মাত্র তিনটি শব্দ—‘চলে আসুন ষোলশহর’।
২০২৪ সালের ১৬ জুলাই বিকেলে ফেসবুকে দেওয়া এই ছোট্ট পোস্টই পরে চট্টগ্রামের আন্দোলনের সবচেয়ে আলোচিত প্রতীক হয়ে ওঠে। আর সেই পোস্টের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই গুলিতে প্রাণ হারান পোস্টদাতা, চট্টগ্রাম কলেজের শিক্ষার্থী ও ছাত্রদল নেতা মো. ওয়াসিম আকরাম।
২০২৪ সালের জুলাইয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন যখন চট্টগ্রামে গতি পাচ্ছিল, তখন ইন্টারনেট সীমিত হয়ে যাওয়ায় আন্দোলনকারীদের ভরসা ছিল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ছোট ছোট বার্তা। ঠিক এমন সময় বিকেল ৩টার দিকে ওয়াসিম ফেসবুকে লেখেন—‘চলে আসুন ষোলশহর’।
এই আহ্বান মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে। শত শত শিক্ষার্থী ও তরুণ আন্দোলনের নির্ধারিত স্থানে জড়ো হতে শুরু করেন। কিন্তু পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়। ষোলশহর থেকে আন্দোলনের কেন্দ্র সরে যায় মুরাদপুরে। সেখানেই শুরু হয় সংঘর্ষ।
সহযোদ্ধাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ওয়াসিম নিজেও মিছিলে ছিলেন। একপর্যায়ে শিক্ষা বোর্ড এলাকার কাছে গুলিবিদ্ধ হন তিনি। দ্রুত চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলেও বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
মৃত্যুর কয়েক ঘণ্টা আগেই ওয়াসিম আরেকটি ফেসবুক স্ট্যাটাসে লিখেছিলেন—
‘সাধারণ শিক্ষার্থীদের পাশে আমার প্রাণের সংগঠন, আমি এই পরিচয়ে শহিদ হব।’
পরে এই কথাগুলোও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে।
সহযোদ্ধারা জানান, সংঘর্ষের সময় অন্যদের নিরাপদে সরে যাওয়ার সুযোগ করে দিতে গিয়ে পেছনে থেকে যান ওয়াসিম। সেই সময়ই তিনি গুলিবিদ্ধ হন।
ওয়াসিমের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর চট্টগ্রামজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে ক্ষোভ। পরদিন থেকেই মুরাদপুর, ষোলশহর, বহদ্দারহাটসহ বিভিন্ন এলাকায় আন্দোলন আরও বিস্তৃত হয়। অনেকের মতে, ওয়াসিমের মৃত্যু চট্টগ্রামের আন্দোলনে নতুন গতি এনে দেয়।
এ ঘটনায় ২০২৪ সালের ১৮ আগস্ট ওয়াসিমের মা জোছনা বেগম হত্যা মামলা দায়ের করেন। পরে জুলাই-আগস্টের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালেও পৃথক মামলা হয়। বর্তমানে দুটি মামলার বিচারিক কার্যক্রম চলমান।
কক্সবাজারের পেকুয়ার ছেলে ওয়াসিম আকরাম শুধু আন্দোলনের একজন কর্মীই ছিলেন না, ছিলেন একজন মেধাবী শিক্ষার্থীও। চট্টগ্রাম কলেজের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অনার্স পরীক্ষায় তিনি প্রথম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হন। তবে সেই ফল প্রকাশিত হয় তার মৃত্যুর পর।
দুই বছর পেরিয়ে গেলেও ‘চলে আসুন ষোলশহর’—এই তিনটি শব্দ আজও চট্টগ্রামের আন্দোলনের ইতিহাসে সাহস, প্রতিরোধ এবং আত্মত্যাগের এক অবিস্মরণীয় প্রতীক হয়ে আছে।

ডেস্ক রিপোর্ট 
























