ইতিহাস কখনো শূন্যে দাঁড়িয়ে রায় দেয় না। ইতিহাস বিচার করে রক্তের দাগ, ত্যাগের ভার আর সংগ্রামের দীর্ঘ দলিল দেখে। সেই ইতিহাস আজ আবার সাক্ষ্য দিচ্ছে—বাংলাদেশে আরেকজন ক্ষণজন্মা বিপ্লবীর শাহাদত কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি একটি দীর্ঘ ঐতিহাসিক ধারার অনিবার্য অংশ। এই ভূখণ্ডে যখনই কেউ স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়িয়েছে, তখনই তাকে স্তব্ধ করার চেষ্টা হয়েছে। কিন্তু ইতিহাসের নির্মম সত্য হলো—দমন করে কোনো জাগরণ থামানো যায় না।
ওসমান হাদি ছিলেন সেই ধারারই একজন উত্তরসূরি। ইনকিলাব মঞ্চের প্রতিষ্ঠাতা এই তরুণ বিপ্লবী ছিলেন সাম্রাজ্যবাদ, ভারতীয় আধিপত্যবাদ এবং রাষ্ট্রযন্ত্রে প্রোথিত দুর্নীতির বিরুদ্ধে আপসহীন এক কণ্ঠস্বর। তাঁর লেখনী, বক্তৃতা, সাংস্কৃতিক চর্চা ও রাজপথের আন্দোলন একত্রে একটি মৌলিক প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছিল—এই দেশ কি চিরকালই লুটপাট, চাঁদাবাজি, মাস্তানি ও পরাধীন রাজনীতির কাছে বন্দি থাকবে?
এই প্রশ্ন তোলাই ছিল তাঁর অপরাধ।
গত শুক্রবার বেলা আড়াইটার দিকে গুলিবিদ্ধ হয়ে তিনি মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই শুরু করেন। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, এভারকেয়ার হাসপাতাল এবং সর্বশেষ সিঙ্গাপুর—সব চিকিৎসা প্রচেষ্টাকে ব্যর্থ করে দিয়ে তিনি শাহাদতবরণ করেন। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়—গুলির আঘাতে কোনো আদর্শ নিস্তব্ধ হয় না, কোনো বিপ্লব থেমে যায় না।
বাংলাদেশের ইতিহাসেই তার স্পষ্ট দৃষ্টান্ত রয়েছে। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান—যিনি ইসলামি জাতীয়তাবাদকে রাষ্ট্রচিন্তার কেন্দ্রে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন—ভারতীয় আধিপত্যবাদ ও অভ্যন্তরীণ দুর্নীতির বিরুদ্ধে ছিলেন দৃঢ় ও আপসহীন। একদলীয় শাসনের মাধ্যমে যে গণতন্ত্রকে হত্যা করা হয়েছিল, তিনি বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সেই গণতন্ত্রকে পুনর্জীবিত করেছিলেন। ভোটাধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও নাগরিক অধিকারের প্রশ্নে তাঁর অবস্থান ছিল সুস্পষ্ট।
এই কারণেই তাঁকে হত্যা করা হয়েছিল। কিন্তু তাঁর শাহাদত কি তাঁর দর্শনকে শেষ করতে পেরেছিল? পারেনি। বরং তা বাংলাদেশের রাজনীতিতে স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নকে আরও গভীরভাবে প্রোথিত করেছে।
ওসমান হাদি এই ইতিহাস জানতেন। শহীদ জিয়াউর রহমানের রাজনীতি ও দর্শন থেকে তিনি গভীরভাবে অনুপ্রাণিত ছিলেন। তিনিও চেয়েছিলেন এমন একটি বাংলাদেশ—যে বাংলাদেশ সাম্রাজ্যবাদের কাছে মাথা নত করবে না, যে বাংলাদেশ হবে দুর্নীতিমুক্ত, যেখানে চাঁদাবাজি, খুন ও জুলুমের রাজনীতি থাকবে না। তাঁর কাছে ‘নয়া বন্দোবস্ত’ কোনো স্লোগান ছিল না; ছিল রাষ্ট্রকাঠামো পুনর্গঠনের একটি সুস্পষ্ট আহ্বান।
মাত্র ৩২ বছরের জীবনে তিনি প্রমাণ করে গেছেন—রাজনীতি মানেই ক্ষমতা নয়, রাজনীতি মানে আদর্শ। কোটি টাকার নির্বাচনি সংস্কৃতির বিপরীতে তিনি শূন্য হাতে মানুষের কাছে গেছেন। রিকশায় চড়ে, পায়ে হেঁটে, ফজরের আজানের সঙ্গে রাজপথে নেমে পড়া—এই ছিল তাঁর রাজনীতির ভাষা। মানুষের দেওয়া প্রতিটি টাকার হিসাব তিনি জনসমক্ষে তুলে ধরেছেন।
টিভি টকশো থেকে রাজপথের মিছিল—সবখানেই তাঁর কণ্ঠস্বর মানুষকে প্রশ্ন করতে শিখিয়েছে, সাহস জুগিয়েছে। ঘরে ১০ মাসের শিশুসন্তান রেখে তিনি অলিগলি চষে বেড়িয়েছেন, ছড়িয়ে দিয়েছেন নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন।
তিনি শুধু বক্তা ছিলেন না, ছিলেন নির্মাতা। ইনকিলাব কালচারাল সেন্টার গড়ে তুলে নিয়মিত রাজনৈতিক পাঠ, রাষ্ট্রচিন্তা ও একাডেমিক বিশ্লেষণের চর্চা চালু করেছিলেন। সংস্কৃতির ভেতর দিয়ে জুলাইয়ের চেতনা ধারণ করাই ছিল তাঁর লক্ষ্য।
২৪ জুলাই বিপ্লবের পর অনেকেই যখন লোভ, বিত্ত ও ষড়যন্ত্রের ফাঁদে জড়িয়ে পড়েছে, তখন ওসমান হাদি বুক টান করে দেশের পক্ষে দাঁড়িয়ে ছিলেন। কোনো প্রলোভন তাঁকে স্পর্শ করতে পারেনি। তিনি বলতেন—কাউকে না কাউকে দাঁড়াতেই হবে; সেই একজন আমি হই, প্রয়োজনে জীবন দিয়েও।
শাহাদতের তামান্না তিনি লুকাননি। গুলিবিদ্ধ হওয়ার দুদিন আগেও তিনি বলেছিলেন—“আমি চাই, মিছিলের সামনে দাঁড়িয়ে থাকি, আর একটি বুলেট আমাকে শহীদ করে দিক।” আল্লাহ তাঁর সেই তামান্না কবুল করেছেন।
১২ ডিসেম্বর জুমার নামাজ শেষে বাসায় ফেরার পথে ফ্যাসিবাদী হাসিনার দোসর ছাত্রলীগ ক্যাডার ফয়সাল করিম মাসুদের গুলিতে তিনি আহত হন। এক জুমায় গুলিবিদ্ধ হয়ে আরেক জুমা শুরু হতেই তিনি পৃথিবী ছাড়েন—এক অনন্য শাহাদতের সাক্ষ্য রেখে।
আজ সারা বাংলাদেশ কাঁদছে ওসমান হাদির বিদায়ে। দল-মত নির্বিশেষে মানুষের যে ভালোবাসা ও প্রতিবাদ—তা নজিরবিহীন। অন্তর্বর্তী সরকার তাঁর চিকিৎসা ও রাষ্ট্রীয় মর্যাদার দায়িত্ব নিয়েছে। তাঁকে জাতীয় বীর ঘোষণা করা হয়েছে, রাষ্ট্রীয় শোক পালিত হয়েছে, তাঁর পরিবারকে রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে নেওয়ার ঘোষণা এসেছে।
আজ ওসমান হাদি নেই। কিন্তু ইতিহাস আবার প্রমাণ করছে—একজন বিপ্লবী মারা গেলে বিপ্লব মরে না। বরং তার রক্ত থেকে জন্ম নেয় হাজারো নতুন বিপ্লবী।
হাদিরা মারা যায়,
কিন্তু তাদের বিপ্লব মরে না।
ওসমান হাদির শাহাদত জিন্দাবাদ।
ইনকিলাব জিন্দাবাদ।
লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রাম
ঢাকা
,
সোমবার, ২৯ জুন ২০২৬, ১৫ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম ::
অনলাইনে রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামূলক করদাতাদের
আফগানিস্তানে পাকিস্তানের বিমান হামলায় নিহত বেড়ে ৩৫
মুসলিম পর্যটকদের সুবিধায় জাপানের শপিংমলে নামাজ কক্ষ
ট্রাম্পকে ‘হারু’ বললেন বাইডেন, আখ্যা দিলেন—অযোগ্য, দুর্নীতিগ্রস্ত ও ফালতু বলে
ভেনেজুয়েলায় আড়াই লাখ ডলার দিলেন নেইমার
ব্রাজিলের বিপক্ষে খেলা হচ্ছে না ‘জাপানি মেসির’
আমার জীবন বাংলাদেশের মানুষের জন্য উৎসর্গ করেছি: শেখ হাসিনা
অতীতের দিকে না তাকিয়ে সামনের দিকে এগোতে চাই: সংসদে প্রধানমন্ত্রী
জাপানের কাছে হেরে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নেবে ব্রাজিল: জার্মান গবেষক
ভূমিকম্পে বিধ্বস্ত ভেনেজুয়েলাকে আড়াই লাখ ডলার দিলেন নেইমার
ওসমান হাদি : শহীদের রক্তে থামে না বিপ্লব
-
ডেস্ক রিপোর্ট - আপডেট সময় ১১:৩৯:২৬ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২১ ডিসেম্বর ২০২৫
- ১৮০ বার পড়া হয়েছে
ট্যাগস
জনপ্রিয় সংবাদ


























