মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) ছিলেন ক্ষমা, দয়া ও উদারতার অনন্য দৃষ্টান্ত। যারা তাঁর সঙ্গে অন্যায় করেছে, কষ্ট দিয়েছে কিংবা শত্রুতা করেছে—তাদের অনেককেই তিনি প্রতিশোধ না নিয়ে ক্ষমা করেছেন। তাঁর জীবনের এসব ঘটনা মানুষের জন্য আজও ক্ষমা ও সহনশীলতার বড় শিক্ষা। তায়েফে ইসলামের দাওয়াত দিতে গিয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.) চরম নির্যাতনের শিকার হন। তায়েফবাসী তাঁকে পাথর মেরে আহত করে। এ সময় তাঁর সঙ্গে থাকা হজরত জায়েদ ইবনে হারেছা (রা.) তাদের জন্য বদদোয়া করতে বলেছিলেন। এমনকি হযরত জিবরাইল (আ.) এসে তায়েফবাসীকে ধ্বংস করে দেওয়ার সুযোগের কথাও জানান। কিন্তু রাসুলুল্লাহ (সা.) তা প্রত্যাখ্যান করেন।
তিনি বদদোয়া না করে তাদের হেদায়েতের আশা করেন। আল্লাহ তাআলা তাঁর সম্পর্কে বলেন— ‘আর আমি আপনাকে বিশ্বজগতের জন্য রহমত হিসেবেই প্রেরণ করেছি।’
—সুরা আল-আম্বিয়া, আয়াত: ১০৭
ক্ষমা করার বিষয়ে আল্লাহ তাআলা আরও বলেন—
‘আপনি ক্ষমাশীলতা অবলম্বন করুন, সৎকাজের নির্দেশ দিন এবং অজ্ঞদের এড়িয়ে চলুন।’
—সুরা আল-আরাফ, আয়াত: ১৯৯
মক্কা বিজয়ের পরও প্রতিশোধ নেননি
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ক্ষমা ও উদারতার সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণগুলোর একটি মক্কা বিজয়ের ঘটনা। দীর্ঘদিন যারা তাঁর ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে শত্রুতা করেছে, মক্কা বিজয়ের পর তাদের ওপর প্রতিশোধ নেওয়ার সুযোগ তাঁর হাতে ছিল।
কিন্তু তিনি প্রতিশোধের পথ বেছে নেননি। বরং কুরাইশদের উদ্দেশে ক্ষমার ঘোষণা দেন। এতে বহু মানুষের হৃদয়ে পরিবর্তন আসে এবং তারা ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হয়।
অমুসলিমদের অধিকার রক্ষার নির্দেশ
রাসুলুল্লাহ (সা.) শুধু মুসলমানদের প্রতিই নয়, অমুসলিম নাগরিকদের অধিকার রক্ষার ব্যাপারেও কঠোর ছিলেন। হাদিসে এসেছে, কোনো মুসলিম যদি অমুসলিম নাগরিকের ওপর জুলুম করে, তার অধিকার নষ্ট করে বা তার সম্পদ জোর করে নিয়ে নেয়, তাহলে কিয়ামতের দিন রাসুলুল্লাহ (সা.) তার বিরুদ্ধে অবস্থান করবেন।
—সুনানে আবু দাউদ
মসজিদে ভুল করা ব্যক্তিকেও শিক্ষা দিয়েছেন কোমলভাবে
একবার এক বেদুইন মসজিদে প্রস্রাব করে ফেলেন। সাহাবিরা তাকে বাধা দিতে গেলে রাসুলুল্লাহ (সা.) তাদের থামিয়ে দেন। তিনি সেখানে এক বালতি পানি ঢেলে স্থানটি পরিষ্কার করার নির্দেশ দেন এবং কোমল আচরণের শিক্ষা দেন।
—সহিহ বুখারি
এ ঘটনা থেকে বোঝা যায়, ভুলের প্রতিকারে কঠোরতা নয়, বরং পরিস্থিতি বুঝে সুন্দরভাবে সংশোধন করাও ইসলামের শিক্ষা।
ক্ষমা করাকে মর্যাদার কাজ বলেছেন
হাদিসে ক্ষমার গুরুত্ব তুলে ধরে বলা হয়েছে, হজরত মুসা (আ.) আল্লাহর কাছে জানতে চেয়েছিলেন—কোন বান্দা তাঁর কাছে বেশি মর্যাদাবান? জবাবে বলা হয়, যে ব্যক্তি প্রতিশোধ নেওয়ার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও ক্ষমা করে দেয়।
—মিশকাতুল মাসাবিহ
অর্থাৎ, ক্ষমা দুর্বলতার পরিচয় নয়; বরং সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও প্রতিশোধ না নেওয়া একজন মুমিনের বড় গুণ।
১০ বছরেও কর্মচারীকে ধমক দেননি
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সেবক হযরত আনাস (রা.) বলেন, তিনি দীর্ঘ ১০ বছর রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর খেদমত করেছেন। এ সময়ে রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর কোনো কাজে বিরক্ত হয়ে ‘উহ’ শব্দটিও বলেননি। কোনো কাজ কেন করেছেন বা কেন করেননি—এমন অভিযোগও করেননি।
—সহিহ মুসলিম
মহানবী (সা.)-এর জীবনের এসব ঘটনা থেকে শিক্ষা পাওয়া যায়, ক্ষমা ও উদারতা মানুষের চরিত্রকে সুন্দর করে। প্রতিশোধ নেওয়ার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও ক্ষমা করা মহান চরিত্রের পরিচয়। তাই ব্যক্তিজীবন, পরিবার ও সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠায় রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ক্ষমা ও সহনশীলতার আদর্শ অনুসরণ করা গুরুত্বপূর্ণ।

ডেস্ক রিপোর্ট 

























