এবার ডারউইনের মারারা স্টেডিয়ামের সবুজাভ উইকেটের সুবিধা শুরু থেকেই দারুণভাবে কাজে লাগাচ্ছে বাংলাদেশের পেস আক্রমণ। নতুন বল হাতে হাসান মাহমুদ ও তাসকিন আহমেদের নিয়ন্ত্রিত বোলিংয়ের পর আক্রমণে এসে ইবাদত হোসেনও অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিংয়ে চাপ তৈরি করেছেন। ফলে মধ্যাহ্নভোজের বিরতির আগেই ৪ উইকেট হারিয়ে চাপে পড়ে গেছে স্বাগতিকরা। অস্ট্রেলিয়ার ইনিংসের শুরুটা অবশ্য খুব একটা খারাপ ছিল না। ট্রাভিস হেড ও ওয়েদারাল্ড শুরুতে বাংলাদেশের বোলারদের সামলানোর চেষ্টা করছিলেন। তবে উইকেটে ঘাসের উপস্থিতি এবং বলের বাড়তি বাউন্স ও সুইং কাজে লাগিয়ে ধীরে ধীরে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিতে শুরু করে বাংলাদেশের পেসাররা।
খেলা শুরুর আগে ফক্স ক্রিকেটকে অস্ট্রেলিয়ার ওপেনার ট্রাভিস হেডও উইকেটটিকে বেশ শক্ত এবং ঘাসযুক্ত বলে উল্লেখ করেছিলেন। ম্যাচের শুরুতেই তার কথার সত্যতা পাওয়া যায়। হাসান মাহমুদের বোলিংয়ে বল কখনো ভেতরে ঢুকেছে, কখনো বাইরে গিয়ে ব্যাটারদের বিভ্রান্ত করেছে। তার তৃতীয় ওভারেই হেড মিসটাইমিং করে ক্যাচ তুলেছিলেন, যদিও সেটি নিরাপদ জায়গায় পড়ে যায়। একই ওভারে ওয়েদারাল্ডকে করা একটি ডেলিভারি ছিল দিনের অন্যতম সেরা বল—ভালো লেংথ থেকে তীব্রভাবে ভেতরে ঢুকে সেটি ব্যাটের কানা এড়িয়ে ব্যাটসম্যানকে পরাস্ত করে।
তাসকিন আহমেদও শুরু থেকেই ভালো জায়গায় বল করে গেছেন। প্রথম ওভারে ৫ রান দিলেও ট্রাভিস হেডকে একবার পায়ের ওপর দিয়ে পরাস্ত করেন তিনি। তার বোলিংয়ে বাউন্স ও লাইন–লেংথের প্রশংসা করেন ধারাভাষ্যকার অ্যাডাম গিলক্রিস্ট। দ্বিতীয় ওভারে হাসান মাহমুদও ওয়েদারাল্ডকে ভালো লেংথের বলে পরাস্ত করেন। ষষ্ঠ ওভারেও হাসানের বলে বিট হন ওয়েদারাল্ড। অষ্টম ওভারে রাউন্ড দ্য উইকেট থেকে এসে হাসান দুই ওপেনারকেই অস্বস্তিতে রাখেন। তবে ওভারের শেষ বলে হাফ ভলিতে চার মেরে কিছুটা স্বস্তি পান ওয়েদারাল্ড। একপর্যায়ে ওয়েদারাল্ড ১৪ এবং হেড ১০ রানে পৌঁছান।
নবম ওভারে বাংলাদেশ প্রথম বোলিং পরিবর্তন আনে। হাসান মাহমুদের জায়গায় আক্রমণে আসেন ইবাদত হোসেন। প্রথম ওভারেই মেডেন নিয়ে শুরু করেন তিনি। এরপর হেডকে পরপর দুবার দুর্দান্ত ডেলিভারিতে পরাস্ত করেন। ইবাদতের করা পঞ্চম বলে এলবিডব্লুর আবেদনও করেছিল বাংলাদেশ, কিন্তু রিভিউ নিয়ে সফল হয়নি তারা। তবে এরপরই আসে হাসানের প্রথম সাফল্য। অফ স্টাম্পের বাইরে ড্রাইভের প্রলোভন দেখিয়ে আগেও কয়েকটি বল করেছিলেন তিনি। ওয়েদারাল্ড সেই ফাঁদে পা দিয়ে একবার চারও মেরেছিলেন। কিন্তু দ্বাদশ ওভারের চতুর্থ বলে একই ধরনের ডেলিভারিতে ড্রাইভ করতে গিয়ে ভুল করেন অস্ট্রেলিয়ান ওপেনার। ব্যাটের কানা ছুঁয়ে বল চলে যায় উইকেটকিপার লিটন দাসের গ্লাভসে। ২৩ রানে থামেন ওয়েদারাল্ড।
ফক্স ক্রিকেটের ধারাভাষ্যকার কেরি ও’কিফও বাংলাদেশের এই উইকেটকে প্রাপ্য বলে উল্লেখ করেন। ওয়েদারাল্ডের বিদায়ের পর তিন নম্বরে ব্যাটিংয়ে আসেন মারনাস লাবুশেন। অন্য প্রান্তে তখন ১৫ রানে ব্যাট করছিলেন ট্রাভিস হেড। কিন্তু হাসানের পর এবার আঘাত হানেন তিনিই। ১৪তম ওভারের চতুর্থ বলে রাউন্ড দ্য উইকেট থেকে করা তার ডেলিভারি ভালো লেংথে পড়ে ভেতরে ঢুকে যায়। ট্রাভিস হেড বলটি ঠিকমতো খেলতে পারেননি। বল ব্যাটে লেগে স্টাম্পের বেলস উড়িয়ে দেয়। ২২ রানে ফিরতে হয় অস্ট্রেলিয়ার এই আগ্রাসী ওপেনারকে।
হেডের বিদায়ের পর চার নম্বরে নামেন স্টিভেন স্মিথ। তখনও অস্ট্রেলিয়া পরিস্থিতি সামলে নেওয়ার চেষ্টা করছে। কিন্তু বাংলাদেশের পেসাররা একটুও সুযোগ দিতে রাজি ছিলেন না। ১৭তম ওভারে ইবাদতের বলে অবশ্য বড় সুযোগ নষ্ট করে বাংলাদেশ। তার দ্বিতীয় বলে তৃতীয় স্লিপে স্মিথের ক্যাচ উঠেছিল। তানজিদ তামিম সেটি ধরতে পারেননি। বল ব্যাটে লেগে বেশ নিচু হয়ে এসেছিল, তবে ক্যাচটি নেওয়ার মতোই ছিল। তখন স্মিথের রান মাত্র ২। ‘বিগ ফিশ’ স্মিথের এমন ক্যাচ হাতছাড়া করার খেসারত বাংলাদেশকে দিতে হতে পারে—ম্যাচের ওই মুহূর্তে সেটিই ছিল সবচেয়ে বড় আশঙ্কা। এরপর স্মিথকে কিছুটা সময় দিতে অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত তাসকিন আহমেদকে আবার আক্রমণে আনেন। ১৬তম ওভারে মাত্র ৩ রান দিয়েছিলেন তাসকিন। পরের স্পেলে এসে তিনি আরও বড় সাফল্য এনে দেন দলকে।
১৮তম ওভারের দ্বিতীয় বলে লাবুশেনকে ফিরিয়ে দেন ইবাদত। অফ স্টাম্পের বাইরে থাকা বলটি ছেড়ে দিলেই কোনো সমস্যা হতো না। কিন্তু অভ্যাসবশত ব্যাট চালিয়ে বলের কানা লাগিয়ে ফেলেন লাবুশেন। দ্বিতীয় স্লিপে দাঁড়ানো নাজমুল হোসেন ক্যাচটি ধরে ফেলেন। মাত্র ১ রান করে ফেরেন লাবুশেন। লাবুশেনের বিদায়ের পর অস্ট্রেলিয়ার ইনিংসে যোগ দেন ক্যামেরন গ্রিন। তখন স্মিথ ৭ রানে অপরাজিত। এরপর বাংলাদেশের পেস আক্রমণের চাপ আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ১১.৪ ওভার থেকে ১৮.২ ওভার—মাত্র ৪০ বলের ব্যবধানে অস্ট্রেলিয়া হারায় ৩ উইকেট। এই সময়ে তাদের স্কোরে যোগ হয় মাত্র ১৬ রান। অফ স্টাম্পের আশপাশে ধারাবাহিকভাবে বল করে যাওয়ার পুরস্কারই যেন পেলেন বাংলাদেশের পেসাররা।
শেষ পর্যন্ত মধ্যাহ্নভোজের বিরতির ঠিক আগে তাসকিনও তার প্রথম উইকেট তুলে নেন। ২২তম ওভারের শেষ বলে অন সাইডে ওপরে তুলে খেলতে গিয়ে ক্যামেরন গ্রিন শর্ট মিড উইকেটে মুশফিকুর রহিমের হাতে ক্যাচ দেন। ১৩ রান করে ফিরতে হয় তাকে। গ্রিনের বিদায়ের পর তাসকিনও সতীর্থদের সঙ্গে উইকেট উদ্যাপনে যোগ দেন। এই উইকেট ছিল তার প্রথম সাফল্য। ফলে লাঞ্চের আগেই অস্ট্রেলিয়ার ৪ উইকেট তুলে নেয় বাংলাদেশ। অস্ট্রেলিয়ার স্কোরবোর্ডে তখন একদিকে উইকেট পড়ার চাপ, অন্যদিকে বাংলাদেশের পেসারদের দাপট। স্মিথ ৭ রানে অপরাজিত ছিলেন। লাবুশেনের উইকেটের পর ধারাভাষ্যকার ও অস্ট্রেলিয়ার সাবেক ওপেনার মার্ক ওয়াহ লাবুশেনের শটটিকে ‘নাথিং শট’ বলে মন্তব্য করেন। তার ভাষায়, বাংলাদেশ তখন ‘অন টপ’।
বাংলাদেশের জন্য অবশ্য আফসোসও কম নয়। বিশেষ করে স্মিথের ক্যাচটি হাতছাড়া করার পর তাকে আরও কিছুক্ষণ ব্যাটিংয়ের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। তবে লাঞ্চের আগেই চার উইকেট তুলে নিয়ে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণে থাকার পরিষ্কার বার্তা দিয়েছে বাংলাদেশের পেস আক্রমণ। চোটের কারণে এই সিরিজে নেই নাহিদ রানা। তার অনুপস্থিতি নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছিল। কিন্তু হাসান মাহমুদ, ইবাদত হোসেন ও তাসকিন আহমেদের সম্মিলিত বোলিংয়ে আপাতত সেই অভাবটা বুঝতে দিচ্ছে না বাংলাদেশ। সবুজ উইকেটের সুবিধা কাজে লাগিয়ে অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিং লাইনআপকে শুরুতেই যে ধাক্কা দিয়েছে বাংলাদেশ, সেটিই এখন ইনিংসের পরের অংশে কতটা বড় চাপ তৈরি করে—সেদিকেই তাকিয়ে থাকবে দুই দল।

ডেস্ক রিপোর্ট 
























