দেশের ব্যাংকিং খাতে অনিয়ম, ঋণ কেলেঙ্কারি কিংবা আর্থিক সংকটের ঘটনা নতুন নয়। বিভিন্ন সময়ে একাধিক ব্যাংককে ঘিরে বিতর্ক সৃষ্টি হলেও সেসব বিষয়ে জামায়াতে ইসলামীর তেমন দৃশ্যমান প্রতিক্রিয়া দেখা যায় না। তবে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশকে ঘিরে দলটির ধারাবাহিক সক্রিয়তা ও সাম্প্রতিক প্রতিবাদ নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ইসলামী ব্যাংককে জামায়াতে ইসলামী কেবল একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখে না; বরং এটি তাদের আদর্শিক, সাংগঠনিক ও ঐতিহাসিক পরিচয়ের সঙ্গে জড়িত একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিবেচিত হয়ে থাকে।
জামায়াত নেতাদের দাবি, ১৯৮৩ সালে প্রতিষ্ঠিত ইসলামী ব্যাংকের বিকাশে তাদের অনুসারী ও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। দলটির অভিযোগ, ২০১৭ সালে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের মাধ্যমে ব্যাংকটির নিয়ন্ত্রণ তাদের ঘনিষ্ঠ মহল থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়। সেই সময় থেকেই ব্যাংকটিকে ‘জবরদখলকৃত প্রতিষ্ঠান’ হিসেবে বর্ণনা করে আসছে দলটি।
এ কারণে ইসলামী ব্যাংকের মালিকানা ও পরিচালনা পর্ষদে যেকোনো পরিবর্তনকে জামায়াত শুধু প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত হিসেবে নয়, বরং একটি রাজনৈতিক ও আদর্শিক প্রশ্ন হিসেবে দেখে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ব্যাংকটির ওপর নিয়ন্ত্রণ হারানোর পর থেকেই অনিয়ম, ঋণ জালিয়াতি ও অর্থ পাচারের ঘটনা বেড়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাংকটির চেয়ারম্যান পদে নতুন নিয়োগকে কেন্দ্র করেও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। জামায়াতের নেতারা অভিযোগ করেছেন, নতুন চেয়ারম্যান অতীতের ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক বলয়ের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি। তাদের আশঙ্কা, এই নিয়োগের মাধ্যমে আবারও ব্যাংকটিকে প্রভাবশালী গোষ্ঠীর স্বার্থে ব্যবহার করা হতে পারে এবং আমানতকারীদের অর্থ ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
এদিকে ব্যাংকের নেতৃত্ব পরিবর্তনের প্রতিবাদে কিছু গ্রাহক ও আমানতকারী প্রধান কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেন। ওই কর্মসূচিতে পুলিশি হস্তক্ষেপ এবং কয়েকজনের আহত হওয়ার ঘটনায় জামায়াতে ইসলামী প্রকাশ্যে ক্ষোভ জানায়। দলটির নেতারা দাবি করেন, গ্রাহকদের উদ্বেগ যৌক্তিক এবং তাদের আমানতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
পর্যবেক্ষকদের মতে, ইসলামী ব্যাংক দেশের বৃহত্তম শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক হওয়ায় এর সঙ্গে বিপুলসংখ্যক গ্রাহক, ব্যবসায়ী ও ধর্মীয় মূল্যবোধসম্পন্ন মানুষের সম্পর্ক রয়েছে। ফলে ব্যাংকটিকে ঘিরে যেকোনো সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করার সক্ষমতা রাখে।
তবে সমালোচকদের প্রশ্ন, দেশের অন্যান্য ব্যাংকে সংকট বা অনিয়মের ঘটনায় যেখানে সমান মাত্রার রাজনৈতিক তৎপরতা দেখা যায় না, সেখানে ইসলামী ব্যাংক ইস্যুতে জামায়াতের ব্যতিক্রমী সক্রিয়তা কি শুধুই গ্রাহক স্বার্থের কারণে, নাকি এর পেছনে ঐতিহাসিক মালিকানা, আদর্শিক প্রভাব এবং অর্থনৈতিক স্বার্থও কাজ করছে?
এই প্রশ্নের উত্তর নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গন ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে বিতর্ক চলমান থাকলেও একটি বিষয় স্পষ্ট—ইসলামী ব্যাংককে জামায়াত শুধু একটি ব্যাংক নয়, বরং নিজেদের ইতিহাস, প্রভাব এবং সমর্থকভিত্তির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখে।

ডেস্ক রিপোর্ট 
























