ফিলিস্তিনের স্বাধীন ভূখণ্ড দখলের পরিধি বাড়াচ্ছে ইসরায়েল। যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজা উপত্যকায় প্রায় দুই দশক পর এবার প্রথম অবৈধ ইহুদি বসতি স্থাপনের আগ্রাসী পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে। পাশাপাশি অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইহুদি বসতি সম্প্রসারণের জন্য প্রায় ৪০ কোটি ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৪ হাজার ৯২৫ কোটি টাকা) অর্থায়নের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়েছেন দেশটির শীর্ষ মন্ত্রীরা।
শনিবার (১৮ জুলাই) ঘোষিত এই পরিকল্পনায় অধিকৃত অঞ্চলের ইসরায়েলি সামরিক কমান্ডার উগ্রপন্থি ও সহিংস বসতি স্থাপনকারী গোষ্ঠীগুলোকে সেনাবাহিনীর ‘নিরাপত্তা অংশীদার’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। এতে ফিলিস্তিনিদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও আতঙ্ক তৈরি হয়েছে।
ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ ঘোষণা করেছেন, তিনি উত্তর গাজায় তিনটি ‘নাহাল’ চৌকি স্থাপন করতে চান। নাহাল চৌকি মূলত এক ধরনের সামরিক বসতি, যা কয়েক দশক ধরে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরায়েলি বেসামরিক বসতি গড়ে তোলার প্রাথমিক পথ সুগম করে আসছে।
কাটজ ফিলিস্তিনিদের ব্যাপক স্থানান্তরের মাধ্যমে গাজা থেকে সম্পূর্ণ জাতিগত নির্মূলের পক্ষে নিজের অবস্থানের কথা পুনর্ব্যক্ত করে ইসরায়েলি চ্যানেল ১৪-কে বলেন, ইসরায়েল-অধিকৃত গাজার বেশিরভাগ অংশে ফিলিস্তিনিদের ঘরবাড়ি ও জনবসতির জায়গায় গড়ে ওঠা ধ্বংসস্তূপের বিরানভূমি দেখতে ‘ভালো লাগে’।
অধিকৃত ভূখণ্ডে ভূমি দখল পর্যবেক্ষণকারী ইসরায়েলি সংস্থা ‘কেরেম নাভোদ’-এর প্রতিষ্ঠাতা দ্রোর এতকেস জানান, ১৯৫০-এর দশকে গাজা ও ১৯৬৭ সাল থেকে পশ্চিম তীরে জর্ডান উপত্যকা বরাবর এই নাহাল ব্যবস্থার মাধ্যমেই প্রথম সামরিক ক্যাম্প করা হয়। তা পরবর্তীতে স্থায়ী বেসামরিক ইহুদি বসতিতে রূপ নেয়।
জার্মান সংবাদমাধ্যম ডয়চে ভেলের এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, বর্তমানে গাজা উপত্যকায় কোনো স্থায়ী বা বৈধ ইসরায়েলি বসতি নেই। ২০০৫ সালে ইসরায়েল গাজা থেকে তাদের ২১টি অবৈধ বসতি এবং সমস্ত সেনা প্রত্যাহার করে নিয়েছিল। তবে বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে ইসরায়েলের কিছু অতি-ডানপন্থি মন্ত্রী গাজা ভূখণ্ডে পুনরায় অবৈধ বসতি স্থাপনের জন্য প্রকল্প বা প্রস্তাবের পরিকল্পনা করছেন।
এদিকে কট্টরপন্থি অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচ অধিকৃত পশ্চিম তীরে নতুন ইসরায়েলি বসতি স্থাপনের জন্য ১.৩ বিলিয়ন শেকেল (প্রায় ৪০ কোটি মার্কিন ডলার) অর্থায়নের ঘোষণা দিয়েছেন। ইসরায়েলি গণমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, মন্ত্রিসভা গত মাসেই এই বিপুল অর্থ বরাদ্দ করলেও যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য তীব্র বিরোধিতার কারণে এই সিদ্ধান্তটি এতকাল সম্পূর্ণ গোপন রাখা হয়েছিল।
ইসরায়েলি মানবাধিকার গোষ্ঠী ‘পিস নাউ’-এর হাগিত ওফ্রান জানিয়েছেন, ভোটগ্রহণের দিন ঘনিয়ে আসার আগেই মাঠপর্যায়ে বাস্তব পরিস্থিতি তৈরি করতে অন্তত সাতটি বসতিতে বুলডোজার দিয়ে যুদ্ধকালীন তৎপরতায় কাজ চলছে। সরকার মূলত সরকারি কোষাগার লুট করতে এক বেপরোয়া দৌড়ে নেমেছে।
সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান বলছে, এই প্রকাশ্য ভূমি দখলের মাঝে নতুন বিতর্ক উস্কে দিয়েছেন পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বাহিনীর কমান্ডার মেজর জেনারেল আভি ব্লুথ। চরমপন্থি ও সহিংস ইহুদি ঘাঁটিগুলোর প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠন ‘ফার্মস অ্যাসোসিয়েশন’-এর এক সভায় তিনি বলেন, তিনি এই বসতি স্থাপনকারীদের কাজের প্রশংসা করেন এবং তাদের সেনাবাহিনীর নিরাপত্তা অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করেন।
এই চরমপন্থি ঘাঁটিগুলো ফিলিস্তিনিদের নিজেদের জমি ও বাড়িঘর থেকে বিতাড়িত করতে প্রতিনিয়ত সন্ত্রাসী অভিযান চালিয়ে আসছে। খোদ জাতিসংঘের মানবাধিকার কার্যালয়ের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘বসতি স্থাপনকারীদের এই সহিংসতা মূলত ইসরায়েলি রাষ্ট্রীয় সহিংসতারই অংশ।’
ইসরায়েলের এই প্রকাশ্য ইহুদি সন্ত্রাসবাদে মদদ দেওয়ার অভিযোগে দেশের দুজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও সকল নিরাপত্তা সংস্থার সাবেক প্রধানসহ বহু সামরিক-রাজনৈতিক অভিজাত ব্যক্তি বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি দিয়েছেন।
ইসরায়েলের ডেপুটি চিফ অব স্টাফ মেজর জেনারেল তামির ইয়াদাই একটি অন-ক্যামেরা ব্রিফিংয়ে জানিয়েছেন, ইসরায়েল এখন গাজা উপত্যকার প্রায় ৬৫ শতাংশ এলাকা নিজেদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রেখেছে। গত বছর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় হওয়া যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে গাজার যে ৫৩ শতাংশ এলাকা ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে থাকবে।
ইয়াদাই বড়াই করে বলেন, ‘যখন আপনি ভূখণ্ডের ৬৫ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করেন এবং এখানে ৭০ হাজারেরও বেশি সন্ত্রাসীকে হত্যা করেছেন, তখন একে বিজয় ছাড়া আর কী বলবেন!’
তবে ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সংকলিত ও ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী কর্তৃক মোটামুটি নির্ভুল বলে স্বীকৃত ৭৩ হাজারের বেশি নিহতের ডেটাবেস পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, নিহতদের মধ্যে ২১ হাজারের বেশি ছিল নিষ্পাপ শিশু। ১০ হাজারের বেশি নারী ও ৫ হাজারের বেশি প্রবীণ নাগরিক।
সামরিক কমান্ডারদের এই তথাকথিত ‘৭০ হাজার সন্ত্রাসী’ হত্যার পরিসংখ্যানে এই হাজার হাজার নারী ও শিশুকেও যুক্ত করা হয়েছে কি না, সে বিষয়ে সরাসরি কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ)। বর্তমানে যুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞ থেকে বেঁচে যাওয়া প্রায় ২০ লাখ ফিলিস্তিনি গাজার অবশিষ্ট মাত্র এক-তৃতীয়াংশ ভূখণ্ডে চরম মানবিক সংকটের মধ্যে গাদাগাদি করে দিন কাটাচ্ছেন।

ডেস্ক রিপোর্ট 


















