তার বয়স যখন মাত্র ১২, আল-কায়দার হাতে খুন হন বাবা। তিনি ছিলেন ইরাকি সৈন্য। এর কয়েক বছর পর অপহরণ করা হয় তার বড় ভাইকে। সেই থেকে নিরুদ্দেশ তিনি। জীবনটা অঙ্কুরেই অবিন্যস্ত, আগোছাল হয়ে গিয়েছিল। আয়মেন হুসেইন পরিবারের ছাতা হতে ফুটবল প্রায় ছেড়েই দিয়েছিলেন। মা তা হতে দেননি। ছেলেকে ঠেলে দিলেন তার স্বপ্ন সত্যি করার বন্ধুর পথে। যাও, যে স্বপ্ন লালন কর, সেটিকে আলোর মুখ দেখানোর প্রতিজ্ঞাও পূর্ণ কর। মায়ের অনুপ্রেরণার লণ্ঠনের আলোয় আয়মেন ফুটবলের পাঠশালায় একনিষ্ঠ শিক্ষার্থী হয়ে এখন বিশ্বমঞ্চে। বাংলাদেশ সময় বুধবার ভোর ৪টায় যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টনে শুরু হওয়া ম্যাচে আর্লিং হলান্ডের নরওয়ের বিপক্ষে ৪-১ ব্যবধানে হেরেছে ইরাক। ইরাকের একমাত্র গোলটি করেছেন ৩০ বছর বয়সি ফরোয়ার্ড আয়মেন। বলিভিয়ার বিপক্ষে মেক্সিকোয় বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের প্লে-অফ ম্যাচে তার গোলেই দীর্ঘ ৪০ বছরের খরা ঘুচিয়েছিল ইরাক। নিজের অভিষেকলগ্ন জয় দিয়ে বর্ণিল করে তুলতে পারেননি তিনি। কিন্তু স্মৃতির সিন্দুকে একটি গোল রেখে দিয়েছেন। জীবনের সন্ধ্যাবেলায় যে স্মৃতি তাকে শিহরিত করবে। ঝাপসা করে দেবে শৈশবে বাবা ও ভাইকে হারানোর দুঃসহ স্মৃতি।
১২ বছর বছর বয়সটা হলো জীবনকে কৌতূহলের জানালা দিয়ে দেখার। আয়মেন তখন স্থানীয় একটি দলের হয়ে খেলেন। তখনই বাবার নৃশংস হত্যাকাণ্ড। বাড়ি নির্মাণের সামগ্রী কেনার সময় বাবাকে হত্যা করে আল-কায়দা। সেই শোকের মৃত্যু হওয়ার আগেই বড় ভাই অপহৃত হন। আজও ফিরে আসেননি। বাবা নেই, ভাই নিখোঁজ। সংসারের হাল ধরবে কে। দায়িত্ব নিতে হতো আয়মেনকে। বাদ সাধলেন মা। তোমার ওসব নিয়ে চিন্তা করার দরকার নেই। যাও, ফুটবল খেল। ফুটবলে নিজেকে সঁপে দাও। আয়মেন এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘সংসারের চাকা সচল রাখতে ফুটবল ছেড়ে দিতে চেয়েছিলাম। মা রাজি হননি। তিনি খেলা চালিয়ে যেতে বলেন। বলেন, ‘বাবা-ফুটবল তোমার স্বপ্ন। স্বপ্নটা সত্যি করতে হবে তোমাকে।’ সেই থেকে স্বপ্নের পেছনে ছোটা শুরু। স্বপ্নই তাকে নিয়ে এসেছে বিশ্বকাপে।
১৯৯৬ সালে আল-সাফরা গ্রামে জন্ম। কৃষিকাজ ও মেষপালন ছিল জীবিকার একমাত্র মাধ্যম। ২০০৮-এ বিপর্যয় নেমে এলো। বাবা ইরাকি সৈন্য। আল-কায়দা তাকে হত্যা করে। ‘বাড়ির কাজ চলছিল। বাবা গিয়েছিলেন নির্মাণসামগ্রী কিনতে। কয়েক ঘণ্টা পর ফোন এলো-তোমার বাবা মারা গেছেন। তার মরদেহ হাসপাতালে রয়েছে,’ বলছিলেন আয়মেন। গুলিটা বিদ্ধ হয়েছিল বাবার হৃৎপিণ্ডে। ওটা কি শুধু বাবার হৃৎপিণ্ড ছিল! গোটা পরিবারেরও নয় কি! ওইটুকু বয়সেই আয়মেন বুঝতে পেরেছিলেন, গ্রাম তাদের জন্য আর নিরাপদ নয়। দ্রুত ছাড়তে হবে। বাবার মৃত্যুর পর বড় ভাইও যোগ দেন ইরাকের সেনাবাহিনীতে। আর আয়মেন নাম লেখান ইরাক যুব ফুটবল দলে। কয়েক বছর পর তুরস্কে অনুশীলন শিবির থেকে ফেরার পথে জানতে পারেন, অপহরণের শিকার হয়েছেন তার ভাই।
আলোর কপাট সেখানেই বন্ধ হয়ে যেত! আয়মেনের ফুটবলার হওয়া আর হতো না। কিন্তু ভাগ্য কখনো কখনো অদ্ভুত খেলা খেলে। আয়মেন যখন মুফতে খেলতে রাজি ছিলেন, তখনই ৯২০ ডলার মাসিক বেতনে আলাদিনের চেরাগ পাওয়ার মতো করা চুক্তি তার কপাল খুলে দেয়। জীবনের পরাজয় যিনি দেখেছেন সূচনায়, তিনি এখন দেখছেন জীবনের জয়।

ডেস্ক রিপোর্ট 






















