ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির রাষ্ট্রীয় জানাজা নিয়ে চলছে তুমুল আলোচনা। জানাজার নামাজকে পুরো বিশ্বের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করেছে দেশটি। এরমধ্যেই বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদলকে ভিন্ন ভিন্ন কুরআনের আয়াতের মাধ্যমে স্বাগত জানায় ইরান। বিষয়টিকে ‘কুরআনিক ডিপ্লোম্যাসি’ বা কুরআনিক কূটনীতি বলে আখ্যায়িত করা হচ্ছে।
সবচেয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে সৌদি আরব ও তুরস্ক প্রতিনিধিদের সামনে তিলাওয়াত করা আয়াত নিয়ে। ইরানি গণমাধ্যম ও সামাজিকমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে বিষয়টির ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশ্লেষকদের অনেকে মনে করছেন, প্রতিটি দেশের জন্য নির্বাচিত আয়াতের মাধ্যমে তেহরান প্রতীকী কূটনৈতিক বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করেছে। তবে এ বিষয়ে ইরান সরকার আনুষ্ঠানিক কোনো ব্যাখ্যা দেয়নি।
সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে সৌদি আরবের প্রতিনিধিদলের আগমন। দুই দেশের দীর্ঘদিনের বৈরিতার ইতিহাসের কারণে অনেকেই সৌদি প্রতিনিধিদের উপস্থিতিকে অপ্রত্যাশিত হিসেবে দেখছেন। ইরানও বিষয়টিকে অসম্ভব মনে করেই আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণও জানায়নি সৌদিকে। তবে সবাইকে হতবাক করে দিয়ে সৌদি উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়ালিদ আল-খুরাইজির নেতৃত্বে প্রতিনিধিদলটি খামেনির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে গেলে সূরা আলে ইমরানের ১৩ নম্বর আয়াত তিলাওয়াত করা হয়।
ওই আয়াতে বলা হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই তোমাদের জন্য নিদর্শন রয়েছে দুটি দলের মধ্যে, যারা পরস্পর মুখোমুখি হয়েছিল। একটি দল আল্লাহর পথে যুদ্ধ করছিল এবং অপর দল ছিল কাফির। বাহ্যিক দৃষ্টিতে তারা তাদেরকে নিজেদের দ্বিগুণ দেখছিল। আল্লাহ যাকে ইচ্ছা তাঁর সাহায্যের মাধ্যমে শক্তিশালী করেন। নিশ্চয়ই এতে চক্ষুষ্মানদের জন্য শিক্ষা রয়েছে।’ (সূরা আলে ইমরান: ১৩)
এ আয়াতে বদর যুদ্ধের প্রসঙ্গ তুলে ধরা হয়েছে। ফলে আয়াতটি নিয়ে বিভিন্ন মহলে নানা ধরনের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ চলছে।
তুরস্কের প্রতিনিধিদলের সামনে তিলাওয়াত করা হয় সূরা নিসার ৯৫ নম্বর আয়াত। সেখানে আল্লাহর পথে জান-মাল দিয়ে সংগ্রামকারীদের মর্যাদা ঘরে বসে থাকা মুমিনদের চেয়ে সম্মানের বলে উল্লেখ করা হয়েছে এবং মুজাহিদদের জন্য অধিক প্রতিদানের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
আফগানিস্তান ও কাতারের প্রতিনিধিদলের জন্য পাঠ করা হয় সূরা আল-ফাতহর প্রথম তিন আয়াত। এসব আয়াতে আল্লাহর পক্ষ থেকে ‘সুস্পষ্ট বিজয়’, ক্ষমা, পূর্ণ অনুগ্রহ এবং শক্তিশালী সাহায্যের সুসংবাদ দেওয়া হয়েছে।
ফিলিস্তিনি প্রতিনিধিদলের সামনে তিলাওয়াত করা হয় সূরা বনি ইসরাঈলের (আল-ইসরা) প্রথম আয়াত। এতে মহান আল্লাহ তাঁর বান্দাকে মসজিদুল হারাম থেকে বরকতময় মসজিদুল আকসায় রজনী ভ্রমণের ঘটনা বর্ণনা করেছেন। জেরুজালেম ও আল-আকসাকে কেন্দ্র করে চলমান সংঘাতের প্রেক্ষাপটে আয়াতটি বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে বলে পর্যবেক্ষকদের মত।
পাকিস্তানের প্রতিনিধিদলের জন্য সূরা বনি ইসরাঈলের ৮০ নম্বর আয়াত তিলাওয়াত করা হয়। আয়াতে মহান আল্লাহর কাছে সত্যের সঙ্গে প্রবেশ, সত্যের সঙ্গে প্রস্থান এবং তাঁর পক্ষ থেকে সাহায্যকারী শক্তি প্রার্থনার দোয়া রয়েছে।
ভারতের প্রতিনিধিদলের সামনে পাঠ করা হয় সূরা আলে ইমরানের ১৭৩ নম্বর আয়াত। সেখানে বলা হয়েছে, শত্রুপক্ষের বিশাল বাহিনীর সংবাদে মুমিনদের ভয় না বেড়ে বরং ঈমান আরও দৃঢ় হয় এবং তারা ঘোষণা করে, ‘আমাদের জন্য আল্লাহই যথেষ্ট, তিনি কতই না উত্তম কর্মবিধায়ক।’
বাংলাদেশের প্রতিনিধিদলের জন্য তিলাওয়াত করা হয় সূরা আলে ইমরানের ১৬৯-১৭০ নম্বর আয়াত। এতে আল্লাহর পথে নিহত ব্যক্তিদের মৃত নয়, বরং তাদের প্রতিপালকের কাছে জীবিত এবং রিজিকপ্রাপ্ত বলে ঘোষণা করা হয়েছে। পাশাপাশি তাদের জন্য কোনো ভয় বা দুশ্চিন্তা নেই বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন ও কুয়েত থেকে কোনো উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি জানাজায় অংশ নেননি।
খামেনির জানাজা উপলক্ষে ইরানে কয়েক দিনব্যাপী রাষ্ট্রীয় শোকানুষ্ঠান চলছে। বিভিন্ন শহরে শোকানুষ্ঠান শেষে আগামী ৯ জুলাই তাঁর নিজ শহর মাশহাদে দাফনের কর্মসূচি রয়েছে বলে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে।

ডেস্ক রিপোর্ট 



















