ঢাকা , রবিবার, ২৬ জুলাই ২০২৬, ১১ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম ::
ফ্যামিলি কার্ড শুমারির নিয়োগ নিয়োগ পরীক্ষায় ছাত্রদলের দুই নেতার হাতাহাতি ইরানে হামলায় যুক্তরাজ্যের কোনো ঘাঁটি ব্যবহৃত হলে তা হবে ‘বৈধ লক্ষ্যবস্তু’: আইআরজিসি কৃষক সেজে ফসলি মাঠ থেকে সাজাপ্রাপ্ত পলাতক আসামিকে ধরল পুলিশ সাবেক রাষ্ট্রপতির ফৌজদারী অপরাধের বিচার সম্ভব, সংবিধানের ৫১ অনুচ্ছেদে কোন বাধা নেই: শিশির মনির বড় লক্ষ্য অর্জনে কি ধর্মেন্দ্র প্রধানকে বলির পাঁঠা বানালেন মোদি? সন্তানদের ওপর রাগ করে ফের বিয়ে করলেন ৮০ বছরের বৃদ্ধ সৌদি আরবকে বাঁচাতে অভিনব কায়দায় ইরানের সঙ্গে পাকিস্তানের সেনাপ্রধানের সমঝোতা শিগগিরই দেশে আরও এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ করা হবে: স্বাস্থ্যমন্ত্রী সেনা সদস্যদের পদোন্নতির ক্ষেত্রে রাজনৈতিক পছন্দের উর্ধ্বে থাকার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর ইরাকের এরবিলে যুক্তরাষ্ট্রের ‘প্রায় সব’ সামরিক অবকাঠামো ধ্বংসের দাবি ইরানের

বড় লক্ষ্য অর্জনে কি ধর্মেন্দ্র প্রধানকে বলির পাঁঠা বানালেন মোদি?

  • ডেস্ক রিপোর্ট
  • আপডেট সময় ০১:২৭:২৫ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৬ জুলাই ২০২৬
  • ৩ বার পড়া হয়েছে

ওডিশার সম্বলপুরের বিজেপি নেতা ধর্মেন্দ্র প্রধান ২০২১ সাল থেকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি জয়ী হওয়ার পরও তিনি একই দায়িত্বে বহাল ছিলেন। গত ৩ মে অনুষ্ঠিত নিটইউজি পরীক্ষার প্রশ্নফাঁসের অভিযোগের পর এই বিতর্কের শুরু। পরে তদন্তে দেখা যায়, পরীক্ষার কয়েক সপ্তাহ আগে শিক্ষার্থীদের মধ্যেগেস পেপারনামে ছড়িয়ে পড়া একটি নথির বহু প্রশ্নই চূড়ান্ত পরীক্ষার প্রশ্নের সঙ্গে মিলে যায়। এরপর ১২ মে জাতীয় পরীক্ষা সংস্থা (এনটিএ) পরীক্ষা বাতিল করে এবং পূর্ণাঙ্গ তদন্তের জন্য মামলাটি কেন্দ্রীয় তদন্ত ব্যুরোর (সিবিআই) কাছে হস্তান্তর করা হয়।

এরপর আন্দোলন শুরু হলে বিজেপির ভেতরে রাজনৈতিক হিসাবনিকাশ দ্রুত বদলে যেতে থাকে। দলের জ্যেষ্ঠ নেতারা স্বীকার করেছেন, পরিস্থিতির চাপ ক্রমেই বাড়ছিল। ক্ষোভ আর শুধু প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার্থীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি বিপুল সংখ্যক মানুষ রাস্তায় নেমে আসে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও তারা ব্যাপক সাড়া ফেলে এবং সরকারের রাজনৈতিক অবস্থানকেও প্রভাবিত করতে শুরু করে। কট্টর হিন্দুত্ববাদী এই দলের এক জ্যেষ্ঠ নেতা বলেন, ‘তরুণরা আর কোনও কথা শুনতে রাজি ছিল না। পরিস্থিতি বিস্ফোরণের পর্যায়ে পৌঁছেছিল। জনমত সরকারের বিপক্ষে চলে যাচ্ছিল। প্রধানের পদত্যাগপত্রেই এর উত্তর রয়েছে। আমরা অন্য কাউকে এই পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণ নিতে দিতে পারতাম না। কারা বেশি প্রতিবাদ করছিল, সেটাও আমরা জানি।

আর এই আন্দোলনের সময়টিও মোদি সরকারের জন্য ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই সময়টিতে সংসদের অধিবেশন চলছিল এবং সরকার বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ আইন পাস করাতে চাইছিল। দলের আরেক নেতা বলেন, ‘অধিবেশনের প্রথম সপ্তাহে কার্যত কোনও কাজই হয়নি। এ অধিবেশনে অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ বাকি ছিল। পুরো অধিবেশন অচল হয়ে যাক, সেটা আমরা হতে দিতে পারতাম না।দলীয় সূত্রগুলোর মতে, মোদি সরকারের বিরুদ্ধে জনঅসন্তোষ আরও বাড়ার আগেই তা নিয়ন্ত্রণে আনা ছিল বিজেপির প্রথম লক্ষ্য। এক জ্যেষ্ঠ নেতা বলেন, ‘নিট প্রশ্নফাঁসে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত কারা? তারাই তো আমাদের ভোটার। এসব পরিবারের অনেকেই বিজেপির সমর্থক। এরা উচ্চাকাঙ্ক্ষী তরুণ। তারা রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার ওপর আস্থা রাখে সবসময়। সেই আস্থা নষ্ট হলে তার রাজনৈতিক প্রভাব পড়বেই।

প্রতিবেদনে বলা হয়, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহর ঘনিষ্ঠদের একজন হিসেবে পরিচিত ধর্মেন্দ্র প্রধানকে সরকারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারক হিসেবে দেখা হতো। জাতীয় শিক্ষা নীতি (এনইপি) বাস্তবায়নের দায়িত্বও তার ওপর ছিল। এই নীতিকে বিজেপি ও রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (আরএসএস) দীর্ঘদিনের আদর্শিক অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বিজেপি নেতাদের দাবি, শুধু রাজনৈতিক চাপ নয়, মানুষের আস্থা ধরে রাখার প্রয়োজন থেকেও সরকার এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আরএসএসের এক নেতা বলেন, ‘আমরা প্রতিবেশী কয়েকটি দেশের মতো নই বাংলাদেশ ও নেপালের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘আমরা জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকার। মানুষের প্রকৃত অভিযোগ থাকলে আমাদের তা শুনতেই হবে।দলীয় সূত্রগুলোর দাবি, ব্যক্তিগত ব্যর্থতার কারণে ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করেননি। তাদের ভাষ্য, তিনি দায়িত্ব স্বীকার করে প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নিয়েছেন। তদন্ত সিবিআইয়ের হাতে তুলে দেয়া হয়েছে, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সরানো হয়েছে, দায়ীদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরীক্ষার্থীদের জন্য পুনরায় পরীক্ষা নেয়া হয়েছে।

এক দলীয় নেতা বলেন, ‘প্রশাসনিকভাবে এর চেয়ে বেশি কিছু করার সুযোগ ছিল না। সম্ভাব্য সব সংশোধনমূলক পদক্ষেপ নেয়া হয়েছিল।তবে দলীয় একাধিক সূত্র স্বীকার করেছে, প্রশাসনিক পদক্ষেপের চেয়ে রাজনৈতিক সংকট বড় হয়ে উঠেছিল। বিষয়টি আর শুধু প্রশ্নফাঁসের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ এবং সরকারের বিরুদ্ধে ক্রমবর্ধমান প্রচারের কারণে এটি জনআস্থার সংকটে পরিণত হয়। দলের এক জ্যেষ্ঠ নেতা বলেন, শিক্ষা মন্ত্রণালয় সব সময়ই সরকারের সবচেয়ে কঠিন মন্ত্রণালয়গুলোর একটি। কারণ এটি সরাসরি দেশের তরুণদের ভবিষ্যৎ ও প্রত্যাশার সঙ্গে জড়িত।

তিনি বলেন, ‘বলুন তো, এমন কোনও শিক্ষামন্ত্রী আছেন, যার মেয়াদ বিতর্কমুক্ত ছিল? ১৯৯৮ থেকে ২০০৪ সালের মধ্যে মুরলি মনোহর জোশীর সময় কি কোনও বিতর্ক হয়নি? অর্জুন সিংয়ের সময়ও বড় আন্দোলন হয়েছিল। এই মন্ত্রণালয়ের প্রতিটি সিদ্ধান্ত লাখো তরুণের ভবিষ্যতের সঙ্গে জড়িত।আন্দোলন ভারতের বিভিন্ন শহরে ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে জনমতের দিকেও নজর রাখতে শুরু করে বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্ব। এক জ্যেষ্ঠ নেতা বলেন, ‘মানুষের আবেগ দ্রুত বাড়ছিল। আবেগ তুঙ্গে উঠলে রাজনৈতিক পরিস্থিতিও দ্রুত বদলে যায়। তাই জনমতের ওপর আমাদের সতর্ক নজর রাখতে হয়েছে। পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণ হারাতে চাইনি।ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে এই কারণে যে, এর আগে কয়েক দিন ধরে সরকারের জ্যেষ্ঠ মন্ত্রী ও বিজেপি নেতারা স্পষ্টভাবে বলেছিলেন, কোনও পদত্যাগ হবে না। তাদের বক্তব্য ছিল, ভুল সংশোধন করাই সমাধান, চাপের মুখে পদত্যাগ নয়।

এক জ্যেষ্ঠ সরকারি কর্মকর্তা তখন বলেছিলেন, ‘পদত্যাগ কোনও সমাধান নয়।যদিও এক প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ভারতের কেন্দ্রীয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে ঘিরে বিতর্ক এর আগেও তৈরি হয়েছিল। চলতি বছরের জানুয়ারিতে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সমতা প্রতিষ্ঠাবিষয়ক বিধিমালা জারি করার পর উচ্চবর্ণের মানুষের বিরোধিতার মুখে সরকার সেটি প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়। কারণ তারা বিজেপির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভোটব্যাংক। এরপর মে মাসে সিবিএসইর দ্বাদশ শ্রেণির অনস্ক্রিন মার্কিং (ওএসএম) মূল্যায়ন পদ্ধতি চালু করা হয়। কিন্তু ঝাপসা উত্তরপত্র, উত্তরপত্রের অমিল এবং একাধিকবার পোর্টাল বিকল হয়ে যাওয়াসহ নানা অভিযোগ ওঠে। এমনকি কিছু শিক্ষার্থীর উত্তরপত্র অন্যদের কাছে মূল্যায়নের জন্য চলে যাওয়ায় তাদের নম্বর কম আসে বলেও অভিযোগ ছিল। এই কাজের দায়িত্ব পাওয়া প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে এর আগে তেলেঙ্গানাতেও একই ধরনের অভিযোগ উঠেছিল।

২০২৪ সালেও নিটইউজি পরীক্ষার ফল প্রকাশ ও প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ নিয়ে ধর্মেন্দ্র প্রধান সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন। তখন তিনি বলেছিলেন, প্রশ্নফাঁসের ঘটনা সীমিতসংখ্যক শিক্ষার্থীকে প্রভাবিত করেছে। তাই লাখো বৈধ পরীক্ষার্থীর স্বার্থে পুরো পরীক্ষা বাতিল করা উচিত হবে না। ওডিশা থেকে উঠে আসা বিজেপির অন্যতম প্রভাবশালী ওবিসি নেতা হিসেবে পরিচিত ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগকে তার সামগ্রিক কর্মদক্ষতার মূল্যায়ন হিসেবে না দেখার আহ্বান জানিয়েছেন দলীয় নেতারা। তাদের ভাষ্য, এটি ছিল একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। আর এর উদ্দেশ্য ছিল জনরোষ প্রশমিত করা, পরীক্ষা ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং তরুণদের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত এড়িয়ে সরকারের বৃহত্তর কর্মসূচিকে এগিয়ে নেয়া।

প্রতিবেদনে বলা হয়, জনঅসন্তোষ যখন ক্রমেই বাড়ছিল এবং বিষয়টি সংসদ ও সরকারের পুরো কর্মসূচিকে ছাপিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল, তখন ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগই প্রমাণ করে যে পরিস্থিতির গভীরতা বুঝতে পেরেছিল মোদি সরকার।

ট্যাগস

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

জনপ্রিয় সংবাদ

ফ্যামিলি কার্ড শুমারির নিয়োগ নিয়োগ পরীক্ষায় ছাত্রদলের দুই নেতার হাতাহাতি

বড় লক্ষ্য অর্জনে কি ধর্মেন্দ্র প্রধানকে বলির পাঁঠা বানালেন মোদি?

আপডেট সময় ০১:২৭:২৫ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৬ জুলাই ২০২৬

ওডিশার সম্বলপুরের বিজেপি নেতা ধর্মেন্দ্র প্রধান ২০২১ সাল থেকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি জয়ী হওয়ার পরও তিনি একই দায়িত্বে বহাল ছিলেন। গত ৩ মে অনুষ্ঠিত নিটইউজি পরীক্ষার প্রশ্নফাঁসের অভিযোগের পর এই বিতর্কের শুরু। পরে তদন্তে দেখা যায়, পরীক্ষার কয়েক সপ্তাহ আগে শিক্ষার্থীদের মধ্যেগেস পেপারনামে ছড়িয়ে পড়া একটি নথির বহু প্রশ্নই চূড়ান্ত পরীক্ষার প্রশ্নের সঙ্গে মিলে যায়। এরপর ১২ মে জাতীয় পরীক্ষা সংস্থা (এনটিএ) পরীক্ষা বাতিল করে এবং পূর্ণাঙ্গ তদন্তের জন্য মামলাটি কেন্দ্রীয় তদন্ত ব্যুরোর (সিবিআই) কাছে হস্তান্তর করা হয়।

এরপর আন্দোলন শুরু হলে বিজেপির ভেতরে রাজনৈতিক হিসাবনিকাশ দ্রুত বদলে যেতে থাকে। দলের জ্যেষ্ঠ নেতারা স্বীকার করেছেন, পরিস্থিতির চাপ ক্রমেই বাড়ছিল। ক্ষোভ আর শুধু প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার্থীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি বিপুল সংখ্যক মানুষ রাস্তায় নেমে আসে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও তারা ব্যাপক সাড়া ফেলে এবং সরকারের রাজনৈতিক অবস্থানকেও প্রভাবিত করতে শুরু করে। কট্টর হিন্দুত্ববাদী এই দলের এক জ্যেষ্ঠ নেতা বলেন, ‘তরুণরা আর কোনও কথা শুনতে রাজি ছিল না। পরিস্থিতি বিস্ফোরণের পর্যায়ে পৌঁছেছিল। জনমত সরকারের বিপক্ষে চলে যাচ্ছিল। প্রধানের পদত্যাগপত্রেই এর উত্তর রয়েছে। আমরা অন্য কাউকে এই পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণ নিতে দিতে পারতাম না। কারা বেশি প্রতিবাদ করছিল, সেটাও আমরা জানি।

আর এই আন্দোলনের সময়টিও মোদি সরকারের জন্য ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই সময়টিতে সংসদের অধিবেশন চলছিল এবং সরকার বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ আইন পাস করাতে চাইছিল। দলের আরেক নেতা বলেন, ‘অধিবেশনের প্রথম সপ্তাহে কার্যত কোনও কাজই হয়নি। এ অধিবেশনে অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ বাকি ছিল। পুরো অধিবেশন অচল হয়ে যাক, সেটা আমরা হতে দিতে পারতাম না।দলীয় সূত্রগুলোর মতে, মোদি সরকারের বিরুদ্ধে জনঅসন্তোষ আরও বাড়ার আগেই তা নিয়ন্ত্রণে আনা ছিল বিজেপির প্রথম লক্ষ্য। এক জ্যেষ্ঠ নেতা বলেন, ‘নিট প্রশ্নফাঁসে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত কারা? তারাই তো আমাদের ভোটার। এসব পরিবারের অনেকেই বিজেপির সমর্থক। এরা উচ্চাকাঙ্ক্ষী তরুণ। তারা রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার ওপর আস্থা রাখে সবসময়। সেই আস্থা নষ্ট হলে তার রাজনৈতিক প্রভাব পড়বেই।

প্রতিবেদনে বলা হয়, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহর ঘনিষ্ঠদের একজন হিসেবে পরিচিত ধর্মেন্দ্র প্রধানকে সরকারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারক হিসেবে দেখা হতো। জাতীয় শিক্ষা নীতি (এনইপি) বাস্তবায়নের দায়িত্বও তার ওপর ছিল। এই নীতিকে বিজেপি ও রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (আরএসএস) দীর্ঘদিনের আদর্শিক অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বিজেপি নেতাদের দাবি, শুধু রাজনৈতিক চাপ নয়, মানুষের আস্থা ধরে রাখার প্রয়োজন থেকেও সরকার এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আরএসএসের এক নেতা বলেন, ‘আমরা প্রতিবেশী কয়েকটি দেশের মতো নই বাংলাদেশ ও নেপালের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘আমরা জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকার। মানুষের প্রকৃত অভিযোগ থাকলে আমাদের তা শুনতেই হবে।দলীয় সূত্রগুলোর দাবি, ব্যক্তিগত ব্যর্থতার কারণে ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করেননি। তাদের ভাষ্য, তিনি দায়িত্ব স্বীকার করে প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নিয়েছেন। তদন্ত সিবিআইয়ের হাতে তুলে দেয়া হয়েছে, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সরানো হয়েছে, দায়ীদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরীক্ষার্থীদের জন্য পুনরায় পরীক্ষা নেয়া হয়েছে।

এক দলীয় নেতা বলেন, ‘প্রশাসনিকভাবে এর চেয়ে বেশি কিছু করার সুযোগ ছিল না। সম্ভাব্য সব সংশোধনমূলক পদক্ষেপ নেয়া হয়েছিল।তবে দলীয় একাধিক সূত্র স্বীকার করেছে, প্রশাসনিক পদক্ষেপের চেয়ে রাজনৈতিক সংকট বড় হয়ে উঠেছিল। বিষয়টি আর শুধু প্রশ্নফাঁসের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ এবং সরকারের বিরুদ্ধে ক্রমবর্ধমান প্রচারের কারণে এটি জনআস্থার সংকটে পরিণত হয়। দলের এক জ্যেষ্ঠ নেতা বলেন, শিক্ষা মন্ত্রণালয় সব সময়ই সরকারের সবচেয়ে কঠিন মন্ত্রণালয়গুলোর একটি। কারণ এটি সরাসরি দেশের তরুণদের ভবিষ্যৎ ও প্রত্যাশার সঙ্গে জড়িত।

তিনি বলেন, ‘বলুন তো, এমন কোনও শিক্ষামন্ত্রী আছেন, যার মেয়াদ বিতর্কমুক্ত ছিল? ১৯৯৮ থেকে ২০০৪ সালের মধ্যে মুরলি মনোহর জোশীর সময় কি কোনও বিতর্ক হয়নি? অর্জুন সিংয়ের সময়ও বড় আন্দোলন হয়েছিল। এই মন্ত্রণালয়ের প্রতিটি সিদ্ধান্ত লাখো তরুণের ভবিষ্যতের সঙ্গে জড়িত।আন্দোলন ভারতের বিভিন্ন শহরে ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে জনমতের দিকেও নজর রাখতে শুরু করে বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্ব। এক জ্যেষ্ঠ নেতা বলেন, ‘মানুষের আবেগ দ্রুত বাড়ছিল। আবেগ তুঙ্গে উঠলে রাজনৈতিক পরিস্থিতিও দ্রুত বদলে যায়। তাই জনমতের ওপর আমাদের সতর্ক নজর রাখতে হয়েছে। পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণ হারাতে চাইনি।ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে এই কারণে যে, এর আগে কয়েক দিন ধরে সরকারের জ্যেষ্ঠ মন্ত্রী ও বিজেপি নেতারা স্পষ্টভাবে বলেছিলেন, কোনও পদত্যাগ হবে না। তাদের বক্তব্য ছিল, ভুল সংশোধন করাই সমাধান, চাপের মুখে পদত্যাগ নয়।

এক জ্যেষ্ঠ সরকারি কর্মকর্তা তখন বলেছিলেন, ‘পদত্যাগ কোনও সমাধান নয়।যদিও এক প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ভারতের কেন্দ্রীয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে ঘিরে বিতর্ক এর আগেও তৈরি হয়েছিল। চলতি বছরের জানুয়ারিতে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সমতা প্রতিষ্ঠাবিষয়ক বিধিমালা জারি করার পর উচ্চবর্ণের মানুষের বিরোধিতার মুখে সরকার সেটি প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়। কারণ তারা বিজেপির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভোটব্যাংক। এরপর মে মাসে সিবিএসইর দ্বাদশ শ্রেণির অনস্ক্রিন মার্কিং (ওএসএম) মূল্যায়ন পদ্ধতি চালু করা হয়। কিন্তু ঝাপসা উত্তরপত্র, উত্তরপত্রের অমিল এবং একাধিকবার পোর্টাল বিকল হয়ে যাওয়াসহ নানা অভিযোগ ওঠে। এমনকি কিছু শিক্ষার্থীর উত্তরপত্র অন্যদের কাছে মূল্যায়নের জন্য চলে যাওয়ায় তাদের নম্বর কম আসে বলেও অভিযোগ ছিল। এই কাজের দায়িত্ব পাওয়া প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে এর আগে তেলেঙ্গানাতেও একই ধরনের অভিযোগ উঠেছিল।

২০২৪ সালেও নিটইউজি পরীক্ষার ফল প্রকাশ ও প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ নিয়ে ধর্মেন্দ্র প্রধান সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন। তখন তিনি বলেছিলেন, প্রশ্নফাঁসের ঘটনা সীমিতসংখ্যক শিক্ষার্থীকে প্রভাবিত করেছে। তাই লাখো বৈধ পরীক্ষার্থীর স্বার্থে পুরো পরীক্ষা বাতিল করা উচিত হবে না। ওডিশা থেকে উঠে আসা বিজেপির অন্যতম প্রভাবশালী ওবিসি নেতা হিসেবে পরিচিত ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগকে তার সামগ্রিক কর্মদক্ষতার মূল্যায়ন হিসেবে না দেখার আহ্বান জানিয়েছেন দলীয় নেতারা। তাদের ভাষ্য, এটি ছিল একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। আর এর উদ্দেশ্য ছিল জনরোষ প্রশমিত করা, পরীক্ষা ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং তরুণদের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত এড়িয়ে সরকারের বৃহত্তর কর্মসূচিকে এগিয়ে নেয়া।

প্রতিবেদনে বলা হয়, জনঅসন্তোষ যখন ক্রমেই বাড়ছিল এবং বিষয়টি সংসদ ও সরকারের পুরো কর্মসূচিকে ছাপিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল, তখন ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগই প্রমাণ করে যে পরিস্থিতির গভীরতা বুঝতে পেরেছিল মোদি সরকার।