ঢাকা , মঙ্গলবার, ১৩ জানুয়ারী ২০২৬, ২৯ পৌষ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম ::
‘আমি ওসমানকে দেশের জন্য রেখেছিলাম’: মাসুমা হাদি মুক্তাগাছায় জাতীয় পার্টির ২ শতাধিক নেতার বিএনপিতে যোগদান ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় বিয়ে বাড়িতে যাওয়া নিয়ে সংঘর্ষ : সাবেক ইউপি সদস্য নিহত, আহত অন্তত ২০ তাহেরির স্ত্রীর কোনো স্বর্ণ নেই, নিজের আছে ৩১ ভরি ‘মুজিব কোট আয়রন করে তুলে রেখেছি, এবার ধানের শীষে ভোট দেবো’ বছরের শুরুতেই বড় ধাক্কা খেল ভারত খালেদা জিয়ার জন্য আয়োজিত দোয়া মাহফিলে হামলা করে খাবার লুট, আহত ২ মোস্তাফিজকে বাদ দিয়ে ভারতে খেলতে যাওয়ার সুপারিশ আইসিসির বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে ‘স্টারলিংক’ ইন্টারনেট অচল করে দিলো ইরান সরকারি ক্যাম্পেইনের ব্যানারে ‘ধানের শীষে ভোট দিন’ লেখা নিয়ে তোলপাড়

পাস নম্বর ৩৩: ইতিহাসের বাঁকে লুকিয়ে থাকা একটি সংখ্যার গল্প

  • ডেস্ক রিপোর্ট
  • আপডেট সময় ০৩:০৩:০৫ অপরাহ্ন, শনিবার, ৩১ মে ২০২৫
  • ১৮৫৪ বার পড়া হয়েছে

আমাদের শিক্ষাজীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো পরীক্ষায় পাস নম্বর। অধিকাংশ শিক্ষার্থীর কাছে ‘৩৩’ শুধু একটি সংখ্যা নয়, বরং আতঙ্ক, উত্তরণের শেষ সীমানা। পরীক্ষায় ৩৩ এর নিচে নম্বর পেলেই “ফেল” আর তার ওপরে উঠতে পারলেই “পাস”। কিন্তু কখনো কি মনে হয়েছে কেন এই ৩৩ সংখ্যাটিকেই পাস নম্বর হিসেবে নির্ধারণ করা হলো? কেন হলো না ৩২, ৩৪ বা ৩৫?

এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে ফিরে যেতে হবে উপমহাদেশের ইতিহাসে। জানা যায়, এই ৩৩ নম্বরের প্রবর্তন হয়েছিল ব্রিটিশ উপনিবেশ আমলে। ১৮৫৮ সালে ভারতীয় উপমহাদেশে প্রথমবারের মতো ‘মেট্রিকুলেশন’ পরীক্ষা চালু হয়। পাশ নম্বর নির্ধারণ নিয়ে তখনকার শিক্ষা বোর্ড দ্বিধায় পড়ে ব্রিটেনে চিঠি পাঠায় পরামর্শের জন্য।

সে সময় ব্রিটিশ শিক্ষার্থীদের পাস করতে হতো ন্যূনতম ৬৫ শতাংশ নম্বর পেয়ে। তবে ব্রিটিশ শাসকরা ভারতীয় উপমহাদেশের মানুষদের বুদ্ধি ও দক্ষতায় নিজেদের তুলনায় অর্ধেক মনে করতেন। তাদের ভাষায় – “The people of subcontinent are half as intellectual and efficient as compared to the British.”

এই ধারণার ভিত্তিতেই ৬৫ শতাংশের অর্ধেক, অর্থাৎ ৩২.৫ শতাংশকে পাস নম্বর হিসেবে নির্ধারণ করা হয়। পরে ১৮৬১ সালে গণনার সুবিধার্থে এই দশমিক সংখ্যাটিকে রাউন্ড ফিগারে রূপ দিয়ে ৩৩ করা হয়। সেই থেকেই এই ৩৩ শতাংশের প্রচলন শুরু হয়, যা আজও বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানে বহাল রয়েছে।

অন্যদিকে, বিশ্বের অন্যান্য অনেক দেশে পাস নম্বরের মানদণ্ড একদমই আলাদা। উদাহরণস্বরূপ, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, সৌদি আরব কিংবা আফগানিস্তানে পাস করতে হলে প্রয়োজন হয় ৬০ শতাংশ নম্বর। ইরান, ইরাকসহ বেশিরভাগ মধ্যপ্রাচ্য দেশে পাস নম্বর ৫০ শতাংশ।

চীনের শিক্ষাব্যবস্থা আরও ভিন্ন। সেখানে পাস নম্বর সাধারণত ৬০ শতাংশ হলেও, কেউ পাস নম্বর না পেলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তাকে ‘মার্ক ব্যাংক’ থেকে নম্বর ধার দেওয়ার সুযোগ দেয়। পরবর্তী পরীক্ষায় ভালো করলে ধার করা নম্বর কেটে রাখা হয়। এমন ব্যতিক্রমধর্মী ব্যবস্থা শিক্ষার্থীদের জন্য যেমন সুযোগ তৈরি করে, তেমনি বাড়ায় দায়িত্ববোধও।

বর্তমানে শুধু লিখিত পরীক্ষার মাধ্যমেই নয়, প্রেজেন্টেশন, অ্যাসাইনমেন্ট, মৌখিক পরীক্ষা ও ফিল্ডওয়ার্কের মাধ্যমেও মূল্যায়ন করা হয় একজন শিক্ষার্থীকে। তবে এখনও উপমহাদেশে ৩৩ নম্বর পাস মার্কের প্রচলন সেই ব্রিটিশ আমলের মনস্তত্ত্বেরই ধারাবাহিকতা বহন করে চলেছে, যার উৎস নিহিত এক অবমূল্যায়নমূলক ঐতিহাসিক ব্যাখ্যায়।

এই ১৬০ বছরের পুরনো মানদণ্ড হয়তো সময় এসেছে নতুন আলোচনায় নিয়ে আসার, যেন শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন হয় বাস্তব দক্ষতা ও সামর্থ্যের ভিত্তিতে, কেবল ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার নয়।

ট্যাগস

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

জনপ্রিয় সংবাদ

‘আমি ওসমানকে দেশের জন্য রেখেছিলাম’: মাসুমা হাদি

পাস নম্বর ৩৩: ইতিহাসের বাঁকে লুকিয়ে থাকা একটি সংখ্যার গল্প

আপডেট সময় ০৩:০৩:০৫ অপরাহ্ন, শনিবার, ৩১ মে ২০২৫

আমাদের শিক্ষাজীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো পরীক্ষায় পাস নম্বর। অধিকাংশ শিক্ষার্থীর কাছে ‘৩৩’ শুধু একটি সংখ্যা নয়, বরং আতঙ্ক, উত্তরণের শেষ সীমানা। পরীক্ষায় ৩৩ এর নিচে নম্বর পেলেই “ফেল” আর তার ওপরে উঠতে পারলেই “পাস”। কিন্তু কখনো কি মনে হয়েছে কেন এই ৩৩ সংখ্যাটিকেই পাস নম্বর হিসেবে নির্ধারণ করা হলো? কেন হলো না ৩২, ৩৪ বা ৩৫?

এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে ফিরে যেতে হবে উপমহাদেশের ইতিহাসে। জানা যায়, এই ৩৩ নম্বরের প্রবর্তন হয়েছিল ব্রিটিশ উপনিবেশ আমলে। ১৮৫৮ সালে ভারতীয় উপমহাদেশে প্রথমবারের মতো ‘মেট্রিকুলেশন’ পরীক্ষা চালু হয়। পাশ নম্বর নির্ধারণ নিয়ে তখনকার শিক্ষা বোর্ড দ্বিধায় পড়ে ব্রিটেনে চিঠি পাঠায় পরামর্শের জন্য।

সে সময় ব্রিটিশ শিক্ষার্থীদের পাস করতে হতো ন্যূনতম ৬৫ শতাংশ নম্বর পেয়ে। তবে ব্রিটিশ শাসকরা ভারতীয় উপমহাদেশের মানুষদের বুদ্ধি ও দক্ষতায় নিজেদের তুলনায় অর্ধেক মনে করতেন। তাদের ভাষায় – “The people of subcontinent are half as intellectual and efficient as compared to the British.”

এই ধারণার ভিত্তিতেই ৬৫ শতাংশের অর্ধেক, অর্থাৎ ৩২.৫ শতাংশকে পাস নম্বর হিসেবে নির্ধারণ করা হয়। পরে ১৮৬১ সালে গণনার সুবিধার্থে এই দশমিক সংখ্যাটিকে রাউন্ড ফিগারে রূপ দিয়ে ৩৩ করা হয়। সেই থেকেই এই ৩৩ শতাংশের প্রচলন শুরু হয়, যা আজও বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানে বহাল রয়েছে।

অন্যদিকে, বিশ্বের অন্যান্য অনেক দেশে পাস নম্বরের মানদণ্ড একদমই আলাদা। উদাহরণস্বরূপ, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, সৌদি আরব কিংবা আফগানিস্তানে পাস করতে হলে প্রয়োজন হয় ৬০ শতাংশ নম্বর। ইরান, ইরাকসহ বেশিরভাগ মধ্যপ্রাচ্য দেশে পাস নম্বর ৫০ শতাংশ।

চীনের শিক্ষাব্যবস্থা আরও ভিন্ন। সেখানে পাস নম্বর সাধারণত ৬০ শতাংশ হলেও, কেউ পাস নম্বর না পেলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তাকে ‘মার্ক ব্যাংক’ থেকে নম্বর ধার দেওয়ার সুযোগ দেয়। পরবর্তী পরীক্ষায় ভালো করলে ধার করা নম্বর কেটে রাখা হয়। এমন ব্যতিক্রমধর্মী ব্যবস্থা শিক্ষার্থীদের জন্য যেমন সুযোগ তৈরি করে, তেমনি বাড়ায় দায়িত্ববোধও।

বর্তমানে শুধু লিখিত পরীক্ষার মাধ্যমেই নয়, প্রেজেন্টেশন, অ্যাসাইনমেন্ট, মৌখিক পরীক্ষা ও ফিল্ডওয়ার্কের মাধ্যমেও মূল্যায়ন করা হয় একজন শিক্ষার্থীকে। তবে এখনও উপমহাদেশে ৩৩ নম্বর পাস মার্কের প্রচলন সেই ব্রিটিশ আমলের মনস্তত্ত্বেরই ধারাবাহিকতা বহন করে চলেছে, যার উৎস নিহিত এক অবমূল্যায়নমূলক ঐতিহাসিক ব্যাখ্যায়।

এই ১৬০ বছরের পুরনো মানদণ্ড হয়তো সময় এসেছে নতুন আলোচনায় নিয়ে আসার, যেন শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন হয় বাস্তব দক্ষতা ও সামর্থ্যের ভিত্তিতে, কেবল ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার নয়।