মাত্র দুই বছর আগে বিয়ে করেছিলেন। ১৬ মাস বয়সী ছেলের মুখে প্রথম ‘বাবা’ ডাক শোনার আনন্দও ঠিকমতো উপভোগ করতে পারেননি। জীবিকার তাগিদে সৌদি আরবে গিয়ে দিন-রাত পরিশ্রম করে পরিবারের ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে সেই স্বপ্ন আজ থেমে গেছে ফুসফুসের ক্যানসারের কাছে। এখন তার একটাই আকুতি-‘আমি বাঁচতে চাই।’
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুর উপজেলার ছলিমাবাদ ইউনিয়নের কমলপুর গ্রামের বাসিন্দা ২৫ বছর বয়সী সৌদি প্রবাসী মো. হাবিব উল্লাহ জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে দিন কাটাচ্ছেন। কমলপুর গ্রামের সাব মিয়ার ছেলে হাবিব।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, ২০১৭ সালে জীবিকার সন্ধানে সৌদি আরবে পাড়ি জমান হাবিব। প্রবাসে কঠোর পরিশ্রম করে পরিবারের স্বচ্ছলতা ফেরানোর চেষ্টা করেন। ২০২৩ সালে বিয়ে করেন। এক বছর পর তাদের ঘর আলো করে জন্ম নেয় ছেলে আমির হামজা। পরিবারকে ঘিরে ছিল অসংখ্য স্বপ্ন।
কিন্তু ২০২৫ সালে ছুটিতে দেশে এসে অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি। প্রথমে সাধারণ অসুস্থতা মনে হলেও বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর চিকিৎসকরা জানান, তাঁর ফুসফুসে ক্যান্সার ধরা পড়েছে। এক মুহূর্তেই বদলে যায় পুরো পরিবারের জীবন।
‘আপনার ছেলে ডিবির হাতে’—এক কলেই দুই লাখ টাকা খোয়ালেন তিন শিক্ষক
চিকিৎসকদের পরামর্শে শুরু হয় ব্যয়বহুল চিকিৎসা। ছেলেকে বাঁচানোর আশায় পরিবারের একমাত্র সম্বল, বসতবাড়ি ও ১৭ শতক জমি বিক্রি করে দেন বাবা-মা। গত প্রায় ৯ মাসে চিকিৎসার পেছনে ব্যয় হয়েছে প্রায় ১৫ লাখ টাকা। ইতোমধ্যে হাবিব ৪২টি কেমোথেরাপি নিয়েছেন। কোনো কোনো কেমোথেরাপির খরচ হয়েছে প্রায় দেড় লাখ টাকা।
চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, ভারতের মাদ্রাজে উন্নত চিকিৎসা করাতে পারলে তাঁর সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু সেই চিকিৎসার বিপুল ব্যয় বহন করার মতো সামর্থ্য এখন আর পরিবারের নেই। চিকিৎসার টাকা জোগাতে গিয়ে তারা আজ নিঃস্ব।
হাবিব উল্লাহ কালবেলাকে বলেন, ‘আমি কখনো ভাবিনি, এত অল্প বয়সে এমন রোগে আক্রান্ত হব। বিদেশে গিয়েছিলাম পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে। আজ নিজের জীবন বাঁচানোর জন্য মানুষের কাছে সাহায্য চাইতে হচ্ছে। আমার ছোট্ট ছেলে এখনও জানে না, তার বাবা মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে। আমি শুধু বাঁচতে চাই। সবাই যদি একটু করে সাহায্য করেন, তাহলে হয়তো আবার ছেলেকে বুকে নিয়ে বাঁচতে পারব।’
বাবা সাব মিয়া কালবেলাকে বলেন, ‘ছেলের চিকিৎসা করাতে আমাদের বসতবাড়িও বিক্রি করে দিয়েছি। এখন আর কিছুই নেই। চিকিৎসকরা আশা দেখিয়েছেন, উন্নত চিকিৎসা হলে ছেলে ভালো হতে পারে। কিন্তু সেই চিকিৎসার টাকা আমাদের পক্ষে জোগাড় করা অসম্ভব। একজন অসহায় বাবা হিসেবে দেশের বিত্তবান ও মানবিক মানুষের কাছে আমার আকুল আবেদন, আপনারা আমার ছেলেটাকে বাঁচাতে এগিয়ে আসুন।’
মা আনোয়ারা বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘মায়ের কাছে সন্তানের কষ্টের চেয়ে বড় কোনো কষ্ট নেই। ছেলেকে প্রতিদিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করতে দেখছি। চিকিৎসার জন্য সব বিক্রি করেছি। এখন আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। আল্লাহর ওয়াস্তে সবাই আমার ছেলেটার জন্য দোয়া করুন, আর যার যতটুকু সামর্থ্য আছে সহযোগিতা করুন।’
হাবিবের স্ত্রী সারাক্ষণ স্বামীর সুস্থতার অপেক্ষায় থাকেন। আর ১৬ মাসের ছোট্ট ছেলে এখনও বুঝতে শেখেনি কেন তার বাবা আগের মতো তাকে কোলে নিতে পারেন না। পরিবারের প্রতিটি সদস্য আজ একটাই প্রার্থনা করছেন—হাবিব যেন আবার সুস্থ হয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেন।
পরিবারের দাবি, দ্রুত উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করা না গেলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে। তাই দেশ-বিদেশে অবস্থানরত মানবিক, বিত্তবান ও প্রবাসী বাংলাদেশির কাছে তারা দোয়া ও আর্থিক সহযোগিতার আবেদন জানিয়েছেন।
একজন তরুণ প্রবাসীর জীবন, একটি শিশুর বাবাকে ফিরে পাওয়ার স্বপ্ন এবং একটি পরিবারের শেষ আশাটি এখন সমাজের মানবিক মানুষের সহানুভূতি ও সহযোগিতার ওপর নির্ভর করছে।

ডেস্ক রিপোর্ট 


















