ঢাকা , রবিবার, ১২ জুলাই ২০২৬, ২৭ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সরানো হচ্ছে কলকাতা বিমানবন্দরের রানওয়ের পাশে থাকা ঐতিহাসিক মসজিদ

  • ডেস্ক রিপোর্ট
  • আপডেট সময় ০৪:২৩:৩৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ১১ জুলাই ২০২৬
  • ১৭ বার পড়া হয়েছে

এবার কলকাতা বিমানবন্দরের দ্বিতীয় রানওয়ের পাশে অবস্থান করা শতাব্দী প্রাচীন গৌরীপুর মসজিদ স্থানান্তরের উদ্যোগ নিয়েছে ভারতের এয়ারপোর্ট অথরিটি অফ ইন্ডিয়া। মসজিদ কমিটি, এয়ারপোর্ট অথরিটি অফ ইন্ডিয়া, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয় মুসলিম সম্প্রদায়ের সর্বজনমতের ভিত্তিতে একটি বিশেষ পরিদর্শক দল ও নিরাপত্তা কমিটির বৈঠকের পর এই পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে। মনে করা হচ্ছে শনিবার (১১ জুলাই) থেকেই এই মসজিদ স্থানান্তরের কাজ শুরু হতে পারে। কারণ বিশেষ প্রজ্ঞাপন জারি করে শনিবার থেকেই মসজিদটিতে নামাজ বন্ধ রাখা হয়েছে। এর আগে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে বিভিন্ন সময় মসজিদ ভাঙচুরের ঘটনা সামনে এসেছে। তবে গৌরীপুর মসজিদ স্থানান্তরের বিষয়টি কিছুটা ভিন্ন।

১৩৬ বছরের পুরোনো গৌরীপুর জামে মসজিদ যা অনেকের কাছেবাঁকড়া মসজিদনামেও পরিচিত। এই ঐতিহাসিক ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান বর্তমানে কলকাতার নেতাজি সুভাষচন্দ্র বোস আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নিরাপত্তার জন্য বড় ধরনের হুমকি হিসেবে দেখা হয়। এর কারণ মসজিদটির অবস্থান। কলকাতা বিমানবন্দরের দ্বিতীয় রানওয়ের একেবারে গা ঘেঁষে থাকায় প্রবল বর্ষণ বা ঘন কুয়াশায় দৃশ্যমানতা কমে যাওয়ার সময় পাইলটের পক্ষে রানওয়ে থেকে সামান্য দূরত্বে এই মসজিদ ভিজ্যুয়াল ইলিউশন তৈরি করে। এতে মারাত্মক দুর্ঘটনা ঘটে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।

আন্তর্জাতিক বিমান পরিবহনের ক্ষেত্রে অত্যন্ত কড়া কিছু সেফটি নর্মস বা সুরক্ষাবিধি রয়েছে। বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ সূত্র বলছে, বাঁকড়া মসজিদটি বিমানবন্দরের সেকেন্ডারি বা সহকারী রানওয়ে থেকে মাত্র ১৬৫ মিটার দূরত্বে অবস্থিত। অথচ আন্তর্জাতিক বিমান চলাচল সুরক্ষাবিধি স্পষ্ট বলছে, রানওয়ে থেকে যে কোনো কাঠামোর ন্যূনতম দূরত্ব অন্তত ২৪০ মিটার হওয়া বাধ্যতামূলক। স্বাভাবিকভাবেই এই আন্তর্জাতিক নিয়মের চেয়ে বেশ কিছুটা কম দূরত্বে রয়েছে মসজিদটি। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, রানওয়ের এত কাছাকাছি এই কাঠামোটি থাকার কারণে সেখানে আধুনিকইনস্ট্রুমেন্ট ল্যান্ডিং সিস্টেম’ (আইএলএস) বসানো যাচ্ছিল না। আর এর ফলেই বিমানবন্দরের উড়ান পরিচালনার সামগ্রিক ক্ষমতা অনেকটাই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে।

বর্তমান এই কাঠামোগত বিন্যাসের কারণে আরেকটি বড় সমস্যা তৈরি হচ্ছিল। মসজিদটির অবস্থানের দরুন সেকেন্ডারি রানওয়েরটাচডাউন পয়েন্টবা বিমান ছোঁয়ার নির্দিষ্ট স্থানটিকে বাধ্য হয়ে কিছুটা এগিয়ে এনে ছোট করতে হয়েছিল। আর রানওয়ের এই সীমাবদ্ধতার কারণে বড় বিমানগুলো এই রানওয়েটি ব্যবহার করতে পারছিল না। মসজিদটি অন্য জায়গায় সরিয়ে নিয়ে গেলে এই সমস্ত বাধাবিপত্তি এক ঝটকায় দূর হয়ে যাবে। সেই সঙ্গে পরিকাঠামোগত আধুনিকীকরণের রাস্তা সাফ হওয়ায় বিমান চলাচল ব্যবস্থাও অনেক উন্নত হবে। কলকাতা বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ আগেই জানিয়েছে, চলতি হজের মৌসুম শেষ হওয়ার পরেই ২০১৩ সালের আগে কলকাতা বিমানবন্দর যে পুরোনো টার্মিনাল ভবনটি ব্যবহার করত, সেটিও এবার ভেঙে ফেলা হবে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পুরোনো টার্মিনাল ভবনটি ভেঙে ফেলার পর নতুন টার্মিনাল তৈরি এবং মসজিদ স্থানান্তরের পর দ্বিতীয় রানওয়ে পুরোদমে চালু করা গেলে কলকাতা বিমানবন্দরের বার্ষিক যাত্রী পরিবহন করার ক্ষমতা এক ধাক্কায় বেড়ে দাঁড়াবে প্রায় ৪ কোটি (৪০ মিলিয়ন)

এই মসজিদের কারণে বিমানবন্দরের দ্বিতীয় রানওয়ে সম্প্রসারণের কাজও থমকে আছে প্রায় ৩০ বছর। সূত্র বলছে, ৩০ বছরেরও বেশি সময় ধরে এই মসজিদ স্থানান্তরের বিষয়টি বারবার আলোচনায় উঠে এসেছে। কিন্তু কখনও স্থানীয় বাধা, কখনও পূর্বতন বাম ও তৃণমূল সরকারের ঢিলেমিতে বিমানবন্দরের নিরাপত্তার বিষয়টি অগ্রাধিকার পায়নি। তবে সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক পট পরিবর্তন হওয়ায় ফের মসজিদ সরানো নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়। কিন্তু ঈদের নামাজ ওই মসজিদে পড়েন বহু মানুষ। তাদের ভাবাবেগকেও প্রাধান্য দিতে চেয়েছিল রাজ্য সরকার এবং বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ। ঠিক হয়েছিল, ঈদের পর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। মনে করা হচ্ছে শনিবার থেকেই এই স্থানান্তরের প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে। তবে স্থানীয় স্তরে উত্তেজনা তৈরি হতে পারে এমন আশঙ্কায় গোটা বিষয়টি অত্যন্ত গোপনীয় রাখা হয়েছে। ব্যাপক নিরাপত্তা বলয়ে মুড়ে ফেলা হয়েছে গোটা এলাকা।

মসজিদ কমিটির তরফে আগেই এক বিবৃতিতে বলা হয়, ‘আমরা চাই না আমাদের কারণে বিমানবন্দরের কোনো ক্ষতি হোক বা সুরক্ষায় বিঘ্ন ঘটুক। বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ আমাদের বিমানবন্দরের বাইরে আরও বড় একটি মসজিদ তৈরি করে দেয়ার প্রস্তাব দিয়েছে। তবে স্থানান্তর করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়ার মতো অবস্থায় আমরা এই মুহূর্তে নেই।

স্থানীয় বিধায়ক সৌরভ শিকদার বলেনযারা নামাজ পড়তে যান তাদের কোনো পাশ ইস্যু করা হয় না। শুধুমাত্র আধার কার্ড জমা রেখে তাদের রানওযের পাশে থাকা ওই মসজিদে নিয়ে যাওয়া হয়। আপনারা জানেন আগের সরকারের আমলে কত জাল আধার কার্ড ইস্যু করা হয়েছে। নিরাপত্তার একটা সংকট তৈরি হয়। একইসঙ্গে যারা নামাজ পড়তে যান তাদের জন্য সিআইএসএফ জওয়ান মোতায়েন রাখতে হয়। একটা বাস সবসময় যাতায়াতের জন্য রাখতে হয়। মসজিদটির জন্য রানওয়ে সম্প্রসারণ করা যাচ্ছে না। এজন্য বড় বিমান আসতে পারে না। বিমানবন্দরের আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে। কর্মসংস্থান হচ্ছে না। এক কথায় বিমানবন্দরের উন্নয়ন কিছুই হচ্ছে না। আবার নিরাপত্তার জন্য বড় ধরনের হুমকি তৈরি করছে। আমরা মসজিদ কমিটিকে বলেছি রানওয়ের বাইরে এয়ারপোর্ট অথরিটির অন্য জমি আপনারা চিহ্নিত করুন, আমরা দিয়ে দেবো।

১৯২৪ সালে চালু হয় কলকাতা বিমানবন্দর। জমিটি প্রাচীন ওয়াকফ সম্পত্তি। পরে ১৯৬২ সালে বিমানবন্দর সম্প্রসারণের জন্য জমিটি অধিগ্রহণ করে এয়ারপোর্ট অথরিটি অফ ইন্ডিয়া। তখন মসজিদের পাশেই ছিল যশোর রোড। বিমানবন্দরের জন্য যশোর রোড ঘুরিয়ে দেয়া হয়। মসজিদটি থেকে যায় বিমানবন্দরের পাঁচিলের ভেতর, রানওয়ের পাশেই।

১৯৬২ সালের জমি অধিগ্রহণের অন্যতম শর্ত হিসেবে গৌরীপুর কালীমন্দিরের (যশোহর রোডের ওপর) বিপরীতে একটি ছোট্ট লোহার গেট করা আছে। তার ওপর রয়েছে সিআইএসএফের ওয়াচ টাওয়ার। গেটের কলিং বেল বাজালে নামাজ পাঠ করতে ইচ্ছুক মানুষের জন্য গেট খোলা হয়। তাদের আধার কার্ড যাচাইয়ের পর বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ তাদের বিশেষ বাসে করে মসজিদ পর্যন্ত নিয়ে যান। দৈনিক তিনটি শিফটে এরকম ৪টি করে বাসের ব্যবস্থা থাকে। এই বিশেষ ব্যবস্থা ছাড়া সাধারণ মানুষের পক্ষে ওই মসজিদ পর্যন্ত যাওয়া কার্যত অসম্ভব। শনিবার সালামপুরের কারণে যদি মসজিদটি ভাঙার কাজ শুরু হয় বাইরের জগতের মানুষ সেটা ঘুণাক্ষরেও টের পাবেন না। কারণ ভাঙার যন্ত্রপাতি বিমানবন্দরের নিজস্ব। সেগুলো পুরাতন টার্মিনাস কার্গো বিভাগ থেকে সরাসরি রানওয়ে হয়ে মসজিদ পর্যন্ত যাতায়াত করবে। যশোহর রোড থেকে মসজিদের দূরত্ব কমবেশি প্রায় ৩ কিলোমিটার।

ট্যাগস

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

জনপ্রিয় সংবাদ

সরানো হচ্ছে কলকাতা বিমানবন্দরের রানওয়ের পাশে থাকা ঐতিহাসিক মসজিদ

আপডেট সময় ০৪:২৩:৩৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ১১ জুলাই ২০২৬

এবার কলকাতা বিমানবন্দরের দ্বিতীয় রানওয়ের পাশে অবস্থান করা শতাব্দী প্রাচীন গৌরীপুর মসজিদ স্থানান্তরের উদ্যোগ নিয়েছে ভারতের এয়ারপোর্ট অথরিটি অফ ইন্ডিয়া। মসজিদ কমিটি, এয়ারপোর্ট অথরিটি অফ ইন্ডিয়া, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয় মুসলিম সম্প্রদায়ের সর্বজনমতের ভিত্তিতে একটি বিশেষ পরিদর্শক দল ও নিরাপত্তা কমিটির বৈঠকের পর এই পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে। মনে করা হচ্ছে শনিবার (১১ জুলাই) থেকেই এই মসজিদ স্থানান্তরের কাজ শুরু হতে পারে। কারণ বিশেষ প্রজ্ঞাপন জারি করে শনিবার থেকেই মসজিদটিতে নামাজ বন্ধ রাখা হয়েছে। এর আগে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে বিভিন্ন সময় মসজিদ ভাঙচুরের ঘটনা সামনে এসেছে। তবে গৌরীপুর মসজিদ স্থানান্তরের বিষয়টি কিছুটা ভিন্ন।

১৩৬ বছরের পুরোনো গৌরীপুর জামে মসজিদ যা অনেকের কাছেবাঁকড়া মসজিদনামেও পরিচিত। এই ঐতিহাসিক ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান বর্তমানে কলকাতার নেতাজি সুভাষচন্দ্র বোস আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নিরাপত্তার জন্য বড় ধরনের হুমকি হিসেবে দেখা হয়। এর কারণ মসজিদটির অবস্থান। কলকাতা বিমানবন্দরের দ্বিতীয় রানওয়ের একেবারে গা ঘেঁষে থাকায় প্রবল বর্ষণ বা ঘন কুয়াশায় দৃশ্যমানতা কমে যাওয়ার সময় পাইলটের পক্ষে রানওয়ে থেকে সামান্য দূরত্বে এই মসজিদ ভিজ্যুয়াল ইলিউশন তৈরি করে। এতে মারাত্মক দুর্ঘটনা ঘটে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।

আন্তর্জাতিক বিমান পরিবহনের ক্ষেত্রে অত্যন্ত কড়া কিছু সেফটি নর্মস বা সুরক্ষাবিধি রয়েছে। বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ সূত্র বলছে, বাঁকড়া মসজিদটি বিমানবন্দরের সেকেন্ডারি বা সহকারী রানওয়ে থেকে মাত্র ১৬৫ মিটার দূরত্বে অবস্থিত। অথচ আন্তর্জাতিক বিমান চলাচল সুরক্ষাবিধি স্পষ্ট বলছে, রানওয়ে থেকে যে কোনো কাঠামোর ন্যূনতম দূরত্ব অন্তত ২৪০ মিটার হওয়া বাধ্যতামূলক। স্বাভাবিকভাবেই এই আন্তর্জাতিক নিয়মের চেয়ে বেশ কিছুটা কম দূরত্বে রয়েছে মসজিদটি। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, রানওয়ের এত কাছাকাছি এই কাঠামোটি থাকার কারণে সেখানে আধুনিকইনস্ট্রুমেন্ট ল্যান্ডিং সিস্টেম’ (আইএলএস) বসানো যাচ্ছিল না। আর এর ফলেই বিমানবন্দরের উড়ান পরিচালনার সামগ্রিক ক্ষমতা অনেকটাই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে।

বর্তমান এই কাঠামোগত বিন্যাসের কারণে আরেকটি বড় সমস্যা তৈরি হচ্ছিল। মসজিদটির অবস্থানের দরুন সেকেন্ডারি রানওয়েরটাচডাউন পয়েন্টবা বিমান ছোঁয়ার নির্দিষ্ট স্থানটিকে বাধ্য হয়ে কিছুটা এগিয়ে এনে ছোট করতে হয়েছিল। আর রানওয়ের এই সীমাবদ্ধতার কারণে বড় বিমানগুলো এই রানওয়েটি ব্যবহার করতে পারছিল না। মসজিদটি অন্য জায়গায় সরিয়ে নিয়ে গেলে এই সমস্ত বাধাবিপত্তি এক ঝটকায় দূর হয়ে যাবে। সেই সঙ্গে পরিকাঠামোগত আধুনিকীকরণের রাস্তা সাফ হওয়ায় বিমান চলাচল ব্যবস্থাও অনেক উন্নত হবে। কলকাতা বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ আগেই জানিয়েছে, চলতি হজের মৌসুম শেষ হওয়ার পরেই ২০১৩ সালের আগে কলকাতা বিমানবন্দর যে পুরোনো টার্মিনাল ভবনটি ব্যবহার করত, সেটিও এবার ভেঙে ফেলা হবে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পুরোনো টার্মিনাল ভবনটি ভেঙে ফেলার পর নতুন টার্মিনাল তৈরি এবং মসজিদ স্থানান্তরের পর দ্বিতীয় রানওয়ে পুরোদমে চালু করা গেলে কলকাতা বিমানবন্দরের বার্ষিক যাত্রী পরিবহন করার ক্ষমতা এক ধাক্কায় বেড়ে দাঁড়াবে প্রায় ৪ কোটি (৪০ মিলিয়ন)

এই মসজিদের কারণে বিমানবন্দরের দ্বিতীয় রানওয়ে সম্প্রসারণের কাজও থমকে আছে প্রায় ৩০ বছর। সূত্র বলছে, ৩০ বছরেরও বেশি সময় ধরে এই মসজিদ স্থানান্তরের বিষয়টি বারবার আলোচনায় উঠে এসেছে। কিন্তু কখনও স্থানীয় বাধা, কখনও পূর্বতন বাম ও তৃণমূল সরকারের ঢিলেমিতে বিমানবন্দরের নিরাপত্তার বিষয়টি অগ্রাধিকার পায়নি। তবে সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক পট পরিবর্তন হওয়ায় ফের মসজিদ সরানো নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়। কিন্তু ঈদের নামাজ ওই মসজিদে পড়েন বহু মানুষ। তাদের ভাবাবেগকেও প্রাধান্য দিতে চেয়েছিল রাজ্য সরকার এবং বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ। ঠিক হয়েছিল, ঈদের পর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। মনে করা হচ্ছে শনিবার থেকেই এই স্থানান্তরের প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে। তবে স্থানীয় স্তরে উত্তেজনা তৈরি হতে পারে এমন আশঙ্কায় গোটা বিষয়টি অত্যন্ত গোপনীয় রাখা হয়েছে। ব্যাপক নিরাপত্তা বলয়ে মুড়ে ফেলা হয়েছে গোটা এলাকা।

মসজিদ কমিটির তরফে আগেই এক বিবৃতিতে বলা হয়, ‘আমরা চাই না আমাদের কারণে বিমানবন্দরের কোনো ক্ষতি হোক বা সুরক্ষায় বিঘ্ন ঘটুক। বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ আমাদের বিমানবন্দরের বাইরে আরও বড় একটি মসজিদ তৈরি করে দেয়ার প্রস্তাব দিয়েছে। তবে স্থানান্তর করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়ার মতো অবস্থায় আমরা এই মুহূর্তে নেই।

স্থানীয় বিধায়ক সৌরভ শিকদার বলেনযারা নামাজ পড়তে যান তাদের কোনো পাশ ইস্যু করা হয় না। শুধুমাত্র আধার কার্ড জমা রেখে তাদের রানওযের পাশে থাকা ওই মসজিদে নিয়ে যাওয়া হয়। আপনারা জানেন আগের সরকারের আমলে কত জাল আধার কার্ড ইস্যু করা হয়েছে। নিরাপত্তার একটা সংকট তৈরি হয়। একইসঙ্গে যারা নামাজ পড়তে যান তাদের জন্য সিআইএসএফ জওয়ান মোতায়েন রাখতে হয়। একটা বাস সবসময় যাতায়াতের জন্য রাখতে হয়। মসজিদটির জন্য রানওয়ে সম্প্রসারণ করা যাচ্ছে না। এজন্য বড় বিমান আসতে পারে না। বিমানবন্দরের আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে। কর্মসংস্থান হচ্ছে না। এক কথায় বিমানবন্দরের উন্নয়ন কিছুই হচ্ছে না। আবার নিরাপত্তার জন্য বড় ধরনের হুমকি তৈরি করছে। আমরা মসজিদ কমিটিকে বলেছি রানওয়ের বাইরে এয়ারপোর্ট অথরিটির অন্য জমি আপনারা চিহ্নিত করুন, আমরা দিয়ে দেবো।

১৯২৪ সালে চালু হয় কলকাতা বিমানবন্দর। জমিটি প্রাচীন ওয়াকফ সম্পত্তি। পরে ১৯৬২ সালে বিমানবন্দর সম্প্রসারণের জন্য জমিটি অধিগ্রহণ করে এয়ারপোর্ট অথরিটি অফ ইন্ডিয়া। তখন মসজিদের পাশেই ছিল যশোর রোড। বিমানবন্দরের জন্য যশোর রোড ঘুরিয়ে দেয়া হয়। মসজিদটি থেকে যায় বিমানবন্দরের পাঁচিলের ভেতর, রানওয়ের পাশেই।

১৯৬২ সালের জমি অধিগ্রহণের অন্যতম শর্ত হিসেবে গৌরীপুর কালীমন্দিরের (যশোহর রোডের ওপর) বিপরীতে একটি ছোট্ট লোহার গেট করা আছে। তার ওপর রয়েছে সিআইএসএফের ওয়াচ টাওয়ার। গেটের কলিং বেল বাজালে নামাজ পাঠ করতে ইচ্ছুক মানুষের জন্য গেট খোলা হয়। তাদের আধার কার্ড যাচাইয়ের পর বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ তাদের বিশেষ বাসে করে মসজিদ পর্যন্ত নিয়ে যান। দৈনিক তিনটি শিফটে এরকম ৪টি করে বাসের ব্যবস্থা থাকে। এই বিশেষ ব্যবস্থা ছাড়া সাধারণ মানুষের পক্ষে ওই মসজিদ পর্যন্ত যাওয়া কার্যত অসম্ভব। শনিবার সালামপুরের কারণে যদি মসজিদটি ভাঙার কাজ শুরু হয় বাইরের জগতের মানুষ সেটা ঘুণাক্ষরেও টের পাবেন না। কারণ ভাঙার যন্ত্রপাতি বিমানবন্দরের নিজস্ব। সেগুলো পুরাতন টার্মিনাস কার্গো বিভাগ থেকে সরাসরি রানওয়ে হয়ে মসজিদ পর্যন্ত যাতায়াত করবে। যশোহর রোড থেকে মসজিদের দূরত্ব কমবেশি প্রায় ৩ কিলোমিটার।