এবার রংপুরের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী ও তার পরিবারের চার সদস্যকে হত্যার ঘটনায় গ্রেপ্তার দুজনকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে গ্রেপ্তার আসামি সিদ্ধার্থ দাসের পরনের শার্টের সঙ্গে রংপুর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) উপ–পুলিশ কমিশনার (ডিসি) সনাতন চক্রবর্তীর শার্টের মিল নিয়ে চলছে আলোচনা। এ বিষয়ে সোমবার (২৪ আগস্ট) রংপুর ডিবির ডিসি সনাতন চক্রবর্তী বলেন, শার্টটি দেশের স্বনামধন্য পোশাক ব্র্যান্ড আড়ংয়ের। তিনি নিজেও একই ধরনের শার্ট আড়ং থেকে কিনেছেন এবং দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহার করছেন। তিনি বলেন, এটা আড়ং কোম্পানির শার্ট। আমি আড়ং থেকে কিনেছিলাম। সম্ভবত রংপুর থেকেই কিনেছিলাম। দীর্ঘদিন ধরে আমি এই শার্ট পরে আসছি।
একই ধরনের শার্ট আসামির পরনে থাকায় প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তবে কেবল শার্টের মিলকে সন্দেহের ভিত্তি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই বলে জানান ডিবির এই কর্মকর্তা। এদিকে, মাত্র দুই ব্যক্তি কীভাবে একই পরিবারের চারজনকে হত্যা করতে পারে, তা নিয়েও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশ্ন উঠেছে। এ বিষয়ে সনাতন চক্রবর্তী বলেন, চারজনকে একসঙ্গে হত্যা করা হয়নি। তার ভাষ্য, প্রথমে দুইজন মিলে গণপতি চক্রবর্তীকে হত্যা করা হয়। এরপর তার স্ত্রীকে হত্যা করা হয়। পরে পর্যায়ক্রমে পরিবারের অন্য দুই সদস্যকে হত্যা করা হয়। তবে হত্যাকাণ্ডের তদন্ত এখনো পুরোপুরি শেষ হয়নি বলে জানান তিনি। তদন্ত শেষে বিস্তারিত তথ্য আদালতে উপস্থাপন করা হবে বলেও উল্লেখ করেন ডিবির ডিসি।
ঘটনাস্থলে কয়েক ঘণ্টা অবস্থান করার পর হত্যায় অভিযুক্তরা বাড়িটি অন্ধকার করার উদ্দেশ্যে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে বলে জানিয়েছে পুলিশ। সনাতন চক্রবর্তী বলেন, জিজ্ঞাসাবাদে আটক ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, তাদের কাছে একটি প্লায়ার্স ছিল। পাশের বাড়ির ছাদ ব্যবহার করে গণপতি চক্রবর্তীদের বাড়ির মিটারের কাছ থেকে বিদ্যুতের তার কেটে দেওয়া হয়। প্রাথমিকভাবে পুলিশ ধারণা করেছিল, বিদ্যুতের খুঁটি থেকে লাইন কাটা হয়েছিল। পরে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে দেখা যায়, খুঁটি থেকে নয়, মিটারের কাছ থেকেই তার কাটা হয়েছে। মরদেহের মুখ ঝলসানো বা কোনো রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহারের অভিযোগ নিয়েও আলোচনা চলছে। তবে প্রাথমিকভাবে এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি যে কেমিক্যাল ব্যবহার করে মরদেহের মুখ ঝলসানো হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
পুলিশের ভাষ্য, মরদেহ উদ্ধারের সময় ঘটনার প্রায় ৪২ থেকে ৪৪ ঘণ্টা পার হয়ে গিয়েছিল। এত সময় পর মৃতদেহে পচন প্রক্রিয়া শুরু হলে শরীরের ভেতরের তরল বিভিন্ন পথ দিয়ে বের হয়ে আসতে পারে। সনাতন চক্রবর্তী বলেন, ঘটনাস্থলে মুখের কাছে রক্তের মতো যে তরল দেখা গেছে, সেটি রক্ত না হয়ে মৃতদেহের শরীরের তরলও হতে পারে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। এ ছাড়া মৃত্যুর প্রায় ৩৬ ঘণ্টা বা তারও বেশি সময় পর মৃতদেহের ত্বকে ফোসকা বা ব্লিস্টার তৈরি হতে পারে। ফলে বাইরে থেকে দেখে মরদেহ পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে বা কোনো দাহ্য পদার্থ ব্যবহার করা হয়েছে বলে মনে হতে পারে। তবে কোনো রাসায়নিক বা দাহ্য পদার্থ ব্যবহার করা হয়েছিল কি না, তা নিশ্চিত হতে ফরেনসিক পরীক্ষার প্রতিবেদন প্রয়োজন বলে জানিয়েছেন তিনি।
নিহত দুই নারীকে ঘিরে যৌন নিপীড়নের অভিযোগের বিষয়েও প্রশ্ন উঠেছে। এ বিষয়ে ডিবির ডিসি বলেন, তদন্তে এখন পর্যন্ত যৌন নিপীড়নের কোনো নমুনা পাওয়া যায়নি। তবে ফরেনসিক পরীক্ষার প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার আগে বিষয়টি পুরোপুরি নাকচ করা যাচ্ছে না। এদিকে, নিহতদের ময়নাতদন্তকারী রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. বাবলু কিশোর বিশ্বাস জানিয়েছেন, প্রাথমিকভাবে গণপতি চক্রবর্তীসহ চারজনকেই শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছে বলে মনে হয়েছে। তবে ময়নাতদন্তের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন এবং অন্যান্য ফরেনসিক পরীক্ষার ফল পাওয়ার পর হত্যার ধরন সম্পর্কে আরও নিশ্চিতভাবে বলা যাবে। পুলিশ জানিয়েছে, হত্যাকাণ্ডে গ্রেপ্তার দুই ব্যক্তি রোববার আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। একই রাতে নিহতদের সৎকারও সম্পন্ন হয়েছে বলে জানিয়েছে গণপতি চক্রবর্তীর পরিবার।
রংপুর ডিবির ডিসি সনাতন চক্রবর্তী দাবি করেছেন, হত্যাকাণ্ডের পুরো ঘটনা পুলিশ প্রায় গুছিয়ে এনেছে। খুব দ্রুত মামলার অভিযোগপত্র আদালতে দেওয়া হবে বলেও জানিয়েছেন তিনি। এর আগে গত শনিবার রাতে রংপুর নগরীর দাসপাড়া–মাছুয়াপাড়া এলাকায় রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী, কন্যা ও পুত্রের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। পরে হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাস নামে দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশের দাবি, ওই দুজনই পর্যায়ক্রমে গণপতি চক্রবর্তী ও তার পরিবারের চার সদস্যকে হত্যা করেছেন। এখন তাদের দেওয়া জবানবন্দি, ময়নাতদন্ত এবং ফরেনসিক প্রতিবেদনের তথ্য মিলিয়ে হত্যাকাণ্ডের পুরো রহস্য নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে।

ডেস্ক রিপোর্ট 
























