এবার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আবার যুদ্ধ শুরু হলেও ইরান তার জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত বলে জানিয়েছেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। তিনি বলেছেন, যুদ্ধ নতুন করে শুরু হলে ইরান দৃঢ়ভাবে তা মোকাবিলা করবে। ভারতীয় সংবাদ সংস্থা এএনআই নিউজ জানায়, রবিবার স্থানীয় সময় মার্কিন সংবাদমাধ্যম এনবিসি নিউজের ‘মিট দ্য প্রেস’ অনুষ্ঠানে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন আরাগচি। তিনি একই সঙ্গে জানিয়েছেন, যুদ্ধের পাশাপাশি কূটনীতির পথও খোলা রাখতে চায় ইরান। তবে এ বিষয়ে এখন সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের।
সাক্ষাৎকারে আরাগচি বলেন, যুদ্ধ আবার শুরু হলে ইরান পুরোপুরি প্রস্তুত থাকবে। নতুন করে কোনো হামলা হলে তারও জবাব দেওয়া হবে। তিনি বলেন, ‘আমরা যুদ্ধ আবার শুরু হলে তার জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত। নতুন কোনো আগ্রাসনের মুখেও আমরা দৃঢ় থাকব। এমনকি সেটি ধ্বংসাত্মক যুদ্ধে পরিণত হলেও।’ ইরান যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন নিয়ে চিন্তিত নয় বলেও জানান তিনি। তার ভাষ্য, ইরানের মূল লক্ষ্য নিজেদের জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করা। আরাগচি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন নিয়ে আমাদের কোনো মাথাব্যথা নেই। আমরা আমাদের জাতীয় স্বার্থ নিয়েই চিন্তা করি।’
যুদ্ধের প্রস্তুতির পাশাপাশি কূটনৈতিক আলোচনার সুযোগও ইরান রাখতে চায় বলে জানান আরাগচি। তিনি বলেন, ‘একই সময়ে আমরা কূটনীতির জন্যও প্রস্তুত আছি। এখন সিদ্ধান্ত প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের।’ এর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তেহরানের দেওয়া হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দেওয়ার প্রস্তাব প্রকাশ্যে প্রত্যাখ্যান করেন। ২৭ সেপ্টেম্বর এনবিসি নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে আরাগচি এ বিষয়ে কথা বলেন। একই সাক্ষাৎকারে তিনি মার্কিন সংবাদপত্র ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের একটি প্রতিবেদন নিয়েও মন্তব্য করেন। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ট্রাম্প ইরানের দেওয়া সাত দিনের যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন। প্রতিবেদনে মার্কিন কর্মকর্তাদের উদ্ধৃত করে আরো বলা হয়, ট্রাম্প তার সহযোগীদের জানিয়েছেন, নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর তিনি ইরানে আবার হামলা চালানোর কথা ভাবছেন। এর আগে চলতি সপ্তাহে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে দেওয়া ভাষণেও ট্রাম্প ইরানকে ধ্বংস করার হুমকি দিয়েছিলেন।
ইরান হরমুজ প্রণালির নৌপথ খুলে দিতে প্রস্তুত বলে আবারও জানিয়েছেন আরাগচি। তবে এর জন্য কিছু শর্ত পূরণ করতে হবে বলে জানান তিনি। আরাগচির দাবি, যুদ্ধ বন্ধের বিষয়ে একটি সমঝোতা হলে তার অংশ হিসেবে ইরান হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলের সুযোগ দিতে রাজি। তিনি বলেন, ‘আমরা আমাদের অর্থ ও সম্পদ ফেরত চাই। যেগুলো অবৈধভাবে আটকে রাখা হয়েছে, সেগুলো ছেড়ে দিতে হবে। আমরা আমাদের তেল বিক্রি করতে চাই।’ আরাগচি জানান, ইরানের এসব দাবি জুনে স্বাক্ষরিত একটি সমঝোতা স্মারকের শর্তের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। ওই সমঝোতায় সাময়িক যুদ্ধবিরতির কথা ছিল। তবে পরে দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি হামলার কারণে সেই সমঝোতা ভেঙে যায়।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, কূটনীতিতে ফিরে যাওয়ার বিষয়ে তেহরানের আগ্রহ কম থাকলেও শান্তির সুযোগ থাকলে তা কাজে লাগাতে চান তিনি। আরাগচি বলেন, ‘আপনি যদি আমাদের জিজ্ঞেস করেন, তাহলে কূটনীতিতে ফিরে যাওয়ার কোনো কারণ নেই। কিন্তু আমি এখনো কূটনৈতিক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। কারণ আমি মনে করি, শান্তির জন্য কোনো সুযোগই আমাদের হারানো উচিত নয়।’ ইরানের প্রস্তাবের বিরোধিতা করেছেন জাতিসংঘে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক ওয়াল্টজও। আরাগচির সাক্ষাৎকারের আগে একই ‘মিট দ্য প্রেস’ অনুষ্ঠানে তিনি ওয়াশিংটনের অবস্থান তুলে ধরেন।
ওয়াল্টজ বলেন, কয়েকটি কারণে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের প্রস্তাব গ্রহণ করেনি। এর মধ্যে অন্যতম হলো ইরানের আটকে থাকা কয়েক শ কোটি ডলারের সম্পদে প্রবেশাধিকার দেওয়ার দাবি। তিনি বলেন, ইরান এমন একটি প্রস্তাব দিয়েছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। ওয়াল্টজের ভাষ্য, ইরান অবরোধ তুলে নেওয়া, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং আটকে থাকা কয়েক শ কোটি ডলারের সম্পদে প্রবেশাধিকার চেয়েছে। ইরানে এখন আসলে ‘কার হাতে সিদ্ধান্তের ক্ষমতা’—এমন প্রশ্ন তুলে ওয়াল্টজ অভিযোগ করেন, তেহরান আগের সমঝোতা থেকে সরে গেছে। আন্তর্জাতিক জলসীমায় বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালিয়ে তারা সেই সমঝোতা ভেঙেছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
ওয়াল্টজ বলেন, ‘আমার মনে হয় এটা খুবই স্বাভাবিক যে, এবার প্রেসিডেন্টের আস্থা খুব বেশি নেই। কারণ কয়েক মাস আগেই আমরা চেষ্টা করেছি।’ তিনি বলেন, দীর্ঘমেয়াদে পরমাণু অস্ত্রের বিস্তার ঠেকানোই প্রশাসনের মূল লক্ষ্য। তিনি আরো বলেন, ‘আমি শুধু এটুকু বলতে পারি, বিশ্বকে নিরাপদ রাখতে প্রেসিডেন্ট সব ধরনের বিকল্প খোলা রাখবেন। যাতে ইরান পরমাণু অস্ত্রের মাধ্যমে পুরো বিশ্বকে জিম্মি করতে না পারে।’ ওয়াল্টজের এই মন্তব্যের আগে বৃহস্পতিবার ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাইয়েদ আব্বাস আরাগচি জানিয়েছিলেন, পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত শেষ করতে ইরান সাত দিনের একটি পরিকল্পনা দিয়েছে। ওই পরিকল্পনার আওতায় হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দেওয়ার কথা রয়েছে। এরপর ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরুর প্রস্তাবও রয়েছে।
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে সাংবাদিকদের আরাগচি বলেন, এ প্রস্তাবটি চলতি বছরের জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে হওয়া সমঝোতা স্মারকের মতোই। তিনি বলেন, ‘মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে আমরা যুক্তরাষ্ট্রের কাছে একটি পরিকল্পনা দিয়েছি। সেখানে বলা হয়েছে, কিছু শর্ত পূরণ হলে সপ্তম দিনের শেষে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া হবে এবং আলোচনা আবার শুরু হবে। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগেই যদি একটি চুক্তি হয়, তাহলে সেটি আরো ভালো হবে।’ এদিকে গুরুত্বপূর্ণ একটি সমুদ্রপথ নিয়ে প্রস্তাবিত আঞ্চলিক সমঝোতা প্রত্যাখ্যানের কথা আবারও জানিয়েছেন ট্রাম্প। গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথ নিয়ে দেওয়া শর্তগুলোও তিনি নাকচ করে দিয়েছেন। ইরান সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট স্টুডেন্ট নিউজ নেটওয়ার্কের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্প জোর দিয়ে বলেন, ‘আমি এই চুক্তি প্রত্যাখ্যান করছি।’ তিনি আরো বলেন, ‘তারা এমন একটি চুক্তি করতে চায়, যার আওতায় হরমুজ প্রণালি সঙ্গে সঙ্গে খুলে দেওয়া হবে। কারণ তারা ভয়াবহভাবে ব্যর্থ হচ্ছে।’ এখন ইরানের দেওয়া শান্তির প্রস্তাব ট্রাম্প প্রত্যাখ্যান করায় পশ্চিম এশিয়ার পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হতে পারে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন শেষ হওয়ার পর এই উত্তেজনা আরো বাড়তে পারে।

ডেস্ক রিপোর্ট 






















