ইরানকে কেন্দ্র করে চূড়ান্ত এক মোড়ের মুখে দাঁড়িয়ে আছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি কর্মকর্তারা এই যুদ্ধের সম্ভাব্য শেষ হিসেবে দুটি পথ দেখতে পাচ্ছেন। প্রথম বিকল্পটি হলো হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার লক্ষ্যে নতুন করে ১০ দিনের যুদ্ধবিরতির পথে হাঁটা। আর দ্বিতীয় বিকল্পটি হলো তেহরানকে নতিস্বীকারে বাধ্য করতে ইসরায়েলকে সঙ্গে নিয়ে একযোগে সর্বাত্মক ও বিশাল সামরিক অভিযান শুরু করা।
মোদির বাসভবনের সামনে বিক্ষোভ থেকে রাহুল গান্ধী আটকমোদির বাসভবনের সামনে বিক্ষোভ থেকে রাহুল গান্ধী আটক প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এখনও কোনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেননি। তবে কর্মকর্তাদের মতে, আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই নির্ধারিত হবে কোন পথটি জয়ী হতে যাচ্ছে। পারস্য উপসাগরকে স্থবির করে দেওয়া এই টানা ও অনির্দিষ্টকালের সংঘাত আর দীর্ঘায়িত করার সুযোগ খুব একটা নেই।
এই প্রচেষ্টার বিষয়ে সরাসরি অবগত দুটি আঞ্চলিক সূত্র জানিয়েছে, কাতার, মিসর, পাকিস্তান এবং অন্যান্য আঞ্চলিক মধ্যস্থতাকারীরা যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের কাছে ১০ দিনের এক যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব পেশ করেছে। মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ট্রাম্প প্রশাসন এই প্রস্তাবটি খতিয়ে দেখছে এবং কূটনৈতিক পথ যেন বন্ধ না হয়ে যায়, সেজন্য ইসরায়েলকেও সতর্ক থাকতে তাগিদ দিয়েছে।
তবে আলোচনা ব্যর্থ হতে পারে, এমন আশঙ্কায় একই সঙ্গে ওয়াশিংটন যুদ্ধের প্রস্তুতিও জোরদার করছে। বড় ধরনের সংঘাত বাড়াতে মধ্যপ্রাচ্যে সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ডজন ডজন যুদ্ধবিমানের পাশাপাশি রিফুয়েলিং বিমান পাঠিয়েছে মার্কিন সামরিক বাহিনী। অন্যদিকে ইসরায়েলি সূত্রে জানা গেছে, ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রয়েছে এবং আগামী কয়েক দিনের মধ্যে এই যুদ্ধকে একটি সমন্বিত ও সর্বাত্মক অভিযানে রূপ দিতে প্রস্তুত রয়েছে।
ইরান যুদ্ধে অর্থ সংকটে যুক্তরাষ্ট্র, ফুরিয়ে যাচ্ছে তহবিলইরান যুদ্ধে অর্থ সংকটে যুক্তরাষ্ট্র, ফুরিয়ে যাচ্ছে তহবিল টানা ১০ রাত ধরে মার্কিন বোমারু বিমান হামলা চালিয়েও হরমুজ প্রণালির ওপর থেকে ইরানের নিয়ন্ত্রণ ভাঙা যায়নি। এতে ট্রাম্প আবারও সেই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ছেন, যা তিনি ইতোমধ্যে জিতেছেন বলে বারবার দাবি করে আসছিলেন। পুনরায় শুরু হওয়া এই লড়াইয়ে অন্তত তিন মার্কিন সেনা প্রাণ হারিয়েছেন। সোমবার ট্রাম্প জানিয়েছেন, প্রতিটি মার্কিন সেনার মৃত্যুর জন্য ইরানকে ‘বহুগুণ বেশি মূল্য দিতে’ তিনি পেন্টাগনকে নির্দেশ দিয়েছেন।
সপ্তাহান্তে অপরিশোধিত তেলের দাম একপর্যায়ে ব্যারেলপ্রতি ৯০ ডলার ছাড়িয়ে যায়, কারণ ইরান বাণিজ্যিক জাহাজ ও উপসাগরীয় অঞ্চলের অবকাঠামোর ওপর হামলা জোরদার করেছে। যুক্তরাষ্ট্রে পেট্রোলের দাম আবারও বৃদ্ধি পাওয়ায় ইতোমধ্যে অজনপ্রিয় হয়ে ওঠা এই যুদ্ধ নিয়ে ঘরের মাঠে ট্রাম্পকে তীব্র ক্ষোভের মুখে পড়তে হচ্ছে।
দিন দিন যে পাল্টাপাল্টি হামলা বিধ্বংসী রূপ নিচ্ছে, তা থামাতে আবারও দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছেন আঞ্চলিক মধ্যস্থতাকারীরা। প্রস্তাবিত নতুন যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলে যুদ্ধ বন্ধ হওয়ার পাশাপাশি হরমুজ প্রণালির দুটি নৌপথই খুলে যাবে। ফলে ভঙ্গুর হয়ে পড়া আগের সমঝোতা স্মারকটি রক্ষা করার সুযোগ পাবে ওয়াশিংটন ও তেহরান। আঞ্চলিক এক সূত্র জানিয়েছে, আমরা যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানকে পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত করার প্রস্তাব দিয়েছি।
গাড়ি, দুগ্ধ আর অ্যালকোহল ঘিরে ফের উত্তপ্ত ট্রাম্প-কানাডা সম্পর্কগাড়ি, দুগ্ধ আর অ্যালকোহল ঘিরে ফের উত্তপ্ত ট্রাম্প-কানাডা সম্পর্ক এখনও ট্রাম্প বা ইরান কেউই এই প্রস্তাব গ্রহণ করেনি। দুপক্ষই মনে করছে, যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে যাওয়ার আগে নতুন করে হামলার মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান আরও শক্ত করা প্রয়োজন। এরই মধ্যে ইয়েমেনে ইরান সমর্থিত হুথিরা সৌদি আরবের বন্দরগুলোর ওপর নৌঅবরোধের ঘোষণা দিয়েছে, যা উপসাগরের শক্তি অবকাঠামো ও নৌ চলাচলে নতুন এক ফ্রন্ট খুলে দিয়েছে। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ইরানি যেকোনও আক্রমণের জবাবে তারা কঠোর পাল্টা আঘাত হানবেন। এতে উপসাগর থেকে লোহিত সাগর এবং ইসরায়েল পর্যন্ত বিস্তৃত এক সর্বাত্মক যুদ্ধের ঝুঁকি আরও বাড়লো।
আঞ্চলিক সূত্রগুলো জানায়, ওমানের মাসকাটে ১১ জুলাই ওমান, ইরান ও কাতারের মধ্যে যে আলোচনা হয়েছিল, মধ্যস্থতাকারীরা সেটাকে ভিত্তি ধরেই এগোচ্ছেন। সে সময় যুক্তরাষ্ট্র শর্ত দিয়েছিল যে তেহরানকে প্রকাশ্যে ঘোষণা দিতে হবে তারা হরমুজ প্রণালি মুক্ত রাখবে। কিন্তু চুক্তি ছাড়া সেদিনের বৈঠক ভেস্তে যায় এবং তার পরপরই ইরান প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালায়। এর জের ধরে যুক্তরাষ্ট্রের ধারাবাহিক রাত্রিকালীন বিমান হামলা শুরু হয়, যা আজও চলছে।
নেতানিয়াহুকে গ্রেফতার করা হবে না, জানিয়ে দিলেন ট্রাম্পনেতানিয়াহুকে গ্রেফতার করা হবে না, জানিয়ে দিলেন ট্রাম্প নতুন প্রস্তাবে হরমুজ প্রণালির দুটি পথই সম্পূর্ণ খুলে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে, ওমানের জলসীমা ব্যবহার করে দক্ষিণ রুট (যা ইরানি হামলা মুক্ত থাকবে) এবং ইরানের জলসীমা ব্যবহার করে উত্তর রুট (যা মার্কিন অবরোধ মুক্ত থাকবে)। এই ১০ দিনের যুদ্ধবিরতিকালে প্রণালি অতিক্রমের একটি দীর্ঘমেয়াদি নীতি নির্ধারণে আলোচনা করবে দুই দেশ। একটি প্রস্তাব হলো, সামুদ্রিক নিরাপত্তা ও পরিবেশ রক্ষার মতো সেবার জন্য ইরান একটি ‘যুক্তিসঙ্গত সেবা ফি’ নিতে পারবে। উদাহরণ হিসেবে মালাক্কা প্রণালির কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যেখানে মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও সিঙ্গাপুর সরাসরি যাতায়াত ফি না নিয়ে নির্দিষ্ট সেবার বিনিময়ে অর্থ নেয়। আরেকটি প্রস্তাব হলো, আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থার (আইএমও) তত্ত্বাবধানে সংগৃহীত ফি একটি যৌথ তহবিলে রাখা।
এই মধ্যস্থতায় জড়িত নেতাদের মধ্যে রয়েছেন কাতারের প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ বিন আব্দুল রহমান আল থানি, কাতারের দূত আলী আল-থাওয়াদি, পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির, মিসরের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আবদেলাতি এবং ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আল-বুসাইদি।
মার্কিন ডলারের বিপরীতে আরও শক্তিশালী চীনা ইউয়ানমার্কিন ডলারের বিপরীতে আরও শক্তিশালী চীনা ইউয়ান এক সূত্র জানিয়েছে, শনিবার পর্যন্ত যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব ভালোভাবেই এগোচ্ছিল। কিন্তু জর্ডানে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় অন্তত দুই মার্কিন সেনা নিহত হলে ওয়াশিংটন আলোচনা থেকে পিছিয়ে যায়। এক জ্যেষ্ঠ মার্কিন কর্মকর্তা আলোচনা চলার কথা নিশ্চিত করে জানান, ট্রাম্প এখনও তার পাল্টা আঘাত শেষ করেননি। তিনি বলেন, সমঝোতা লঙ্ঘন করা এবং হরমুজ প্রণালিতে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালানোর কারণে প্রেসিডেন্ট ইরানকে উপযুক্ত শাস্তি দিতে মনোযোগ দিচ্ছেন। এছাড়া নিহত মার্কিন সেনাদের প্রতিশোধ নেওয়াও তার লক্ষ্য। প্রেসিডেন্ট যতদিন চাইবেন ততদিন এই ধ্বংসাত্মক আঘাত অব্যাহত থাকবে।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই সোমবার নিশ্চিত করেছেন যে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে মধ্যস্থতাকারীরা কাজ করছেন। এক সংবাদ সম্মেলনে বাঘাই বলেন, মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে কিছু প্রস্তাব আমাদের কাছে পৌঁছেছে, তবে এই মুহূর্তে আমি এগুলোর বিস্তারিত নিয়ে কথা বলতে চাই না।
তিনি আরও বলেন, ইরানের সশস্ত্র বাহিনী শক্তি দিয়ে মার্কিন আগ্রাসনের উৎস গুড়িয়ে দেওয়া অব্যাহত রাখবে।
অনশনরত ওয়াংচুককে বেসরকারি হাসপাতালে স্থানান্তরের নির্দেশ আদালতেরঅনশনরত ওয়াংচুককে বেসরকারি হাসপাতালে স্থানান্তরের নির্দেশ আদালতের ট্রাম্পকে এই যুদ্ধবিরতি কাঠামোর বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হয়েছে কি না, অথবা স্থায়ী সমাধানের রূপরেখা ছাড়া তিনি আবার সাময়িক যুদ্ধবিরতিতে সায় দেবেন কি না, তা এখনও স্পষ্ট নয়। সমঝোতা ভেস্তে যাওয়ার পর থেকে তেহরানের প্রতি ক্ষোভ উগরে দিয়ে ট্রাম্প তাদের ‘অসুস্থ মানসিকতার লোক’ বলে অভিহিত করেছেন এবং নতুন আলোচনাকে ‘সময়ের অপচয়’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন।
এক আঞ্চলিক সূত্রের ধারণা, জর্ডানে সেনা নিহতের প্রতিশোধ নিতে ট্রাম্প প্রশাসন হয়তো আরও কয়েক দিন ইরানে বোমা হামলা চালিয়ে যাবে, তারপরই তারা প্রস্তাবটি গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করবে। সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে ওই সূত্র মন্তব্য করেন, আমরা একটি টেকসই সমাধানের পথ খোঁজার চেষ্টা করছি। ইরানিরা নিজেদের শর্ত চাপিয়ে দিতে পারবে না, তবে তাদের একদম উপেক্ষা করাও সম্ভব নয়।
সূত্র: অ্যাক্সিওস

ডেস্ক রিপোর্ট 


















