ঢাকা , শনিবার, ২৯ অগাস্ট ২০২৬, ১৪ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম ::
ইউক্রেন যুদ্ধে কৌশলগত পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের কথা ভাবছেন পুতিন ভেনেজুয়েলার মজুদ ৬৫০০ কোটি ব্যারেল তেলের নিয়ন্ত্রণে যুক্তরাষ্ট্র আজাদ কাশ্মীরের নতুন প্রধানমন্ত্রী ইফতিখার গিলানি এসএসসির ফল পুনর্নিরীক্ষণে রেকর্ডসংখ্যক আবেদন নেপালের বন্যায় ভারতের জন্যও বড় সতর্কবার্তা ইউক্রেন যুদ্ধে প্রতি মাসে ৬ হাজার সেনা হারাচ্ছে রাশিয়া এবার অর্থনৈতিক সংকট সমাধানে মার্কিন ডলার বর্জনের ডাক দিলেন মোজতবা খামেনি সংসদে হাসনাতের বক্তব্য ঘিরে মধ্যরাতে উত্তাল ব্রাহ্মণবাড়িয়া, এনসিপির কর্মসূচি প্রতিহতের ঘোষণা যুদ্ধে ‘শেষ উপায়’ হিসেবে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের কথা ভাবছেন পুতিন অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ঐতিহাসিক জয়ের পর দেশে ফিরলেন টাইগাররা

একসঙ্গে নদীর পানিতে ডুবে মৃত্যু, পাশাপাশি কবরে ৫ শিশু

  • ডেস্ক রিপোর্ট
  • আপডেট সময় ১০:৩০:৩১ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৯ অগাস্ট ২০২৬
  • ১১ বার পড়া হয়েছে

দুপুরের আগে পর্যন্তও তাদের নিয়ে ছিল স্বাভাবিক ব্যস্ততা। কেউ ভাবেনি, কয়েক ঘণ্টা পর একই গ্রামের তিনটি পরিবারের উঠানে নেমে আসবে শোক। আর সন্ধ্যায় পাশাপাশি কবরে শায়িত হবে পাঁচ শিশু। গতকাল শুক্রবার (২৮ আগস্ট) দুপুরে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার দেবীনগর ইউনিয়নের চর চাকলা গ্রামের পাশ দিয়ে প্রবাহিত পদ্মার শাখামরা নদীতে গোসল করতে নেমেছিল ওই পাঁচ শিশু। এরপর পানিতে ডুবে তাদের মৃত্যু হয়। সন্ধ্যায় বাদ মাগরিব জানাজা শেষে একই গোরস্থানে পাশাপাশি কবরে দাফন করা হয়েছে তাদের। নিহত শিশুরা হলোমাসুদের দুই মেয়ে সুমাইয়া (১০) ও আরিবা (), নেমাজের দুই মেয়ে সুমি (১২) ও সুরাইয়া () এবং শরিফুলের একমাত্র মেয়ে শরীফা (১২)

স্থানীয়রা জানান, শুক্রবার হওয়ায় দুপুরে গ্রামের অধিকাংশ মানুষ জুমার নামাজে ছিলেন। এই সুযোগেই শিশুরা কাউকে না জানিয়ে নদীতে গোসল করতে যায়। দুপুর পৌনে ১টার দিকে পানিতে নামার কিছুক্ষণ পরই ঘটে বিপত্তি। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, শিশুদের কেউই সাঁতার জানতো না। একপর্যায়ে তারা পানিতে হাবুডুবু খেতে থাকে। তখন স্থানীয় এক নারী বিষয়টি দেখতে পান। শিশুদের পানিতে ছটফট করতে দেখে তিনি চিৎকার করে আশপাশের মানুষকে ডাকেন। তার চিৎকার শুনে ছুটে আসেন স্থানীয়রা। কোনো সরঞ্জামের অপেক্ষা না করে নিজেরাই নদীতে নেমে শুরু করেন উদ্ধার তৎপরতা। একপর্যায়ে পানির নিচ থেকে একে একে পাঁচ শিশুকেই তুলে আনেন তারা। কিন্তু ততক্ষণে নিভে গেছে পাঁচটি প্রাণ।

খবর পেয়ে ৯৯৯এ ফোন করা হলে ঘটনাস্থলে যায় পুলিশ। পরে আইনি প্রক্রিয়া শেষে মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। স্থানীয়দের কাছে নদীটিমরা নদীনামে পরিচিত হলেও বর্ষায় এর চেহারা বদলে যায়। এটি পদ্মা নদীর একটি শাখা। বছরের অন্য সময় নদীটিতে তেমন পানি থাকে না। অনেক সময় নদীর তলদেশ ও আশপাশের জমিতে চাষাবাদও করেন স্থানীয়রা। কিন্তু বর্ষা ও সাম্প্রতিক বৃষ্টিতে পদ্মার পানি বেড়ে যাওয়ায় নদীটিতে পানি জমে যায়। সেই পানিই শুক্রবার কেড়ে নিল পাঁচটি শিশুর প্রাণ। স্থানীয়রা জানান, চরাঞ্চলে পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যু নতুন কোনও ঘটনা নয়। বিশেষ করে বর্ষায় নদী, খাল ও জলাশয়ে পানির পরিমাণ বাড়লে বাড়ে ঝুঁকিও। অথচ এসব এলাকার শিশুদের সাঁতার শেখানোর কার্যকর কোনও ব্যবস্থা নেই। শুধু সাঁতার না জানাই নয়, দুর্গম চরাঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থাও বড় সংকট। দুর্ঘটনার পর দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছানো কিংবা আক্রান্তদের দ্রুত চিকিৎসাকেন্দ্রে নেওয়ার সুযোগও অনেক ক্ষেত্রে থাকে না।

তাই এমন মৃত্যু ঠেকাতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশুদের সাঁতার প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা, পাশাপাশি চরাঞ্চলে দ্রুত উদ্ধার ও জরুরি চিকিৎসা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা। শুক্রবার সন্ধ্যা ৭টা। চর চাকলা গোরস্থানে তখন আর কোনো স্বাভাবিক ব্যস্ততা নেই। জানাজার জন্য জড়ো হয়েছেন স্বজন, প্রতিবেশী ও গ্রামের মানুষ। কিছুক্ষণ পর পাঁচ শিশুর জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এরপর পাশাপাশি কবরে শায়িত করা হয় সুমাইয়া, আরিবা, সুমি, সুরাইয়া ও শরীফাকে। একই পাড়ার বাসিন্দা তারা। শুধু প্রতিবেশী নয়পরস্পরের আত্মীয়ও। তাই পাঁচ শিশুর মৃত্যু যেন একসঙ্গে কাঁদিয়েছে পুরো চর চাকলা গ্রামকে। যে পাঁচ শিশু দুপুরে একসঙ্গে নদীতে নেমেছিল, কয়েক ঘণ্টা পর তাদের শেষ ঠিকানাও হলো পাশাপাশি। চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর মডেল থানার ওসি একরামুল হোসেন বলেন, ৯৯৯এর মাধ্যমে খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাটি জানতে পারে। আনুমানিক দুপুর ১টার দিকে শিশুরা নদীতে গোসল করতে নামে। স্থানীয় এক নারী তাদের পানিতে হাবুডুবু খেতে দেখে আশপাশের লোকজনকে ডাকেন। পরে স্থানীয়রা তাদের উদ্ধার করেন।

পুলিশ জানিয়েছে, নিহত পাঁচ শিশুর বয়স ৮ থেকে ১২ বছরের মধ্যে। তারা একই পাড়ায় বসবাস করত এবং পরস্পরের আত্মীয়। দেবীনগর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. হাফিজুর রহমান জানান, শুক্রবার সন্ধ্যায় পাঁচ শিশুকে পাশাপাশি কবরে দাফন করা হয়েছে। ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মারুফ আফজাল রাজন। তিনি জানান, নিহতদের স্বজনদের আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে। তবে তিনটি পরিবারকে দেওয়া এই সহায়তা তাদের স্বজন হারানোর ক্ষত কতটা পূরণ করতে পারবে, সেই উত্তর হয়তো কারও জানা নেই। শুক্রবার দুপুরে যে নদীর পানিতে পাঁচ শিশু নেমেছিল, সন্ধ্যার পর সেই নদীর পাড়েই নেমে এসেছে নীরবতা। আর চর চাকলার তিনটি পরিবারে শুরু হয়েছে এমন এক শোকের অধ্যায়, যার শেষ নেই।

ট্যাগস

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

জনপ্রিয় সংবাদ

ইউক্রেন যুদ্ধে কৌশলগত পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের কথা ভাবছেন পুতিন

একসঙ্গে নদীর পানিতে ডুবে মৃত্যু, পাশাপাশি কবরে ৫ শিশু

আপডেট সময় ১০:৩০:৩১ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৯ অগাস্ট ২০২৬

দুপুরের আগে পর্যন্তও তাদের নিয়ে ছিল স্বাভাবিক ব্যস্ততা। কেউ ভাবেনি, কয়েক ঘণ্টা পর একই গ্রামের তিনটি পরিবারের উঠানে নেমে আসবে শোক। আর সন্ধ্যায় পাশাপাশি কবরে শায়িত হবে পাঁচ শিশু। গতকাল শুক্রবার (২৮ আগস্ট) দুপুরে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার দেবীনগর ইউনিয়নের চর চাকলা গ্রামের পাশ দিয়ে প্রবাহিত পদ্মার শাখামরা নদীতে গোসল করতে নেমেছিল ওই পাঁচ শিশু। এরপর পানিতে ডুবে তাদের মৃত্যু হয়। সন্ধ্যায় বাদ মাগরিব জানাজা শেষে একই গোরস্থানে পাশাপাশি কবরে দাফন করা হয়েছে তাদের। নিহত শিশুরা হলোমাসুদের দুই মেয়ে সুমাইয়া (১০) ও আরিবা (), নেমাজের দুই মেয়ে সুমি (১২) ও সুরাইয়া () এবং শরিফুলের একমাত্র মেয়ে শরীফা (১২)

স্থানীয়রা জানান, শুক্রবার হওয়ায় দুপুরে গ্রামের অধিকাংশ মানুষ জুমার নামাজে ছিলেন। এই সুযোগেই শিশুরা কাউকে না জানিয়ে নদীতে গোসল করতে যায়। দুপুর পৌনে ১টার দিকে পানিতে নামার কিছুক্ষণ পরই ঘটে বিপত্তি। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, শিশুদের কেউই সাঁতার জানতো না। একপর্যায়ে তারা পানিতে হাবুডুবু খেতে থাকে। তখন স্থানীয় এক নারী বিষয়টি দেখতে পান। শিশুদের পানিতে ছটফট করতে দেখে তিনি চিৎকার করে আশপাশের মানুষকে ডাকেন। তার চিৎকার শুনে ছুটে আসেন স্থানীয়রা। কোনো সরঞ্জামের অপেক্ষা না করে নিজেরাই নদীতে নেমে শুরু করেন উদ্ধার তৎপরতা। একপর্যায়ে পানির নিচ থেকে একে একে পাঁচ শিশুকেই তুলে আনেন তারা। কিন্তু ততক্ষণে নিভে গেছে পাঁচটি প্রাণ।

খবর পেয়ে ৯৯৯এ ফোন করা হলে ঘটনাস্থলে যায় পুলিশ। পরে আইনি প্রক্রিয়া শেষে মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। স্থানীয়দের কাছে নদীটিমরা নদীনামে পরিচিত হলেও বর্ষায় এর চেহারা বদলে যায়। এটি পদ্মা নদীর একটি শাখা। বছরের অন্য সময় নদীটিতে তেমন পানি থাকে না। অনেক সময় নদীর তলদেশ ও আশপাশের জমিতে চাষাবাদও করেন স্থানীয়রা। কিন্তু বর্ষা ও সাম্প্রতিক বৃষ্টিতে পদ্মার পানি বেড়ে যাওয়ায় নদীটিতে পানি জমে যায়। সেই পানিই শুক্রবার কেড়ে নিল পাঁচটি শিশুর প্রাণ। স্থানীয়রা জানান, চরাঞ্চলে পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যু নতুন কোনও ঘটনা নয়। বিশেষ করে বর্ষায় নদী, খাল ও জলাশয়ে পানির পরিমাণ বাড়লে বাড়ে ঝুঁকিও। অথচ এসব এলাকার শিশুদের সাঁতার শেখানোর কার্যকর কোনও ব্যবস্থা নেই। শুধু সাঁতার না জানাই নয়, দুর্গম চরাঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থাও বড় সংকট। দুর্ঘটনার পর দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছানো কিংবা আক্রান্তদের দ্রুত চিকিৎসাকেন্দ্রে নেওয়ার সুযোগও অনেক ক্ষেত্রে থাকে না।

তাই এমন মৃত্যু ঠেকাতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশুদের সাঁতার প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা, পাশাপাশি চরাঞ্চলে দ্রুত উদ্ধার ও জরুরি চিকিৎসা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা। শুক্রবার সন্ধ্যা ৭টা। চর চাকলা গোরস্থানে তখন আর কোনো স্বাভাবিক ব্যস্ততা নেই। জানাজার জন্য জড়ো হয়েছেন স্বজন, প্রতিবেশী ও গ্রামের মানুষ। কিছুক্ষণ পর পাঁচ শিশুর জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এরপর পাশাপাশি কবরে শায়িত করা হয় সুমাইয়া, আরিবা, সুমি, সুরাইয়া ও শরীফাকে। একই পাড়ার বাসিন্দা তারা। শুধু প্রতিবেশী নয়পরস্পরের আত্মীয়ও। তাই পাঁচ শিশুর মৃত্যু যেন একসঙ্গে কাঁদিয়েছে পুরো চর চাকলা গ্রামকে। যে পাঁচ শিশু দুপুরে একসঙ্গে নদীতে নেমেছিল, কয়েক ঘণ্টা পর তাদের শেষ ঠিকানাও হলো পাশাপাশি। চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর মডেল থানার ওসি একরামুল হোসেন বলেন, ৯৯৯এর মাধ্যমে খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাটি জানতে পারে। আনুমানিক দুপুর ১টার দিকে শিশুরা নদীতে গোসল করতে নামে। স্থানীয় এক নারী তাদের পানিতে হাবুডুবু খেতে দেখে আশপাশের লোকজনকে ডাকেন। পরে স্থানীয়রা তাদের উদ্ধার করেন।

পুলিশ জানিয়েছে, নিহত পাঁচ শিশুর বয়স ৮ থেকে ১২ বছরের মধ্যে। তারা একই পাড়ায় বসবাস করত এবং পরস্পরের আত্মীয়। দেবীনগর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. হাফিজুর রহমান জানান, শুক্রবার সন্ধ্যায় পাঁচ শিশুকে পাশাপাশি কবরে দাফন করা হয়েছে। ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মারুফ আফজাল রাজন। তিনি জানান, নিহতদের স্বজনদের আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে। তবে তিনটি পরিবারকে দেওয়া এই সহায়তা তাদের স্বজন হারানোর ক্ষত কতটা পূরণ করতে পারবে, সেই উত্তর হয়তো কারও জানা নেই। শুক্রবার দুপুরে যে নদীর পানিতে পাঁচ শিশু নেমেছিল, সন্ধ্যার পর সেই নদীর পাড়েই নেমে এসেছে নীরবতা। আর চর চাকলার তিনটি পরিবারে শুরু হয়েছে এমন এক শোকের অধ্যায়, যার শেষ নেই।