আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে নতুন মাইলফলক স্পর্শ করল বাংলাদেশ। প্রথমবারের মতো ইউএনএইচসিআরের নির্বাহী কমিটির ব্যুরোর সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেছে দেশটি, যা বৈশ্বিক পরিসরে বাংলাদেশের মর্যাদা ও নেতৃত্বের স্বীকৃতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিশ্বজুড়ে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা যখন ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে, ঠিক এমন সময় আন্তর্জাতিক মানবিক কূটনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চে নতুন এক স্বীকৃতি পেল বাংলাদেশ। প্রথমবারের মতো জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনারের (ইউএনএইচসিআর) নির্বাহী কমিটির (এক্সকম) ব্যুরোর সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেছে বাংলাদেশ। সংশ্লিষ্টরা এটিকে শুধু একটি আনুষ্ঠানিক পদপ্রাপ্তি নয়, বরং বৈশ্বিক মানবিক ইস্যুতে বাংলাদেশের প্রতি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আস্থা ও নেতৃত্বের স্বীকৃতি হিসেবে দেখছেন।
জেনেভায় জাতিসংঘ কার্যালয় এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থায় বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি রাষ্ট্রদূত নাহিদা সোবহান এই দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। ১৯৫৯ সালে ইউএনএইচসিআরের নির্বাহী কমিটির কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর এই প্রথম বাংলাদেশ ব্যুরোর কোনো পদে দায়িত্ব পালন করছে।
চার সদস্যবিশিষ্ট নির্বাহী কমিটির ব্যুরো কমিটির কার্যক্রমে দিকনির্দেশনা প্রদান করে এবং বৈশ্বিক শরণার্থী ও জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতি সংক্রান্ত বিষয়ে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে ঐকমত্য গড়ে তুলতে সহায়তা করে। ফলে এই নেতৃত্ব কাঠামোয় বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তি দেশের জন্য একটি উল্লেখযোগ্য আন্তর্জাতিক অর্জন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ পরামর্শের ভিত্তিতে বাংলাদেশ সর্বসম্মত আঞ্চলিক প্রার্থী হিসেবে মনোনীত হয়। পরে আলজেরিয়া ও অস্ট্রিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে সেই মনোনয়ন সমর্থন করে। পরবর্তীতে নির্বাহী কমিটির ১১০ সদস্য রাষ্ট্রের সমর্থন পেয়ে ব্যুরোর সভাপতির দায়িত্ব লাভ করে বাংলাদেশ।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই নির্বাচন বহুপাক্ষিক কূটনীতিতে বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান ভূমিকা এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের প্রতি আস্থার প্রতিফলন। বিশেষ করে দীর্ঘদিন ধরে প্রায় ১৩ লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে আসা এবং তাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবর্তনের দাবিতে বাংলাদেশের সক্রিয় অবস্থান এই স্বীকৃতির পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
রাষ্ট্রদূত নাহিদা সোবহান আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের একজন অভিজ্ঞ কূটনীতিক। তিনি রোম, জেনেভা ও কলকাতায় বাংলাদেশের বিভিন্ন মিশনে দায়িত্ব পালন করেছেন। এছাড়া জর্ডানে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত এবং কানাডায় বাংলাদেশের হাইকমিশনার হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জাতিসংঘ অনুবিভাগের মহাপরিচালক থাকাকালে তিনি ইউএনএইচসিআরসহ বিভিন্ন জাতিসংঘ সংস্থার সঙ্গে রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেন এবং জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত মিয়ানমারের নাগরিকদের (এফডিএমএন) বিষয়ক জাতীয় টাস্কফোর্সের সদস্য-সচিব হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
বিশ্বব্যাপী মানবিক সহায়তা কার্যক্রম যখন তহবিল সংকটের মুখে এবং বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে, তখন ইউএনএইচসিআরের নির্বাহী কমিটির ব্যুরোর সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ বাংলাদেশের জন্য শুধু মর্যাদার বিষয়ই নয়; বরং মানবিক সংকট মোকাবিলা, আন্তর্জাতিক সংহতি জোরদার এবং দায়িত্ব ভাগাভাগির প্রশ্নে আরও শক্তিশালী ভূমিকা রাখার নতুন সুযোগও বয়ে আনবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

ডেস্ক রিপোর্ট 























