনি বলেন, বিভিন্ন দিক দিয়েই তদন্ত এগোনোর জন্য আমরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। একে গাফিলতি বলার সুযোগ নেই। পারিপার্শ্বিক সাক্ষীদের আমরা প্রতিনিয়ত জিজ্ঞাসাবাদ করছি। সাজিদ এক মাঠে খেলা করার পর যে আবার আরেক মাঠে খেলতে নেমেছিল সেই ব্যাপারে কিছু স্টুডেন্টকে জিজ্ঞাসাবাদ করার জন্য কয়েকদিন পর আমরা ক্যাম্পাসে যাব।

ডেস্ক রিপোর্ট 


















