মালয়েশিয়ার একটি বিদেশি কর্মী নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের পরিচালকের দায়ের করা দুটি মানহানির মামলায় ক্ষতিপূরণ হিসেবে বিতর্কিত অভিবাসী অধিকারকর্মী অ্যান্ডি হলকে ৫ লাখ রিঙ্গিত পরিশোধের নির্দেশ দিয়েছেন জোহর বাহরু হাইকোর্ট। বাংলাদেশি মুদ্রায় এ অর্থের পরিমাণ প্রায় দেড় কোটি টাকা।
মালয়েশিয়ার বিচার বিভাগীয় কমিশনার নোরাদুরা হামজাহের দেওয়া রায়ে বলা হয়, এমবুন কারিসমা রিসোর্সেসের পরিচালক আর. মুথুসামি অ্যান্ডি হলের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছেন। মামলার শুনানিতে অ্যান্ডি হল আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য আদালতে উপস্থিত ছিলেন না।
দুটি মামলা একত্রে শুনানি হয়। এতে বাদী মুথুসামিই একমাত্র সাক্ষী হিসেবে আদালতে বক্তব্য দেন। শুনানি শেষে বিচার বিভাগীয় কমিশনার বলেন, মুথুসামির বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও ঘুষের অভিযোগগুলো গুরুতর হওয়ায় ক্ষতিপূরণের পরিমাণ নির্ধারণের ক্ষেত্রে বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া অ্যান্ডি হলকে মামলার খরচ বাবদ আরও ১ লাখ রিঙ্গিত পরিশোধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে মুথুসামিকে নিয়ে একই ধরনের মানহানিকর বক্তব্য প্রকাশ থেকে বিরত থাকতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি প্রধান মুদ্রণমাধ্যম এবং ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামে মুথুসামির কাছে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়ার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।
কী অভিযোগ ছিল অ্যান্ডি হলের বিরুদ্ধে?
২০২২ সালের ১২ এপ্রিল দায়ের করা প্রথম মামলায় মুথুসামি অভিযোগ করেন, অ্যান্ডি হল বিভিন্ন কোম্পানি, সরকারি বিভাগ ও এনজিওসহ অন্তত ৪০ জনকে একটি ই-মেইল পাঠান। ওই ই-মেইলে মুথুসামি তাকে ঘুষ দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন বলে অভিযোগ করা হয়।
মুথুসামির দাবি, ই-মেইলে অ্যান্ডি হল উল্লেখ করেন, তাকে চুপ করিয়ে দিতে বা ঘুষ দিতে কত অর্থ প্রয়োজন—এ বিষয়ে মুথুসামি খোঁজ নিয়েছিলেন। এ ঘটনায় ১৪ ফেব্রুয়ারি অ্যান্ডি হলকে আইনি নোটিশ পাঠানো হয় বলে মামলার নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
এরপর ১৭ ফেব্রুয়ারি ফোকাস মালয়েশিয়ায় প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে অ্যান্ডি হলের আরও একটি মন্তব্য প্রকাশিত হয় বলে অভিযোগ করেন মুথুসামি। দুটি মামলাতেই তার দাবি, অ্যান্ডি হলের বক্তব্যগুলো ছিল মিথ্যা ও ভিত্তিহীন এবং এতে তাকে অবৈধ ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
মুথুসামির অভিযোগ, এসব বক্তব্যের কারণে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তার সুনাম ক্ষুণ্ন হয়েছে।
অ্যান্ডি হলকে ঘিরে বিতর্ক
মালয়েশিয়ায় দীর্ঘদিন ধরে অ্যান্ডি হলের কর্মকাণ্ড নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। তার বিরুদ্ধে আগেও দেশটির আদালতে মামলা ও সাজা হওয়ার তথ্য রয়েছে।
এদিকে সম্প্রতি বাংলাদেশ সফরেও অ্যান্ডি হলের কর্মকাণ্ড নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশে এসে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরীর সঙ্গে সাক্ষাতের পর বাংলাদেশের বিরুদ্ধে মানহানিকর তথ্য ছড়ানোর অভিযোগও উঠেছে তার বিরুদ্ধে।
এ ছাড়া একটি বাংলাদেশি গণমাধ্যম, প্রকাশনা ও প্রতিবাদের বিরুদ্ধে মামলার হুমকি দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে অ্যান্ডি হলের বক্তব্য এই প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি।
অভিযোগ রয়েছে, মালয়েশিয়ায় সমস্যায় থাকা কিছু বাংলাদেশি কর্মীকেও তিনি বিভিন্নভাবে ব্যবহার করছেন। এ নিয়ে শ্রমিকদের অধিকার রক্ষার নামে কর্মস্থলে আন্দোলন, ধর্মঘটসহ নানা কর্মকাণ্ডে উসকানি দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে। তবে এসব অভিযোগও স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
প্রশ্ন উঠছে তার ভূমিকা নিয়ে
অ্যান্ডি হলের কর্মকাণ্ড নিয়ে এখন প্রশ্ন উঠছে—তিনি কি কেবল অভিবাসী শ্রমিকদের অধিকার রক্ষায় কাজ করছেন, নাকি তার কর্মকাণ্ডের পেছনে অন্য কোনো উদ্দেশ্য রয়েছে?
সমালোচকদের দাবি, মালয়েশিয়ায় শুধু বাংলাদেশি কর্মীরাই নন, ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, মিয়ানমারসহ বিভিন্ন দেশের অভিবাসী শ্রমিকরাও নানা সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন। কিন্তু এসব বিষয়ে অ্যান্ডি হলের ভূমিকা তুলনামূলকভাবে কম দৃশ্যমান—এমন অভিযোগ রয়েছে।
বাংলাদেশি কর্মীদের বিদেশে অভিবাসন ব্যয়, মধ্যপ্রাচ্যে কথিত ‘ফ্রি ভিসা’র নামে প্রতারণা এবং নারী গৃহকর্মীদের নির্যাতনের মতো বিষয়েও তার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সমালোচকেরা।
বিশেষ করে বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারকে ঘিরে নতুন করে সুযোগ তৈরি হলেও নানা বিতর্ক ও অভিযোগের কারণে সেই প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলে দাবি করছেন সংশ্লিষ্টদের কেউ কেউ।
তবে অ্যান্ডি হলের বিরুদ্ধে ওঠা এসব অভিযোগের সত্যতা এবং এর পেছনে কোনো সংগঠিত উদ্দেশ্য রয়েছে কি না, তা নির্ধারণের জন্য স্বাধীন ও নির্ভরযোগ্য তদন্ত প্রয়োজন। বর্তমানে নিশ্চিতভাবে বলা যায়, মালয়েশিয়ার আদালতের সাম্প্রতিক রায় অ্যান্ডি হলের কর্মকাণ্ডকে ঘিরে বিতর্কে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

ডেস্ক রিপোর্ট 























