দেশের ক্ষমতা দখলকে কেন্দ্র করে ২০২৩ সালের এপ্রিলে ভয়াবহ গৃহযুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে উত্তর-পূর্ব আফ্রিকার দেশ সুদানে। সেনাবাহিনী ও আধা-সামরিক বাহিনী র‍্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেস (আরএসএফ)-এর মধ্যে চলমান সংঘাতে গত দুই বছরে প্রাণ হারিয়েছেন দেড় লাখের বেশি মানুষ।
জাতিসংঘ বলছে, এটি বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে ভয়াবহ মানবিক সংকট—যেখানে প্রায় এক কোটি ২০ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত, এবং দুর্ভিক্ষে বিপন্ন গোটা দেশ।


🔥 গৃহযুদ্ধের সূচনা

সুদানের রাজনৈতিক অস্থিরতা শুরু হয় ২০১৯ সালে, যখন তিন দশকের শাসক ওমর আল-বশিরকে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়।
বিক্ষোভকারীদের গণতান্ত্রিক সরকারের দাবিতে সেনাবাহিনী ও বেসামরিক প্রশাসনের যৌথ সরকার গঠিত হলেও, ২০২১ সালে আরেকটি অভ্যুত্থান সে ব্যবস্থাকে ভেঙে দেয়।

এই অভ্যুত্থানের পেছনে ছিলেন দুই সেনা নেতা—

  • জেনারেল আবদেল ফাত্তাহ আল-বুরহান (সেনাবাহিনীর প্রধান)
  • জেনারেল মোহামেদ হামদান দাগালো (হেমেডটি), আরএসএফের কমান্ডার

একসময় ঘনিষ্ঠ এই দুই নেতার মধ্যে ক্ষমতা, প্রভাব এবং আরএসএফকে সেনাবাহিনীতে একীভূত করার প্রশ্নে তীব্র দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়।
২০২৩ সালের ১৫ এপ্রিল, সেই দ্বন্দ্ব রক্তক্ষয়ী সংঘাতে রূপ নেয়।


⚔️ আরএসএফ: কুখ্যাত বাহিনীর উত্থান

আরএসএফ গঠিত হয় ২০১৩ সালে, মূলত দারফুর অঞ্চলের জানজাওয়িদ মিলিশিয়া থেকে।
ওমর আল-বশিরের আমলে বিদ্রোহ দমন করতে গিয়ে এই বাহিনী বহু মানবাধিকার লঙ্ঘন ও গণহত্যার অভিযোগে অভিযুক্ত হয়।
পরবর্তীতে দাগালো বা হেমেডটির নেতৃত্বে এই বাহিনী সুদানের সোনা খনি, সীমান্ত বাণিজ্য ও বিদেশি যুদ্ধক্ষেত্রে (যেমন ইয়েমেন ও লিবিয়া) অংশ নিয়ে বিপুল শক্তি অর্জন করে।

২০২৫ সালের মধ্যে আরএসএফ দেশের পশ্চিমাঞ্চলের প্রায় পুরো দারফুর ও পার্শ্ববর্তী কোর্দোফান অঞ্চল দখল করে নিয়েছে এবং এখন তারা “বিকল্প সরকার” গঠনের দাবি করছে—যা সুদানকে দ্বিতীয়বারের মতো বিভক্ত হওয়ার আশঙ্কায় ফেলেছে।


🪖 সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণ ও লড়াই

অন্যদিকে, সেনাবাহিনী নিয়ন্ত্রণে রেখেছে উত্তর ও পূর্বাঞ্চল, এবং মিশরের সমর্থন পাচ্ছে বলে ধারণা করা হয়।
পোর্ট সুদান বর্তমানে সেনাপ্রধান বুরহানের ঘাঁটি ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃত সরকারের কেন্দ্র।
তবে শহরটি বারবার আরএসএফের ড্রোন হামলায় অরক্ষিত হয়ে পড়ছে।
অক্টোবরের শেষদিকে এল-ফাশের শহর আরএসএফ দখলে গেলে সেটি সেনাবাহিনীর বড় পরাজয় হিসেবে দেখা হয়।


☠️ গণহত্যা ও মানবিক বিপর্যয়

দারফুরের আরব নয় এমন জনগোষ্ঠী, বিশেষত মাসালিট সম্প্রদায়ের ওপর আরএসএফ ও তাদের মিত্র মিলিশিয়াদের গণহত্যার অভিযোগ উঠেছে।
জাতিসংঘ ও মানবাধিকার সংস্থাগুলো জানিয়েছে, আরএসএফ যোদ্ধারা নারী ও শিশুর ওপর যৌন নির্যাতন, ধর্ষণ ও হত্যা চালিয়েছে—যা আন্তর্জাতিক আইনে যুদ্ধাপরাধ হিসেবে বিবেচিত।
অনুমান করা হচ্ছে, এল-ফাশের অঞ্চলে থাকা আড়াই লাখ মানুষের জীবন এখন মারাত্মক ঝুঁকিতে।


🌍 সুদানের ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব

প্রায় ১৯ লাখ বর্গকিলোমিটার আয়তনের সুদান আফ্রিকার বৃহত্তম দেশগুলোর একটি, যার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত নীল নদ ও লোহিত সাগর সংলগ্ন বন্দর দেশটিকে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।
কিন্তু স্বর্ণসমৃদ্ধ এই দেশ এখন দারিদ্র্য ও ধ্বংসের কবলে—রাষ্ট্রীয় আয় কমেছে ৮০ শতাংশ, এবং মানুষের গড় আয় বছরে মাত্র ৭৫০ ডলারেরও কম।


👉 সারসংক্ষেপে, সুদানে চলছে এক ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়—যেখানে ক্ষমতার লড়াই, জাতিগত বিদ্বেষ ও আন্তর্জাতিক স্বার্থের জটিল খেলায় পিষ্ট হচ্ছে লক্ষ লক্ষ নিরীহ মানুষ।

[সূত্র: বিবিসি বাংলা]