দৈনিক একশ-দুইশ টাকা চাঁদা নয়, মাসে ১০০ বা বছরে এক হাজার টাকা ফি দিয়ে রাজধানীর ফুটপাতে ব্যবসা করতে পারবেন হকাররা। যারা সিটি করপোরেশনে নিবন্ধন করবেন, কেবল তারাই নির্দিষ্ট স্থানে বসতে পারবেন। হকার ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ফেরাতে সম্প্রতি হকার নীতিমালা অনুমোদন করেছে স্থানীয় সরকার বিভাগ। সেই নীতিমালার ভিত্তিতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছে রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশন। নিবন্ধনের মাধ্যমে হকারদের মাঝে স্মার্টকার্ড বিতরণ করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে তিনশ হকারকে কার্ড দেওয়া হয়েছে। এই হকাররা সিটি করপোরেশনের নির্ধারিত স্থানে নির্দিষ্ট সময় ব্যবসা করতে পারবেন। মাসিক বা বার্ষিক হিসাবে তাদের দেওয়া টাকা নির্ধারিত স্থানের উন্নয়ন, পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় ব্যয় করবে কর্তৃপক্ষ।
সংশ্লিষ্ট থানার মাধ্যমে তালিকা প্রণয়ন ও হকারদের জন্য স্থান নির্ধারণের কাজ চলছে। ইতোমধ্যে গুলিস্তান, নিউমার্কেট ও মিরপুর ১০ নম্বর এলাকার কোথায় কোথায় তারা বসবেন, সে কাজ শেষ হয়েছে। সিটি করপোরেশন থেকে হকার নিবন্ধন ফরম বিতরণ করা হয়েছে। এতে স্থায়ী ঠিকানা, শিক্ষাগত যোগ্যতাসহ নানা তথ্য চাওয়া হয়। ফরমের তথ্য যাচাই করে হকারের তালিকা চূড়ান্ত করছে সিটি করপোরেশন ও ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ। কোন কোন স্থানে হকারদের বসার সুযোগ দেওয়া যায়, তাও যৌথভাবে নির্ধারণ করা হচ্ছে। দুই সিটি করপোরেশন এলাকাতেই এ কাজ চলছে। ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট-এর অনুসন্ধানে জানা যায়, রাজধানীর প্রায় পাঁচ লাখ হকারের কাছ থেকে বছরে ১ হাজার ৮২৫ কোটি টাকা চাঁদা তোলা হয়। প্রতি হকারকে গড়ে ১৯২ টাকা দৈনিক চাঁদা দিতে হয়। পুলিশ, রাজনৈতিক নেতাকর্মীরা এই চাঁদার ভাগ পান।
এমন স্থান হকারদের বসার জন্য নির্ধারণ করা হবে, যেখানে তাদের বসার পরও পথচারীদের চলাচলের জন্য ন্যূনতম ৫ ফুট জায়গা থাকবে। যানজট যাতে সৃষ্টি না হয়, সে জন্য মেট্রোস্টেশন, বাস টার্মিনাল বা গুরুত্বপূর্ণ মোড় থেকে অন্তত ৩০ ফুট দূরে হকাররা বসার সুযোগ পাবেন। সাপ্তাহিক ও সরকারি ছুটির দিনে সকাল ৭টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত কিছু স্থানে হলিডে মার্কেট বসবে। বাণিজ্যিক বা জনবহুল স্থানগুলোতে অফিস সময়ের পর সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত হকাররা বসতে পারবেন। সেই জায়গাগুলোও নির্ধারণ করে দেওয়া হবে। তবে খেলার মাঠ, স্কুল মাঠ, গণপরিসর, উপাসনালয়ের মাঠ, কবরস্থানে কোনো হকার বসতে পারবেন না। নির্ধারিত স্থানে কোনো স্থায়ী অবকাঠামো তৈরি করা যাবে না। রোদ-বৃষ্টি থেকে রক্ষার জন্য ছাতা বা অস্থায়ী আচ্ছাদন ব্যবহার করা যাবে। নিয়মের ব্যত্যয় ঘটলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নিবন্ধন বাতিল করতে পারবে।
নীতিমালায় বলা হয়েছে, হকার হতে হলে ন্যূনতম ১৮ বছর বয়সী হতে হবে। তাদের যে স্মার্টকার্ড বা লাইসেন্স দেওয়া হবে, সেটিতে কিউআর কোড থাকবে। হকার কোথায় বসবেন, ব্যবসার ধরন, স্থান ও পরিধি, ব্যবসার সময়সহ তাঁর যাবতীয় তথ্য সংরক্ষিত থাকবে। নিয়ম লঙ্ঘন করলে কর্তৃপক্ষ কোনো কারণ ব্যাখ্যা করা ছাড়াই নিবন্ধন ও লাইসেন্স বাতিল করতে পারবে। একটি পরিবার থেকে একজনের বেশি হকার হিসেবে নিবন্ধিত হতে পারবেন না। ব্যবসা করার সময় পরিচয়পত্র বা স্মার্টকার্ড সঙ্গে রাখতে হবে। যার জন্য যে জায়গা নির্ধারিত থাকবে, তিনি ছাড়া অন্য কেউ সেখানে ব্যবসা করতে পারবেন না। নারী, প্রতিবন্ধী ও তৃতীয় লিঙ্গের জন্য ৩০ শতাংশ কোটা সংরক্ষিত থাকবে। হকার ব্যবস্থাপনার জন্য কেন্দ্রীয় ও আঞ্চলিক কমিটি থাকবে। কেন্দ্রীয় কমিটিতে সিটি করপোরেশন, স্থানীয় সরকার বিভাগ, ট্রাফিক, রাজউকের প্রতিনিধিরা থাকবেন। আঞ্চলিক কমিটিতে সিটি করপোরেশন, রাজউক ও ট্রাফিক বিভাগের প্রতিনিধি থাকবেন।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ হকার্স ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক সেকেন্দার হায়াৎ বলেন, যে পদ্ধতিতে সিটি করপোরেশন হকার ব্যবস্থাপনার উদ্যোগ নিয়েছে, তা কাজে আসবে না। এভাবে তিন ভাগের এক ভাগ হকার বসার সুযোগ পেতে পারেন। বাকিরা উচ্ছেদের শিকার হবেন। তাদের তালিকাতেও অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে না। এভাবে চাঁদাবাজিও বন্ধ হবে না, বরং হকারদের সঙ্গে পথচারীদের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেওয়া হচ্ছে। ভারত, থাইল্যান্ড, ব্রাজিলসহ বিভিন্ন দেশে হকার আইন আছে। আমরা চাই, এ ব্যাপারে আইন হোক। হকার ব্যবস্থাপনা কার্যক্রমে সম্পৃক্ত ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ সিরাজুল ইসলাম বলেন, আপাতত ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় করে তালিকা প্রণয়নের কাজ চলছে। পাশাপাশি কোথায় কোথায় বসার ব্যবস্থা করা যায়, সেটি নির্ধারণ করা হচ্ছে। কিন্তু এই পদ্ধতিতে হয়তো অর্ধেক হকারের বসার ব্যবস্থা করা সম্ভব হবে। নিবন্ধন ফি মাসে ১০০ বা বছরে এক হাজার টাকা নির্ধারণের চিন্তা আছে।

ডেস্ক রিপোর্ট 

























