গণহত্যার নয় বছর পরও নিজ দেশে ফিরতে পারেননি লাখ লাখ রোহিঙ্গা। বরং বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে যাওয়া, শিবিরে জীবনযাত্রার অবনতি এবং প্রতিবেশী দেশগুলোতে জোরপূর্বক উচ্ছেদের কারণে আরও অনিশ্চয়তায় পড়েছেন তারা।
সোমবার মিয়ানমারে সংঘটিত রোহিঙ্গা গণহত্যার নবম বার্ষিকীতে কক্সবাজারে বিক্ষোভ করেছেন শত শত রোহিঙ্গা। তাদের দাবি—ন্যায়বিচার, নিরাপত্তা এবং পূর্ণ মর্যাদার সঙ্গে নিজেদের বাড়িঘরে ফেরার অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।
২০১৭ সালের আগস্টে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর ভয়াবহ দমন-পীড়নের মুখে সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেন। হত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতন ও গ্রাম জ্বালিয়ে দেওয়ার মতো গুরুতর অভিযোগ ওঠে মিয়ানমার বাহিনীর বিরুদ্ধে।
এর আগে বিভিন্ন দফায় দমন-পীড়নের কারণে আরও অনেক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছিলেন। বর্তমানে জাতিসংঘের হিসাবে বাংলাদেশে রোহিঙ্গা শরণার্থীর সংখ্যা প্রায় ১২ লাখ। তাদের অধিকাংশই কক্সবাজারের কুতুপালং ও নয়াপাড়া শিবিরে বসবাস করছেন। শরণার্থীদের ৭৫ শতাংশের বেশি নারী ও শিশু।
নাগরিকত্বহীন রোহিঙ্গারা
মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব দীর্ঘদিন ধরেই অস্বীকার করা হচ্ছে। ১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইনের পর তারা কার্যত রাষ্ট্রহীন জনগোষ্ঠীতে পরিণত হন। মিয়ানমার সরকার তাদের বাংলাদেশ থেকে যাওয়া অবৈধ অভিবাসী হিসেবে দাবি করে।
দেশটিতে বর্তমানে থাকা রোহিঙ্গাদের অধিকাংশই রাখাইন রাজ্যে বসবাস করেন। এই অঞ্চলটিই বাংলাদেশের সঙ্গে মিয়ানমারের সীমান্তবর্তী।
২০১৭ সালের সামরিক অভিযানে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে ব্যাপক হত্যাকাণ্ড ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ ওঠে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ও ডক্টরস উইদাউট বর্ডার্সসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা সেই সময় ব্যাপক প্রাণহানি ও গ্রাম ধ্বংসের তথ্য প্রকাশ করে।
এই ঘটনাকে গণহত্যা হিসেবে অভিহিত করেছে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ও দেশ। ২০১৯ সালে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে গণহত্যার মামলা করে গাম্বিয়া। মামলাটি এখনো বিচারাধীন।
সহায়তা সংকটে শরণার্থী শিবির
দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক সহায়তার ওপর নির্ভর করে টিকে আছেন কক্সবাজারের রোহিঙ্গারা। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে অর্থের সংকটে মানবিক সহায়তা কমে গেছে।
২০২৬ সালের সংশোধিত যৌথ প্রতিক্রিয়া পরিকল্পনায় রোহিঙ্গাদের জন্য ৭১০ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলারের সহায়তা চাওয়া হয়েছে, যা আগের তুলনায় কম। ফলে খাদ্য, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার মতো মৌলিক চাহিদা পূরণে চাপ তৈরি হয়েছে।
এরই মধ্যে বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচিও অর্থসংকটের কারণে রোহিঙ্গাদের খাদ্য সহায়তা কমাতে বাধ্য হয়েছে। এতে শিবিরগুলোতে খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রযাত্রায় রোহিঙ্গারা
মিয়ানমারের সহিংসতা ও শিবিরের কঠিন জীবন থেকে মুক্তি পেতে অনেক রোহিঙ্গা ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রযাত্রায় পা বাড়াচ্ছেন। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ছয় হাজার ৫০০-এর বেশি রোহিঙ্গা বঙ্গোপসাগর ও আন্দামান সাগর পাড়ি দেওয়ার চেষ্টা করেন। তাদের মধ্যে প্রায় ৯০০ জন মারা গেছেন বলে তথ্য রয়েছে।
ফলে শরণার্থী ও অভিবাসীদের বিভিন্ন সমুদ্রপথের মধ্যে রোহিঙ্গাদের এই যাত্রা বিশ্বের সবচেয়ে প্রাণঘাতী রুটগুলোর একটি হয়ে উঠেছে।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিলেও এখন দেশটির ওপরও চাপ বাড়ছে। মালয়েশিয়া ও ভারতেও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছেন। তবে বিভিন্ন সময়ে এসব দেশ থেকে রোহিঙ্গাদের জোরপূর্বক সরিয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
অন্যদিকে, রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফেরানোর বিষয়ে আন্তর্জাতিক চাপ থাকলেও বাস্তবে প্রত্যাবাসনের পথ এখনো স্পষ্ট নয়।
নবম গণহত্যা স্মরণ দিবসে ঢাকায় অবস্থিত যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা ও ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ ১৬টি কূটনৈতিক মিশন রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের অধিকারের পক্ষে যৌথ বিবৃতি দিয়েছে।
জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসও রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা সংকট এবং কমে যাওয়া মানবিক সহায়তা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন।
ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় রোহিঙ্গারা
রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধের বিচার চেয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত ও আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে পৃথক আইনি প্রক্রিয়া চলছে। তবে এখনো কোনো চূড়ান্ত রায় বা দৃশ্যমান বিচারিক নিষ্পত্তি হয়নি।
২০২০ সালে আন্তর্জাতিক বিচার আদালত মিয়ানমারকে রোহিঙ্গাদের সুরক্ষা এবং গণহত্যা প্রতিরোধে অস্থায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিল। কিন্তু প্রায় এক দশক পরও রোহিঙ্গাদের বড় প্রশ্নটি রয়ে গেছে—কবে ফিরতে পারবেন নিজেদের বাড়িতে?
রোহিঙ্গাদের দাবি, তারা ত্রাণের ওপর নির্ভর করে অনির্দিষ্টকাল শিবিরে থাকতে চান না। নাগরিকত্ব, নিরাপত্তা, অধিকার, মর্যাদা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করেই নিজ ভূমিতে ফিরতে চান তারা।

ডেস্ক রিপোর্ট 





















