‘অপারেশন সিঁদুর’কে সামরিক সাফল্য হিসেবে তুলে ধরে ভারতের তৈরি তথ্যচিত্র নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে পাকিস্তান। দেশটির সামরিক বাহিনী বলেছে, বলিউড সিনেমার মতো নাটকীয়ভাবে ঘটনা উপস্থাপন করে যুদ্ধের প্রকৃত ফলাফল বদলে দেয়া যাবে না। বরং তথ্যচিত্রটি সামরিক পরাজয়কে সাফল্য হিসেবে দেখানোর একটি প্রচেষ্টা মাত্র। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে ভারত কোনও হামলা চালালে কঠোর জবাব দেয়ার হুঁশিয়ারিও দিয়েছে পাকিস্তান। ,সংবাদমাধ্যম জিও নিউজ বলছে, সোমবার (১৭ আগস্ট) পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর মিডিয়া উইং আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) এক বিবৃতিতে এসব কথা জানিয়েছে। আইএসপিআর বলেছে, ‘মার্কা–ই–হক’ সংঘর্ষের এক বছরেরও বেশি সময় পরও ভারত ‘কঠিন বাস্তবতার’ মুখোমুখি হতে চাইছে না। বরং ব্যর্থ অভিযানের পরাজয় স্বীকার না করে ইতিহাসকে নিজেদের পছন্দমতো উপস্থাপনের চেষ্টা করছে দেশটি।
ভারতীয় কনটেন্ট নির্মাতাদের তৈরি তথ্যচিত্রটিকে ‘অতিরিক্ত নাটকীয়, অতিরঞ্জিত এবং তথ্যগতভাবে ভুল’ বলেও আখ্যা দিয়েছে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর গণমাধ্যম শাখা। ওই তথ্যচিত্রে ভারতের রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্বের সাক্ষাৎকারও রাখা হয়েছে। আইএসপিআর বলেছে, তথ্যচিত্রটিতে গভীরতা ও ভারসাম্যের অভাব এতটাই বেশি যে এটিকে একই সঙ্গে ‘ট্র্যাজেডি ও কমেডি’ বলা যায়। নির্বাচিত অংশের সাক্ষাৎকার, আবেগঘন বর্ণনা এবং বলিউডের সিনেমার মতো দৃশ্যায়নের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত তথ্য বদলে অভিযানের ফলাফল নতুন করে তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে।
তথ্যচিত্রটিতে থাকা বিভিন্ন বক্তব্যের মধ্যে ‘মৌলিক অসঙ্গতি’ রয়েছে বলেও জানিয়েছে পাকিস্তানের সেনাবাহিনী। তাদের মতে, এতে দেশের মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য একটি নতুন বয়ান তৈরির বিলম্বিত প্রচেষ্টা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। আইএসপিআর বলেছে, তথ্যচিত্রটিতে পাকিস্তানের সেনাপ্রধানের ২০২৫ সালের ১৬ এপ্রিলের একটি বক্তব্যের সঙ্গে ২২ এপ্রিলের পেহেলগাম হামলার ইচ্ছাকৃত যোগসূত্র দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে। এটিকে ‘কোনও ভিত্তি ছাড়াই ষড়যন্ত্র তত্ত্ব দাঁড় করানো’ বলে মন্তব্য করেছে তারা। ভারত পরে দাবি করেছিল, পেহেলগাম হামলার তিন অভিযুক্তকে শনাক্ত করে ২০২৫ সালের ২৮ জুলাই হত্যা করা হয়েছে। অর্থাৎ কথিত ‘অপারেশন সিঁদুরের’ ৮২ দিন পর তাদের হত্যা করা হয়। কিন্তু তথ্যচিত্রে অপারেশন সিঁদুরকেই পেহেলগাম হামলার জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক অভিযান হিসেবে দেখানো হয়েছে।
পাকিস্তানের সেনাবাহিনী প্রশ্ন তুলেছে, ‘যদি কথিত হামলাকারীদের ২৮ জুলাই হত্যা করা হয়ে থাকে, তাহলে ৭ মে ভারত কাদের শাস্তি দেয়ার দাবি করছে?’ পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর গণমাধ্যম শাখা আরও বলেছে, ‘১০০ শতাংশ মিশন সফল’ হওয়ার দাবির সঙ্গেও সামরিক অভিযানের বাস্তব রেকর্ডের মিল নেই। তাদের দাবি, ‘মার্কা–ই–হক’ সংঘর্ষের সময় পাকিস্তানের সশস্ত্র বাহিনী ভারতের হামলা প্রতিহত করে আটটি সামরিক বিমান ভূপাতিত করেছিল। এরপর পাকিস্তান ‘অপারেশন বুনিয়ানুম মারসুস’ পরিচালনা করে। আইএসপিআরের দাবি, ওই অভিযানে ফাতাহ প্রিসিশন–গাইডেড রকেট ও ক্ষেপণাস্ত্র, পাকিস্তান বিমানবাহিনীর নির্ভুল আঘাত হানার অস্ত্র, দূরপাল্লার লইটারিং মিউনিশন ও কামান ব্যবহার করা হয়। এসব অস্ত্র দিয়ে পাকিস্তানের নাগরিকদের লক্ষ্যবস্তু করা এবং দেশটির বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে ব্যবহৃত ২৬টি সামরিক স্থাপনায় হামলা চালানো হয়।
আইএসপিআর বলেছে, তথ্যচিত্রের বক্তব্যই ভারতের নিরঙ্কুশ আধিপত্যের দাবিকে আরও দুর্বল করে। কারণ, এতে ভারতীয় সামরিক নেতৃত্ব পাকিস্তানের ব্যাপক ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও বিমান হামলা, নিয়ন্ত্রণরেখা বরাবর দীর্ঘ সময়ের সংঘর্ষ এবং ভারতের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় করার বিষয় স্বীকার করেছে। পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর গণমাধ্যম শাখা বলেছে, এসব স্বীকারোক্তির সঙ্গে পাকিস্তানকে ‘চূড়ান্তভাবে পরাজিত’ করার দাবির কোনও মিল নেই। যুদ্ধবিরতি কীভাবে হয়েছিল, সে বিষয়েও ভারতীয় তথ্যচিত্রের বক্তব্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে আইএসপিআর। তাদের দাবি, তথ্যচিত্রের বর্ণনাতেই বলা হয়েছে, দুই দেশের ডিরেক্টর জেনারেল অব মিলিটারি অপারেশনসের (ডিজিএমও) মধ্যে যোগাযোগের মাধ্যমে সামরিক অভিযান বন্ধের বিষয়ে সমঝোতা হয়েছিল।
আইএসপিআর বলেছে, ‘এটিই প্রমাণ করে যে অপারেশন সিঁদুরকে একতরফা ভারতীয় সামরিক বিজয় হিসেবে দেখানোর চেষ্টা সঠিক নয়। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় যুদ্ধ বন্ধ হওয়ার ঘটনাকে পরে নিঃশর্ত বিজয়ের প্রমাণ হিসেবে দেখানো যায় না।’ ভারতীয় তথ্যচিত্রে সংঘাতের বিস্তার নিয়েও পরস্পরবিরোধী বক্তব্য রয়েছে বলে জানিয়েছে পাকিস্তানের সেনাবাহিনী। ওই তথ্যচিত্রে একদিকে আকস্মিক হামলা, নিখুঁত আঘাত, ভূখণ্ডের গভীরে হামলা এবং সংঘাত বাড়ানোর ক্ষেত্রে আধিপত্যের কথা বলা হয়েছে। অন্যদিকে দাবি করা হয়েছে, ভারত ইচ্ছাকৃতভাবে সংঘাত সীমিত রেখেছিল এবং পাকিস্তানকে সরে আসার সুযোগ দিয়েছিল। পাকিস্তানের সেনাবাহিনী বলেছে, ‘এই পরস্পরবিরোধী দাবিগুলো প্রমাণ করে, ভারতীয় ওই তথ্যচিত্রটি নিরপেক্ষ সামরিক বিবরণ নয়; বরং দেশের মানুষের জন্য পরিকল্পিত একটি বয়ান’। তাদের ভাষ্য, ভারত সত্য প্রকাশ করেনি। বরং সামরিক ব্যর্থতাকে সফল অভিযান হিসেবে দেখাতে একটি প্রোপাগান্ডামূলক ভিডিও তৈরি করেছে।
পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর গণমাধ্যম শাখা আরও বলেছে, সিনেমার মতো দৃশ্যায়ন করে ইতিহাসের তথ্য বদলানো, বিমান হারানোর ঘটনা মুছে ফেলা, সামরিক হতাহতের তথ্য আড়াল করা কিংবা সংঘর্ষের বাস্তবতা পাল্টানো সম্ভব নয়। এসব করে যুদ্ধক্ষেত্রের পরাজয়কে নিজেদের ঘোষিত বিজয়ে পরিণত করা যাবে না। পাকিস্তানের সেনাবাহিনী বলেছে, ‘মার্কা–ই–হক’ নিয়ে পাকিস্তানের কোনও নতুন বয়ান তৈরির প্রয়োজন নেই। তাদের দাবি, সামরিক অভিযানের রেকর্ড, যুদ্ধক্ষেত্রের প্রমাণ, কূটনৈতিক যোগাযোগ এবং পরে ভারতের দেয়া বিভিন্ন বক্তব্যই সবকিছু স্পষ্ট করে এবং আন্তর্জাতিক মহলেও এগুলো ব্যাপকভাবে স্বীকৃত। একই সঙ্গে আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতার প্রতি পাকিস্তানের অঙ্গীকারও পুনর্ব্যক্ত করেছে পাকিস্তানের সেনাবাহিনী। তবে তারা বলেছে, দেশের সার্বভৌমত্ব, ভৌগোলিক অখণ্ডতা ও জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় পাকিস্তানের সশস্ত্র বাহিনী পুরোপুরি প্রস্তুত ও সক্ষম।
ভবিষ্যতে ভারত আবার কোনও সামরিক অভিযান চালালে তার ‘দৃঢ়, চূড়ান্ত ও অসমানুপাতিক’ জবাব দেয়া হবে বলে সতর্ক করেছে পাকিস্তানের সেনাবাহিনী। তারা বলেছে, সিনেমার মতো গল্প সাজিয়ে কোনোভাবেই ভারতের পরাজয়কে আড়াল করা যাবে না। প্রসঙ্গত, ২০২৫ সালের মে মাসে চার দিন ধরে পারমাণবিক শক্তিধর ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছিল। কাশ্মীরের পেহেলগামে পর্যটকদের ওপর প্রাণঘাতী হামলার কয়েক সপ্তাহ পর ৭ মে পাকিস্তানের ভেতরে হামলা চালায় ভারত। ওই হামলাকে কেন্দ্র করে ভারত ‘অপারেশন সিঁদুর’ শুরু করার কথা জানায়। জবাবে ‘অপারেশন বুনিয়ান–উন–মারসুস’ নামে ভারতে পাল্টা ব্যাপক হামলা চালায় পাকিস্তান। পরে ১০ মে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দিলে সংঘর্ষের অবসান ঘটে।

ডেস্ক রিপোর্ট 






















