ঢাকা , মঙ্গলবার, ০৭ জুলাই ২০২৬, ২৩ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম ::
এই সরকার জনগণের সঙ্গে গাদ্দারি করছে: নাহিদ ইসলাম ৪ হাজার কোটি টাকা ঘুষ নেওয়ায় সরকারি কর্মকর্তার মৃত্যুদণ্ড দিল চীন এনসিপির সমাবেশে বিস্ফোরণ, গ্রেপ্তারদের রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে চাঞ্চল্য বিশ্বকাপে নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকিতে ইংল্যান্ডের ৪ ফুটবলার ফিলিস্তিনিদের জন্য যার অনুভূতি নেই, সে মানুষ নয়: মিশর কোচ প্রশ্নপত্র ফাঁসের সাজা ৫ বছরের কারাদণ্ড, সংসদে বিল পাস বাউফলে কোটি টাকার সেতু উদ্বোধনের আগেই ধ্বস আ.লীগের রেখে যাওয়া ভঙ্গুর অর্থনীতি মোকাবিলাই বড় চ্যালেঞ্জ: তথ্যমন্ত্রী এনসিপির সমাবেশে বিস্ফোরণ,  যুবলীগ নেতাসহ গ্রেপ্তার ২ মারা গেলেন আফগানিস্তানের সাবেক পেসার শাপুর জাদরান

বাংলাদেশের পর নেপালের সরকার পতনে দুশ্চিন্তা বাড়ল ভারতের

  • ডেস্ক রিপোর্ট
  • আপডেট সময় ০২:১৬:৫৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৫
  • ২২২ বার পড়া হয়েছে

এবার জেন-জির তীব্র আন্দোলনে বাংলাদেশের পর নেপালে সরকার পরিবর্তনের ঘটনা প্রতিবেশী ভারতের জন্য গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেকটা নির্ঘুম রাত কাটছে দেশটির। কাঠমান্ডুর এই অস্থিতিশীলতা দিল্লির নিরাপত্তা ও কৌশলগত স্বার্থের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করছে সাউথ ব্লক। ঢাকার পর সেখানেও আধিপত্য ইস্যুতে চরম বিপর্যয়ের মুখে মোদি সরকার। চিকেন নেকের উভয় পাশে আধিপত্য হারানোয় অজানা আতঙ্ক তাড়া করছে ভারতীয়দের। এছাড়া প্রতিবেশী বাংলাদেশ ও নেপালের অনুকরণে হিন্দুত্ববাদী বিজেপির অপশাসন, দুর্নীতি, ভোট চুরি, বিরোধী মত ও সাম্প্রদায়িক দমন পীড়ন এবং কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতার বিরুদ্ধেও যেকোনো মুহূর্তে জেন-জি তরুণদের পুঞ্জিভূত ক্ষোভের বিস্ফোরণের আশঙ্কা করা হচ্ছে।

এদিকে, গণবিক্ষোভের মুখে প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা অলির পদত্যাগ ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের মধ্যেও গভীর হতাশার সৃষ্টি করেছে। এর কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে, হাসিনা আজীবন দিল্লির নিঃস্বার্থ সেবা করতে গিয়ে ভারত ও আওয়ামী লীগের স্বার্থকে একাকার করে ফেলেছে। তাই পৃথিবীতে কোথাও ভারত বিপদগ্রস্ত হলে তাতে সমানভাবে বা তারচেয়েও বেশি ব্যথিত হয় ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ, যেমটন হয়েছে আমেরিকা ও ট্রাম্পের সাথে সম্পর্কের টানাপড়নের ক্ষেত্রে। এছাড়াও, বাংলাদেশে অভ্যুত্থানের মুখে হাসিনার পলায়নের পর জনরোষ থেকে বাঁচতে ভারতের পাশাপাশি নেপালেও আশ্রয় নিয়েছে দলটির অনেক নেতাকর্মী। ফলে তারা নতুন করে এক অস্থিরতার মুখে পড়েছে। তাদের জন্য এ যেন ‘পানিতে কুমির ডাঙ্গায় বাঘ’ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। যা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে সামাজিক মাধ্যমে।

ইন্ডিয়া টুডের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, নেপাল ভারতের জন্য কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে এটি দ্বিতীয় দেশ যেখানে গত এক বছরে রাজনৈতিক অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে, একটি ছাত্র বিক্ষোভ শেখ হাসিনার সরকারকে উৎখাতের জন্য একটি ব্যাপক আন্দোলনে রূপান্তরিত হয়। হাসিনাকে ভারতপন্থী নেত্রী হিসেবে বিবেচনা করা হত।বাংলাদেশের মতো, নেপালও রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তারের জন্য বিভিন্ন বহিরাগত শক্তির মধ্যে টানাপোড়েন প্রত্যক্ষ করছে। নেপালের সরকার পতনের পেছনে ছিল ‘জেন-জি’ তরুণদের ব্যাপক বিক্ষোভ এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে তাদের তীব্র আন্দোলনক। এই আন্দোলনের মূল দাবি ছিল প্রধানমন্ত্রী অলির পদত্যাগ এবং রাজনৈতিক সংস্কার। বাংলাদেশের পর এই আন্দোলন যেভাবে দ্রুত গতিতে সরকারের পতন ঘটিয়েছে, তা দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশগুলোর জন্য একটি উদাহরণ হয়ে উঠেছে, যেখানে জনগণের অসন্তোষ ও বিক্ষোভের মুখে সরকার ব্যবস্থা ভেঙে পড়তে পারে।

বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের সঙ্গে নেপালের পরিস্থিতির কিছু সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়ায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ ও তার দোসরদের মধ্যে এক ধরনের হতাশা দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে, গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে সরকারের পতন এবং তরুণ প্রজন্মের প্রতিবাদী ভূমিকা বাংলাদেশ থেকে উৎসাহিত হয়েছে বলে বলা হচ্ছে।

ভারতীয় গণমাধ্যমে প্রতিবেদনে বলা হয়, নেপালের বিক্ষোভকারীদের নিয়ন্ত্রণ কে করছে সে সম্পর্কে সবারই একটা তত্ত্ব উঠে আসছে। কেউ কেউ বলছেন অলি চীনপন্থী, কেউ কেউ বাংলাদেশের মতো মার্কিন ভূমিকা দেখছেন, আবার কেউ কেউ বলছেন ওয়াশিংটনের এমসিসি বিনিয়োগের কারণে বেইজিং বিক্ষোভে ইন্ধন জোগাচ্ছে। আবার কেউ কেউ নেপালি নেপো শিশুদের বিরুদ্ধে জেন-জি আন্দোলনকে রাজতন্ত্রপন্থী আন্দোলনকারীদের সাথে যুক্ত করেছেন, যাদের ভারতপন্থী হিসেবেও দেখা হয়।চীনের বিআরআই এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এমসিসি অর্থায়নের কারণে নেপাল এমন একটি ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে যেখানে আন্তর্জাতিক স্বার্থ সংঘাতের মুখে পড়েছে।

প্রসঙ্গত, ভারত ও নেপালের মধ্যে প্রায় ১,৭৫১ কিলোমিটার দীর্ঘ উন্মুক্ত সীমান্ত রয়েছে। তাই নেপালে যেকোনো ধরনের রাজনৈতিক অস্থিরতা ভারতের সীমান্ত নিরাপত্তার জন্য সরাসরি হুমকি হিসেবে দেখে ভারত। ভারতীয় গণমাধ্যম বলছে, নেপাল ও বাংলাদেশ উভয়ই ভারতের প্রতিবেশী এবং এই দুটি দেশের ওপর চীনের প্রভাব দিন দিন বাড়ছে। বিশেষ করে, নেপালে যখনই রাজনৈতিক অস্থিরতা দেখা দেয়, তখন চীন সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে তাদের প্রভাব বিস্তার করতে চায়। ভারত মনে করে, স্থিতিশীল সরকার না থাকলে দেশগুলো চীনের দিকে ঝুঁকতে পারে, যা ভারতের আঞ্চলিক আধিপত্যের জন্য হুমকি। নেপালে বর্তমান সরকার পতনের মূল কারণ দুর্নীতি এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরকারের নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা। এই বিক্ষোভের নেতৃত্বে রয়েছে ‘জেন-জি’ বা তরুণ প্রজন্ম, যারা পুরনো নেতৃত্বের ওপর বিরক্ত। ভারতের আশঙ্কা, এই নতুন নেতৃত্ব ভারতের প্রতি সহানুভূতিশীল নাও হতে পারে। কিছু রাজনৈতিক বিশ্লেষক মনে করছেন, এই অস্থিরতার সুযোগ নিয়ে ভারতে রাজতন্ত্রের সমর্থক গোষ্ঠীগুলো আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে, যা ভারতের স্বার্থের পরিপন্থী।

প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা অলির নেতৃত্বে, নেপাল ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোডস ইনিশিয়েটিভে যোগদানের জন্য কাঠামো চুক্তিতে স্বাক্ষর করে। যদিও মিলেনিয়াম চ্যালেঞ্জ কর্পোরেশনের (এমসিসি) নেপাল কমপ্যাক্টের মাধ্যমে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অবকাঠামো প্রকল্পে প্রায় ৫০০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছে।গত মাসে ভারত ও চীন উত্তরাখণ্ডের লিপুলেখ পাস দিয়ে বাণিজ্য পথ খুলে দেওয়ার পর, প্রধানমন্ত্রী ওলি চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংকে বলেছিলেন যে, এটি একটি নেপালি অঞ্চল। যদিও এই অঞ্চলটি ভারতীয় ভূখণ্ডের মধ্যে অবস্থিত এবং ভারতের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। ২০১৫ সালের পর এটি ছিল কোনও নেপালি নেতার প্রথম এই ধরনের দাবি। অলি উত্তরাখণ্ডের লিপুলেখ, কালাপানি এবং লিম্পিয়াধুরা নিয়ে তার প্রতিবাদের পর, তিনি ১৮১৬ সালের সুগৌলি চুক্তির ভিত্তিতে এগুলোকে নেপালি অঞ্চল হিসেবে দাবি করেছিলেন।

২০২৪ সালের জুলাই মাসে নেপালের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণকারী প্রবীণ কমিউনিস্ট নেতা অলিকে চীনপন্থী হিসেবে দেখা হয়। দায়িত্ব গ্রহণের এক বছরেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও, অলি এখনও ভারত সফর করেননি। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে অলির প্রথম বিদেশ সফরের জন্য চীনকে বেছে নেওয়া স্বাভাবিক নিয়মের বাইরে ছিল। কারণ নেপালি প্রধানমন্ত্রীরা ঐতিহ্যগতভাবে প্রথমে ভারত সফর করেন। তবে প্রথম থেকেই তাঁর বেইজিংয়ের দিকে ঝুঁকে পড়ার বিষয়টি প্রকাশ পেয়েছে। ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতি অনুসারে, ১৭ আগস্ট ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিক্রম মিস্রি নেপাল সফর করেন এবং পারস্পরিক সুবিধাজনক তারিখে ভারত সফরের জন্য প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির তরফ থেকে প্রধানমন্ত্রী অলিকে একটি আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণপত্র হস্তান্তর করেন।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে, অলির ভারত সফর ১৬ সেপ্টেম্বর নির্ধারিত ছিল।বিশেষজ্ঞরা মনে করেন যে অলি তার রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিতে বাস্তববাদী নন. কারণ তিনি শতাব্দী প্রাচীন এবং অনেক গভীর ভারত-নেপাল সম্পর্ককে চীনের সাথে তুলনা করার চেষ্টা করেন। ঐতিহাসিকভাবে, নেপালের সীমান্ত ভারত এবং তিব্বতের সাথে ছিল, চীনের সাথে নয়। নেপালে ব্যাপক বিক্ষোভে বেইজিংয়ের ভূমিকার কথা কার্যত উড়িয়ে দিয়েছেন নেপাল, সার্ক এবং চীন-তিব্বত বিষয়ক প্রবীণ সাংবাদিক কেশব প্রধান। তিনি মনে করেন, চীন নেপাল জুড়ে, বিশেষ করে তরাই অঞ্চলে, এই ধরনের সমস্যা তৈরি করার চেষ্টা করবে না। ধারণা করা যেতে পারে এই আন্দোলনের প্রভাব মূলত কাঠমান্ডু উপত্যকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। তিনি আরও ব্যাখ্যা করেন যে বেইজিং এই ধরনের আগুন লাগার ব্যাপারে সতর্ক থাকবে কারণ এটি যেকোনো সময় চীনের বিরুদ্ধে যেতে পারে। ষাটের দশকে, নেপালি জনগণ চীনের বিরুদ্ধে খেপে উঠেছিল এবং কাঠমান্ডুতে চীনা নেতাদের ছবি টেনে এনে ছিড়ে দেয়া হয়েছিল।

সোমবার কাঠমান্ডুতে শুরু হওয়া বিক্ষোভ শীঘ্রই অলির নিজ জেলা ঝাপা এবং তারপর গিরিজা প্রসাদ কৈরালার নিজ জেলা সুনসারি, উত্তর প্রদেশ সীমান্তের কাছে ভৈরহাওয়া এবং বিহার সীমান্তের বিরাটনগরে ছড়িয়ে পড়ে।২০০৮ সালে রাজতন্ত্রের অবসানের পর থেকে নেপাল ১৩টি সরকার দেখেছে। সমস্ত সরকারই সাধারণ মানুষকে অভাবগ্রস্ত করে তুলেছিল। সেখানে ছিল নিয়মতান্ত্রিক দুর্নীতি এবং অনুন্নয়ন। নেপালে অস্থিরতা বিরাজ করছে এবং রাজা জ্ঞানেন্দ্র শাহের পক্ষে সমাবেশগুলো এর সাথে যুক্ত ছিল।

নেপালে একাধিক শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন কেবল অভ্যন্তরীণ সংকটের সাথেই নয়, বরং বহিরাগত শক্তির সাথেও যুক্ত। অলি-বিরোধী বিক্ষোভ যে ব্যাপক আকার ধারণ করে এবং মুহূর্তের মধ্যেই সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে, তা নিয়ে স্বভাবতই প্রশ্ন ওঠে। এবং এই বিক্ষোভের সময়কাল সত্যিই কৌতূহলজনক। অনুসন্ধানী সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়ের নিজের ভেরিফাইড ফেসবুক আইডিতে মঙ্গলবার দেওয়া এক পোস্টে লিখেছেন, ৫ আগষ্ট ২০২৪ আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর, দলটির অনেক নেতাকর্মী দেশছেড়ে নেপালে থিতু হয়েছেন। তাঁদের বেশির ভাগই আবার বসবাস করেন, কাঠমান্ডুতে। আমি ভাবছি, ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে, ঢাকায় নিজ দলের পতন, আর কাঠমান্ডুতে একই ছাত্র-জনতার বিক্ষোভে সরকারপতন দেখার পর, তাঁরা কি ট্রমার মধ্যে দিয়েই না যাচ্ছে।

ট্যাগস

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

জনপ্রিয় সংবাদ

এই সরকার জনগণের সঙ্গে গাদ্দারি করছে: নাহিদ ইসলাম

বাংলাদেশের পর নেপালের সরকার পতনে দুশ্চিন্তা বাড়ল ভারতের

আপডেট সময় ০২:১৬:৫৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৫

এবার জেন-জির তীব্র আন্দোলনে বাংলাদেশের পর নেপালে সরকার পরিবর্তনের ঘটনা প্রতিবেশী ভারতের জন্য গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেকটা নির্ঘুম রাত কাটছে দেশটির। কাঠমান্ডুর এই অস্থিতিশীলতা দিল্লির নিরাপত্তা ও কৌশলগত স্বার্থের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করছে সাউথ ব্লক। ঢাকার পর সেখানেও আধিপত্য ইস্যুতে চরম বিপর্যয়ের মুখে মোদি সরকার। চিকেন নেকের উভয় পাশে আধিপত্য হারানোয় অজানা আতঙ্ক তাড়া করছে ভারতীয়দের। এছাড়া প্রতিবেশী বাংলাদেশ ও নেপালের অনুকরণে হিন্দুত্ববাদী বিজেপির অপশাসন, দুর্নীতি, ভোট চুরি, বিরোধী মত ও সাম্প্রদায়িক দমন পীড়ন এবং কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতার বিরুদ্ধেও যেকোনো মুহূর্তে জেন-জি তরুণদের পুঞ্জিভূত ক্ষোভের বিস্ফোরণের আশঙ্কা করা হচ্ছে।

এদিকে, গণবিক্ষোভের মুখে প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা অলির পদত্যাগ ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের মধ্যেও গভীর হতাশার সৃষ্টি করেছে। এর কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে, হাসিনা আজীবন দিল্লির নিঃস্বার্থ সেবা করতে গিয়ে ভারত ও আওয়ামী লীগের স্বার্থকে একাকার করে ফেলেছে। তাই পৃথিবীতে কোথাও ভারত বিপদগ্রস্ত হলে তাতে সমানভাবে বা তারচেয়েও বেশি ব্যথিত হয় ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ, যেমটন হয়েছে আমেরিকা ও ট্রাম্পের সাথে সম্পর্কের টানাপড়নের ক্ষেত্রে। এছাড়াও, বাংলাদেশে অভ্যুত্থানের মুখে হাসিনার পলায়নের পর জনরোষ থেকে বাঁচতে ভারতের পাশাপাশি নেপালেও আশ্রয় নিয়েছে দলটির অনেক নেতাকর্মী। ফলে তারা নতুন করে এক অস্থিরতার মুখে পড়েছে। তাদের জন্য এ যেন ‘পানিতে কুমির ডাঙ্গায় বাঘ’ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। যা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে সামাজিক মাধ্যমে।

ইন্ডিয়া টুডের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, নেপাল ভারতের জন্য কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে এটি দ্বিতীয় দেশ যেখানে গত এক বছরে রাজনৈতিক অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে, একটি ছাত্র বিক্ষোভ শেখ হাসিনার সরকারকে উৎখাতের জন্য একটি ব্যাপক আন্দোলনে রূপান্তরিত হয়। হাসিনাকে ভারতপন্থী নেত্রী হিসেবে বিবেচনা করা হত।বাংলাদেশের মতো, নেপালও রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তারের জন্য বিভিন্ন বহিরাগত শক্তির মধ্যে টানাপোড়েন প্রত্যক্ষ করছে। নেপালের সরকার পতনের পেছনে ছিল ‘জেন-জি’ তরুণদের ব্যাপক বিক্ষোভ এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে তাদের তীব্র আন্দোলনক। এই আন্দোলনের মূল দাবি ছিল প্রধানমন্ত্রী অলির পদত্যাগ এবং রাজনৈতিক সংস্কার। বাংলাদেশের পর এই আন্দোলন যেভাবে দ্রুত গতিতে সরকারের পতন ঘটিয়েছে, তা দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশগুলোর জন্য একটি উদাহরণ হয়ে উঠেছে, যেখানে জনগণের অসন্তোষ ও বিক্ষোভের মুখে সরকার ব্যবস্থা ভেঙে পড়তে পারে।

বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের সঙ্গে নেপালের পরিস্থিতির কিছু সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়ায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ ও তার দোসরদের মধ্যে এক ধরনের হতাশা দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে, গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে সরকারের পতন এবং তরুণ প্রজন্মের প্রতিবাদী ভূমিকা বাংলাদেশ থেকে উৎসাহিত হয়েছে বলে বলা হচ্ছে।

ভারতীয় গণমাধ্যমে প্রতিবেদনে বলা হয়, নেপালের বিক্ষোভকারীদের নিয়ন্ত্রণ কে করছে সে সম্পর্কে সবারই একটা তত্ত্ব উঠে আসছে। কেউ কেউ বলছেন অলি চীনপন্থী, কেউ কেউ বাংলাদেশের মতো মার্কিন ভূমিকা দেখছেন, আবার কেউ কেউ বলছেন ওয়াশিংটনের এমসিসি বিনিয়োগের কারণে বেইজিং বিক্ষোভে ইন্ধন জোগাচ্ছে। আবার কেউ কেউ নেপালি নেপো শিশুদের বিরুদ্ধে জেন-জি আন্দোলনকে রাজতন্ত্রপন্থী আন্দোলনকারীদের সাথে যুক্ত করেছেন, যাদের ভারতপন্থী হিসেবেও দেখা হয়।চীনের বিআরআই এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এমসিসি অর্থায়নের কারণে নেপাল এমন একটি ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে যেখানে আন্তর্জাতিক স্বার্থ সংঘাতের মুখে পড়েছে।

প্রসঙ্গত, ভারত ও নেপালের মধ্যে প্রায় ১,৭৫১ কিলোমিটার দীর্ঘ উন্মুক্ত সীমান্ত রয়েছে। তাই নেপালে যেকোনো ধরনের রাজনৈতিক অস্থিরতা ভারতের সীমান্ত নিরাপত্তার জন্য সরাসরি হুমকি হিসেবে দেখে ভারত। ভারতীয় গণমাধ্যম বলছে, নেপাল ও বাংলাদেশ উভয়ই ভারতের প্রতিবেশী এবং এই দুটি দেশের ওপর চীনের প্রভাব দিন দিন বাড়ছে। বিশেষ করে, নেপালে যখনই রাজনৈতিক অস্থিরতা দেখা দেয়, তখন চীন সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে তাদের প্রভাব বিস্তার করতে চায়। ভারত মনে করে, স্থিতিশীল সরকার না থাকলে দেশগুলো চীনের দিকে ঝুঁকতে পারে, যা ভারতের আঞ্চলিক আধিপত্যের জন্য হুমকি। নেপালে বর্তমান সরকার পতনের মূল কারণ দুর্নীতি এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরকারের নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা। এই বিক্ষোভের নেতৃত্বে রয়েছে ‘জেন-জি’ বা তরুণ প্রজন্ম, যারা পুরনো নেতৃত্বের ওপর বিরক্ত। ভারতের আশঙ্কা, এই নতুন নেতৃত্ব ভারতের প্রতি সহানুভূতিশীল নাও হতে পারে। কিছু রাজনৈতিক বিশ্লেষক মনে করছেন, এই অস্থিরতার সুযোগ নিয়ে ভারতে রাজতন্ত্রের সমর্থক গোষ্ঠীগুলো আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে, যা ভারতের স্বার্থের পরিপন্থী।

প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা অলির নেতৃত্বে, নেপাল ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোডস ইনিশিয়েটিভে যোগদানের জন্য কাঠামো চুক্তিতে স্বাক্ষর করে। যদিও মিলেনিয়াম চ্যালেঞ্জ কর্পোরেশনের (এমসিসি) নেপাল কমপ্যাক্টের মাধ্যমে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অবকাঠামো প্রকল্পে প্রায় ৫০০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছে।গত মাসে ভারত ও চীন উত্তরাখণ্ডের লিপুলেখ পাস দিয়ে বাণিজ্য পথ খুলে দেওয়ার পর, প্রধানমন্ত্রী ওলি চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংকে বলেছিলেন যে, এটি একটি নেপালি অঞ্চল। যদিও এই অঞ্চলটি ভারতীয় ভূখণ্ডের মধ্যে অবস্থিত এবং ভারতের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। ২০১৫ সালের পর এটি ছিল কোনও নেপালি নেতার প্রথম এই ধরনের দাবি। অলি উত্তরাখণ্ডের লিপুলেখ, কালাপানি এবং লিম্পিয়াধুরা নিয়ে তার প্রতিবাদের পর, তিনি ১৮১৬ সালের সুগৌলি চুক্তির ভিত্তিতে এগুলোকে নেপালি অঞ্চল হিসেবে দাবি করেছিলেন।

২০২৪ সালের জুলাই মাসে নেপালের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণকারী প্রবীণ কমিউনিস্ট নেতা অলিকে চীনপন্থী হিসেবে দেখা হয়। দায়িত্ব গ্রহণের এক বছরেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও, অলি এখনও ভারত সফর করেননি। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে অলির প্রথম বিদেশ সফরের জন্য চীনকে বেছে নেওয়া স্বাভাবিক নিয়মের বাইরে ছিল। কারণ নেপালি প্রধানমন্ত্রীরা ঐতিহ্যগতভাবে প্রথমে ভারত সফর করেন। তবে প্রথম থেকেই তাঁর বেইজিংয়ের দিকে ঝুঁকে পড়ার বিষয়টি প্রকাশ পেয়েছে। ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতি অনুসারে, ১৭ আগস্ট ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিক্রম মিস্রি নেপাল সফর করেন এবং পারস্পরিক সুবিধাজনক তারিখে ভারত সফরের জন্য প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির তরফ থেকে প্রধানমন্ত্রী অলিকে একটি আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণপত্র হস্তান্তর করেন।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে, অলির ভারত সফর ১৬ সেপ্টেম্বর নির্ধারিত ছিল।বিশেষজ্ঞরা মনে করেন যে অলি তার রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিতে বাস্তববাদী নন. কারণ তিনি শতাব্দী প্রাচীন এবং অনেক গভীর ভারত-নেপাল সম্পর্ককে চীনের সাথে তুলনা করার চেষ্টা করেন। ঐতিহাসিকভাবে, নেপালের সীমান্ত ভারত এবং তিব্বতের সাথে ছিল, চীনের সাথে নয়। নেপালে ব্যাপক বিক্ষোভে বেইজিংয়ের ভূমিকার কথা কার্যত উড়িয়ে দিয়েছেন নেপাল, সার্ক এবং চীন-তিব্বত বিষয়ক প্রবীণ সাংবাদিক কেশব প্রধান। তিনি মনে করেন, চীন নেপাল জুড়ে, বিশেষ করে তরাই অঞ্চলে, এই ধরনের সমস্যা তৈরি করার চেষ্টা করবে না। ধারণা করা যেতে পারে এই আন্দোলনের প্রভাব মূলত কাঠমান্ডু উপত্যকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। তিনি আরও ব্যাখ্যা করেন যে বেইজিং এই ধরনের আগুন লাগার ব্যাপারে সতর্ক থাকবে কারণ এটি যেকোনো সময় চীনের বিরুদ্ধে যেতে পারে। ষাটের দশকে, নেপালি জনগণ চীনের বিরুদ্ধে খেপে উঠেছিল এবং কাঠমান্ডুতে চীনা নেতাদের ছবি টেনে এনে ছিড়ে দেয়া হয়েছিল।

সোমবার কাঠমান্ডুতে শুরু হওয়া বিক্ষোভ শীঘ্রই অলির নিজ জেলা ঝাপা এবং তারপর গিরিজা প্রসাদ কৈরালার নিজ জেলা সুনসারি, উত্তর প্রদেশ সীমান্তের কাছে ভৈরহাওয়া এবং বিহার সীমান্তের বিরাটনগরে ছড়িয়ে পড়ে।২০০৮ সালে রাজতন্ত্রের অবসানের পর থেকে নেপাল ১৩টি সরকার দেখেছে। সমস্ত সরকারই সাধারণ মানুষকে অভাবগ্রস্ত করে তুলেছিল। সেখানে ছিল নিয়মতান্ত্রিক দুর্নীতি এবং অনুন্নয়ন। নেপালে অস্থিরতা বিরাজ করছে এবং রাজা জ্ঞানেন্দ্র শাহের পক্ষে সমাবেশগুলো এর সাথে যুক্ত ছিল।

নেপালে একাধিক শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন কেবল অভ্যন্তরীণ সংকটের সাথেই নয়, বরং বহিরাগত শক্তির সাথেও যুক্ত। অলি-বিরোধী বিক্ষোভ যে ব্যাপক আকার ধারণ করে এবং মুহূর্তের মধ্যেই সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে, তা নিয়ে স্বভাবতই প্রশ্ন ওঠে। এবং এই বিক্ষোভের সময়কাল সত্যিই কৌতূহলজনক। অনুসন্ধানী সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়ের নিজের ভেরিফাইড ফেসবুক আইডিতে মঙ্গলবার দেওয়া এক পোস্টে লিখেছেন, ৫ আগষ্ট ২০২৪ আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর, দলটির অনেক নেতাকর্মী দেশছেড়ে নেপালে থিতু হয়েছেন। তাঁদের বেশির ভাগই আবার বসবাস করেন, কাঠমান্ডুতে। আমি ভাবছি, ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে, ঢাকায় নিজ দলের পতন, আর কাঠমান্ডুতে একই ছাত্র-জনতার বিক্ষোভে সরকারপতন দেখার পর, তাঁরা কি ট্রমার মধ্যে দিয়েই না যাচ্ছে।