বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে সাম্প্রতিক সময়ে একের পর এক বড় মাত্রার ভূমিকম্পের ঘটনা উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। রাশিয়ার কামচাটকা, জাপান, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন, চীন, আফগানিস্তানসহ মিয়ানমার ও ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলেও মাঝেমধ্যে শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানছে। প্রশ্ন হচ্ছে—কেন পৃথিবীর নির্দিষ্ট কিছু অঞ্চল বারবার ভূমিকম্পের কবলে পড়ে?
এর উত্তর লুকিয়ে আছে পৃথিবীর অভ্যন্তরীণ গঠন ও টেকটোনিক প্লেটের চলাচলের মধ্যে।
পৃথিবীর ভূত্বক কয়েকটি বিশাল টেকটোনিক প্লেটে বিভক্ত। এসব প্লেটের নিচে থাকা অপেক্ষাকৃত নরম স্তরের ওপর ভেসে থেকে ক্রমাগত ধীরগতিতে সরে যাচ্ছে। দুটি প্লেটের সীমানায় সংঘর্ষ, ঘর্ষণ বা একটি প্লেটের অন্যটির নিচে ঢুকে যাওয়ার সময় বিপুল শক্তি জমা হয়। সেই শক্তি হঠাৎ মুক্তি পেলেই সৃষ্টি হয় ভূমিকম্প।
রিং অব ফায়ার
ভূমিকম্পের সবচেয়ে সক্রিয় অঞ্চলগুলোর একটি প্রশান্ত মহাসাগরকে ঘিরে থাকা ‘রিং অব ফায়ার’। প্রায় ৪০ হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ এই বলয়ে বিশ্বের অধিকাংশ সক্রিয় আগ্নেয়গিরির অবস্থান। জাপান, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন, চিলি থেকে শুরু করে যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিম উপকূল পর্যন্ত বিস্তৃত এই অঞ্চলেই বিশ্বের অধিকাংশ ভূমিকম্প সংঘটিত হয়।
এখানে একাধিক টেকটোনিক প্লেটের সীমানা থাকায় সাবডাকশন বা একটি প্লেটের অন্যটির নিচে ঢুকে যাওয়ার প্রক্রিয়া নিয়মিত ঘটে। ফলে শক্তিশালী ভূমিকম্পের পাশাপাশি আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতও ঘটে।
ইন্দোনেশিয়া ও ফিলিপাইনের মতো দেশগুলো তাই অত্যন্ত ভূমিকম্পপ্রবণ। পাহাড়ি এলাকায় ভূমিকম্পের সঙ্গে ভূমিধসের ঝুঁকিও যুক্ত হয়।
হিমালয় বেল্টেও বড় ঝুঁকি
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চল হলো হিমালয় বেল্ট। পাকিস্তান থেকে শুরু করে ভারত, নেপাল, ভুটান হয়ে মিয়ানমার পর্যন্ত বিস্তৃত এই অঞ্চলের ভূমিকম্পের প্রধান কারণ ভারতীয় ও ইউরেশীয় টেকটোনিক প্লেটের সংঘর্ষ।
প্রায় পাঁচ কোটি বছর ধরে চলা এই সংঘর্ষের ফলেই হিমালয় পর্বতমালার সৃষ্টি। তবে প্লেটের সংঘর্ষ এখনো অব্যাহত রয়েছে। ভারতীয় প্লেট প্রতিবছর কয়েক সেন্টিমিটার করে উত্তর দিকে এগিয়ে ইউরেশীয় প্লেটের ওপর চাপ তৈরি করছে।
ফলে হিমালয় ও এর আশপাশের অঞ্চল ভূমিকম্পের জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল হয়ে রয়েছে।
বাংলাদেশ কেন ঝুঁকিতে?
এই ভূতাত্ত্বিক বাস্তবতা থেকে বাংলাদেশও পুরোপুরি নিরাপদ নয়। দেশের উত্তর, উত্তর-পূর্ব ও পূর্বাঞ্চল ভারতীয় প্লেট এবং বার্মা প্লেটের জটিল সংযোগ এলাকার কাছাকাছি।
বিশেষ করে সিলেট ও পার্বত্য চট্টগ্রামসহ দেশের পূর্বাঞ্চলে একাধিক সক্রিয় ভূতাত্ত্বিক কাঠামো রয়েছে। পাশাপাশি উত্তর-পূর্ব ভারতের আসাম ও মিয়ানমারে বড় ভূমিকম্পের ইতিহাস বাংলাদেশের ঝুঁকিকেও বাড়িয়ে দেয়।
তবে শুধু ভূমিকম্পের মাত্রাই ক্ষয়ক্ষতি নির্ধারণ করে না। ভবনের নির্মাণমান, জনঘনত্ব, মাটির ধরন এবং দুর্যোগ মোকাবিলার প্রস্তুতিও বড় ভূমিকা রাখে।
প্রতিরোধ নয়, প্রস্তুতিই ভরসা
ভূমিকম্পের সময় ও স্থান নির্ভুলভাবে আগাম পূর্বাভাস দেওয়ার প্রযুক্তি এখনো বিজ্ঞানীদের হাতে নেই। টেকটোনিক প্লেটের নড়াচড়া বন্ধ করাও সম্ভব নয়।
তাই ভূমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতি কমানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো প্রস্তুতি।
জাপান ও ইন্দোনেশিয়ার মতো ভূমিকম্পপ্রবণ দেশগুলো কঠোর ভবন নির্মাণবিধি, ভূমিকম্প সহনশীল অবকাঠামো এবং নিয়মিত মহড়ার মাধ্যমে ঝুঁকি মোকাবিলা করছে।
বাংলাদেশেও ভবন নির্মাণে নিরাপত্তা বিধি কঠোরভাবে বাস্তবায়ন, ঝুঁকিপূর্ণ ভবন চিহ্নিতকরণ, জনসচেতনতা বাড়ানো এবং জরুরি উদ্ধারব্যবস্থা শক্তিশালী করা জরুরি।
কারণ ভূমিকম্প ঠেকানো সম্ভব নয়। তবে সঠিক প্রস্তুতি ও নিরাপদ অবকাঠামোর মাধ্যমে এর ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতি অনেকটাই কমানো সম্ভব।

ডেস্ক রিপোর্ট 

























