দীর্ঘ ১৮ বছর নিখোঁজ থাকার পর অবশেষে নিজ গ্রামের বাড়িতে ফিরেছেন বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার চরদুয়ানী ইউনিয়নের ছোট টেংরা গ্রামের বাসিন্দা আলমগীর হাওলাদার। তবে যে পরিবারের কাছে ফিরে আসার স্বপ্ন তিনি এতদিন লালন করেছিলেন, সেখানে আর নেই তার বাবা-মা, স্ত্রী কিংবা একমাত্র মেয়ে। ফিরে এসে তিনি দাবি করেছেন, ২০০৮ সালে ঢাকার পোস্তগোলা এলাকা থেকে তাকে অপহরণ করে একটি অজ্ঞাত স্থানে আটকে রেখে বছরের পর বছর জোরপূর্বক শ্রম করানো হয়েছে।
স্থানীয় ও পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, জীবিকার তাগিদে ২০০৮ সালে স্ত্রী আমেনা বেগম ও ছোট মেয়ে খাদিজাকে নিয়ে ঢাকায় পাড়ি জমান আলমগীর। তিনি দৈনিক শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন এবং তার স্ত্রী একটি পোশাক কারখানায় চাকরি করতেন। ওই বছরের নভেম্বর মাসে কাজের সন্ধানে বের হওয়ার পর থেকেই নিখোঁজ হন তিনি।
আলমগীরের দাবি, সেদিন একটি মাইক্রোবাসে তুলে তার হাত-পা ও চোখ বেঁধে অজ্ঞাত একটি উঁচু দেয়ালঘেরা স্থাপনায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তার মতো আরও প্রায় ৩০ জনকে আটকে রেখে প্রতিদিন কঠোর পরিশ্রম করানো হতো। বিনিময়ে কোনো বেতন দেওয়া হতো না, এমনকি পর্যাপ্ত খাবারও মিলত না। পাতলা ডাল ও আলু ভর্তাই ছিল তাদের প্রধান খাবার।
এদিকে দীর্ঘদিন কোনো খোঁজ না পেয়ে আলমগীরের স্ত্রী অন্যত্র বিয়ে করে নতুন সংসার শুরু করেন। একমাত্র মেয়ে খাদিজা বাবার অনুপস্থিতিতে মানুষের বাড়িতে কাজ করে বড় হয়েছেন। পরবর্তীতে তারও বিয়ে হয়েছে। তবে মেয়ের বর্তমান অবস্থান সম্পর্কে কিছুই জানেন না আলমগীর।
অপেক্ষার প্রহর গুনতে গুনতে প্রায় পাঁচ বছর আগে মারা যান আলমগীরের বাবা-মা। ছেলের ফিরে আসার খবর তারা আর জেনে যেতে পারেননি। বর্তমানে তার এক ভাই রয়েছেন, যিনি নিজ পরিবার নিয়ে আলাদা বসবাস করছেন।
আলমগীর জানান, গত ২৮ জুলাই গভীর রাতে ঢাকার পোস্তগোলা ব্রিজের পাশে তাকে এবং আরও প্রায় ৩০ জনকে চোখ বাঁধা অবস্থায় ফেলে রেখে যায় দুর্বৃত্তরা। পরে এক ব্যক্তি তাকে এক দিনের জন্য বালুবাহী জাহাজে ৫০০ টাকা মজুরিতে কাজ দেন। সেই টাকায় কোনো রকমে নিজ গ্রাম পাথরঘাটায় ফিরে আসেন তিনি।
২৯ জুলাই বাড়িতে পৌঁছানোর পর স্বজন ও এলাকাবাসীর মধ্যে আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়। দীর্ঘদিন পর হারিয়ে যাওয়া মানুষকে ফিরে পেয়ে অনেকেই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন।
কীভাবে মুক্তি পেলেন—এমন প্রশ্নের জবাবে আলমগীর দাবি করেন, সরকার পরিবর্তনের পর অপহরণকারীরা নিজেদের নিরাপত্তার আশঙ্কায় তাদের ছেড়ে দিয়েছে।
স্থানীয়রা জানান, দীর্ঘদিন নিখোঁজ থাকায় আলমগীরকে মৃত ধরে বিভিন্ন সময়ে তার জন্য মিলাদ, দোয়া মাহফিল এবং কাঙালি ভোজের আয়োজনও করা হয়েছিল।
বিএনপির সাবেক পাথরঘাটা উপজেলা যুগ্ম আহ্বায়ক মোহাম্মদ বদিউজ্জামান সাহেদ বলেন, প্রায় ১৮ বছর নিখোঁজ থাকার পর আলমগীর ফিরে এসেছেন। তিনি অভিযোগ করছেন, এতদিন তাকে আটকে রেখে জোরপূর্বক শ্রম করানো হয়েছে। অসুস্থ অবস্থায় তাকে পাথরঘাটা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। চিকিৎসা শেষে শুক্রবার তাকে বাড়িতে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে।
তবে আলমগীরের অপহরণ, দীর্ঘদিন আটকে রেখে শ্রম করানো এবং মুক্তির বিষয়ে তার দেওয়া বক্তব্যের স্বাধীন বা সরকারি কোনো আনুষ্ঠানিক যাচাইয়ের তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি। বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্তের পর প্রকৃত ঘটনা জানা যাবে।

ডেস্ক রিপোর্ট 






















