ঢাকা , শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬, ৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম ::
যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ইরানের আইনি পদক্ষেপ শুরু মার্কিন প্রেসিডেন্টের স্বাক্ষর ‘মূল্যহীন ও অবৈধ’: মোজতবা খামেনি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পুরোনো ফর্মুলা বাদ দিতে হবে: আখতার হোসেন দাবানল, বিষাক্ত ধোঁয়া ও আকস্মিক বন্যায় বিপর্যস্ত যুক্তরাষ্ট্র সন্তান প্রসবের জন্য হাসপাতালে নেওয়ার পথে ট্রাকচাপায় অন্তঃসত্ত্বার মৃত্যু গাজায় অবৈধ ইহুদি বসতি স্থাপন করছে ইসরায়েল কুয়েত ও বাহরাইনে মার্কিন সামরিক স্থাপনায় আইআরজিসির হামলা যে কোনো সময় হরতাল-অবরোধের মতো কর্মসূচি দেওয়ার প্রস্তুতি রয়েছে: নাহিদ চুরির অভিযোগে দিনে পড়লেন নফল নামাজ, রাতে মাদক মামলায় গ্রেপ্তার ডিউটি শেষে বিশ্রাম, সকালে মিলল এসআইয়ের মরদেহ

বন্যায় মাটিতে মিশে গেছে মাটির ঘর

  • ডেস্ক রিপোর্ট
  • আপডেট সময় ০৯:৫১:০৯ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬
  • ১০ বার পড়া হয়েছে

চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে ১৯৯১ সালের প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের পর এবারই সবচেয়ে ভয়াবহ বন্যার মুখোমুখি হয়েছেন উপজেলার মানুষ। টানা চার দিনের ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট এ বন্যায় শুধু মানুষের ঘরবাড়িই নয়, ভেসে গেছে কৃষকের ধান, লবণ চাষির মাঠ ও মৎস্য খামারিদের স্বপ্ন। পানি নেমে যাওয়ার পর এখন সামনে আসছে ক্ষয়ক্ষতির ভয়াবহ চিত্র।

 

হাজারো পরিবারের মাথা গোঁজার শেষ আশ্রয়টুকু কেড়ে নিয়েছে এই বন্যা। উপজেলা প্রশাসনের হিসাব অনুযায়ী, বন্যায় সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়েছে ৫ হাজার ১১০টি ঘর এবং আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে আরও ৬ হাজার ঘর। কৃষি, মৎস্য, প্রাণিসম্পদ ও অবকাঠামো খাতে মোট ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৭৬ কোটি ৮২ লাখ টাকা।

 

উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে দেখা গেছে, পানি নেমে গেলেও মানুষের দুর্ভোগ কমেনি। অনেক এলাকায় মাটির ঘর মাটির সঙ্গেই মিশে গেছে। একমাত্র আশ্রয় হারিয়ে কেউ খোলা আকাশের নিচে, আবার কেউ ভাঙা ঘরের পাশে দিন কাটাচ্ছেন। কোথাও টিনের চাল উড়ে গেছে, কোথাও শুধু বাঁশের কাঠামো দাঁড়িয়ে আছে। ঘরের ভেতরে জমে থাকা কাদা, নষ্ট হয়ে যাওয়া আসবাবপত্র, খাদ্যশস্য ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র হারিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো এখন নতুন করে জীবন গড়ার লড়াইয়ে নেমেছে।

 

 

বাহারছড়া ইউনিয়নের পশ্চিম চাঁপাহাড়ি গ্রামের বাসিন্দা নূরুল আলম বলেন, ‘আমার পরিবারের সাত সদস্যের মধ্যে ছয়জনই জন্মান্ধ। তাদের দেখাশোনার দায়িত্ব আমার ওপর। ৬৫ বছর বয়সে এসেও আমিই তাদের চোখ, আমিই ভরসা। বন্যার পানিতে আমাদের শেষ সম্বল মাটির ঘরটিও ভেঙে গেছে। এখন আমাদের একটাই চাওয়া—একটি নিরাপদ ঘর।’

 

তিনি বলেন, ‘আমার স্ত্রী, এক বছরের মেয়ে, দুই শ্যালক, এক সম্বন্ধি ও তার ১০ বছরের মেয়েও জন্মান্ধ। তাদের হাত ধরে চলতে হয়। এই পরিবারের জন্য আমিই চোখ ও পা। কিন্তু বন্যা আমাদের শেষ আশ্রয়টুকুও কেড়ে নিয়েছে। এখন কোথায় থাকব, কীভাবে চলব—এটাই বড় চিন্তা।’

 

 

নূরুল আলম আরও বলেন, ‘পানি বাড়ার পর পশ্চিম চাঁপাহাড়ি উচ্চবিদ্যালয়ের আশ্রয়কেন্দ্রে গিয়ে উঠেছিলাম। পানি নেমে যাওয়ার পর অন্যরা ঘরে ফিরেছে, কিন্তু আমাদের ফেরার মতো ঘর নেই। ছয়জনের চোখে আলো নেই, আর এখন মাথার ওপরের ছাদটুকুও নেই। এখন শুধু একটি ঘরের অপেক্ষায় আছি।’

 

 

স্থানীয়রা জানান, এবারের বন্যা বাঁশখালীর মানুষের জন্য ভয়াবহ অভিজ্ঞতা হয়ে এসেছে। ১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিলের প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে বাঁশখালীতে ব্যাপক প্রাণহানি হয়েছিল। তবে ওই দুর্যোগে প্রাণহানি বেশি হলেও এবারের বন্যায় মানুষের ঘরবাড়ি, সম্পদ ও জীবিকার ক্ষতি হয়েছে সবচেয়ে বেশি।

 

 

বাহারছড়া ইউনিয়নের বাসিন্দা নাজমা আক্তার বলেন, ‘কিছুই তো নেই। মাটির ঘর ছিল, সেটাও কেড়ে নিয়ে গেল। মানুষ আসে, ছবি তুলে চলে যায়। কিন্তু আমাদের কষ্ট থেকেই যায়।’

 

 

উপজেলায় সবচেয়ে বেশি বিপর্যস্ত হয়েছে নিরাপদ পানীয় জলের ব্যবস্থা। ঘরবাড়ি, সড়ক ও কৃষিজমির পাশাপাশি হাজার হাজার নলকূপ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় প্রায় ৩ লাখ মানুষ বিশুদ্ধ পানির সংকটে পড়েছেন। ফলে ডায়রিয়া, আমাশয়, টাইফয়েড ও হেপাটাইটিসসহ পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি বেড়েছে।

 

 

জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের (ডিপিএইচই) তথ্য অনুযায়ী, বাঁশখালীর ১৪টি ইউনিয়নে বন্যায় ৮ হাজার ২৬টি নলকূপ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে ৪ হাজার ৫২৩টি সম্পূর্ণ এবং ৩ হাজার ৫০৩টি আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত। এছাড়া ২ হাজার ৪২৭টি টয়লেটও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

 

 

সরল ইউনিয়নের বাসিন্দা নাজমা আক্তার বলেন, ‘পূর্ব সরল ৩ নম্বর ওয়ার্ডের ছলিয়াবাপের বাড়ি-সংলগ্ন নলকূপটি সম্পূর্ণ অকেজো হয়ে গেছে। ওই নলকূপের ওপর প্রায় ৩০–৪০টি পরিবার নির্ভরশীল ছিল। এখন প্রায় ৪০০ ফুট দূরের একটি বাড়ি থেকে খাবার পানি সংগ্রহ করতে হচ্ছে।’

 

 

চট্টগ্রাম জেলার জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী পলাশ চন্দ্র দাস বলেন, ক্ষয়ক্ষতির তালিকা প্রস্তুত করে জরুরি ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত নলকূপ পুনঃস্থাপন, মেরামত ও নিরাপদ পানীয় জল নিশ্চিত করতে কাজ চলছে।

 

 

কাথারিয়া এলাকার বাসিন্দা কবির বলেন, ‘আমার বয়স এখন ৬৯ বছর। ১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিলের ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসও দেখেছি। তখন অনেক মানুষ মারা গিয়েছিল, কিন্তু এভাবে মানুষের ঘরবাড়ি ও সম্পদের ক্ষতি হতে দেখিনি।’

 

 

বন্যায় বাঁশখালীর ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে শুক্রবার (১৭ জুলাই) বিস্তারিত পরিসংখ্যান প্রস্তুত করা হয়। পরে বন্যাকবলিত এলাকা পরিদর্শনকালে এ তথ্য অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী ও সরকারের উচ্চপর্যায়ে হস্তান্তর করা হয়েছে বলে জানা গেছে।

 

 

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাঁশখালীর ২৬ হাজার ৮০০ কৃষকের ৩ হাজার ৪৪৬ দশমিক ৫ হেক্টর কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কৃষি খাতে ক্ষতির পরিমাণ ৫২ কোটি ৭ লাখ টাকা। মৎস্য খাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৪ হাজার ২০০টি পুকুর ও ৩১০টি চিংড়ি ঘের। এ খাতে ক্ষতির পরিমাণ ৫১ কোটি ৬৩ লাখ টাকা।

 

 

প্রাণিসম্পদ খাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ১ হাজার ২৪০টি গবাদিপশুর খামার ও ৭৪০টি পোলট্রি খামার। এ খাতে ক্ষতির পরিমাণ ৯ কোটি ৫০ লাখ টাকা। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে প্রায় ৩৮ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের ৫৮টি সড়ক। ভেঙেছে ৬০টি সেতু ও কালভার্ট। সারফেসসহ মোট ১০৯ কিলোমিটার সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। খানখানাবাদ ও কাথারিয়া ইউনিয়নে ঘরবাড়ির ক্ষতি বেশি হয়েছে।

 

 

বন্যার পর বাঁশখালীর বিভিন্ন এলাকায় নতুন দুর্ভোগ হিসেবে দেখা দিয়েছে সাপের উপদ্রব। পানি নেমে যাওয়ার পর বসতঘর, রান্নাঘর, উঠান ও স্যাঁতসেঁতে জায়গায় আশ্রয় নিয়েছে বিভিন্ন প্রজাতির সাপ। বাঁশখালী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্রে জানা গেছে, শনিবার বেলা ১১টা পর্যন্ত সাপের কামড়ে ২২ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন।

 

 

চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, বন্যার পর পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি বেড়ে যায়। পরিস্থিতি মোকাবিলায় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মাধ্যমে মেডিকেল ক্যাম্প, চিকিৎসাসেবা, ওষুধ ও পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট বিতরণ করা হচ্ছে।

 

 

স্থানীয়দের অভিযোগ, অপরিকল্পিত স্থাপনা নির্মাণ, পানি চলাচলের পথ সংকুচিত হওয়া এবং নদ-নদী ও খাল দখলের কারণে বন্যার ভয়াবহতা বেড়েছে। সাঙ্গু নদী, জলকদর খাল, বড় গুনাগরী ছড়া ও চাম্বল ছড়াসহ বিভিন্ন খালের বড় অংশ দখল হয়ে যাওয়ায় পানি দ্রুত নামতে পারেনি। জলকদর খাল একসময় প্রায় ২০০ ফুট প্রশস্ত ছিল। বর্তমানে দখল ও ভরাটের কারণে অনেক জায়গায় তা ২০ ফুটে নেমে এসেছে। খালের জায়গায় গড়ে উঠেছে বসতবাড়ি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন স্থাপনা। একইভাবে গুনাগরী ছড়ার প্রায় ৯০ শতাংশ দখল হয়ে গেছে। খাল উদ্ধার ও পুনঃখনন করা না হলে ভবিষ্যতে আরও বড় বন্যার ঝুঁকি রয়েছে।

 

 

বন্যার পর উপজেলার ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্রগুলোর অবস্থাও আলোচনায় এসেছে। বাঁশখালীর ১২১টি আশ্রয়কেন্দ্রের মধ্যে ২৮টি ঝুঁকিপূর্ণ এবং ১৯টি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় অনেক আশ্রয়কেন্দ্র এখন ব্যবহার অনুপযোগী। ১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিলের প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে বাঁশখালীতে ৩৫–৪০ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। ওই দুর্যোগের পর উপজেলার ১৪টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভায় ১২১টি সাইক্লোন শেল্টার নির্মাণ করা হয়।

 

 

ছনুয়া ইউনিয়নের বাসিন্দা মুফিজুর রহমান আশিক বলেন, ‘উপকূলীয় এলাকায় মানুষের তুলনায় আশ্রয়কেন্দ্র পর্যাপ্ত নয়। নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য আরও ৩০–৩৫টি আধুনিক সাইক্লোন শেল্টার প্রয়োজন। কিছু অসাধু মাছ ব্যবসায়ী খালে বাঁধ ও স্লুইস গেটে জাল বসিয়ে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত করছেন। পাশাপাশি অবৈধ বালু উত্তোলনে বেড়িবাঁধ দুর্বল হয়ে পড়ছে।’ তিনি ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য ত্রাণ, বিশুদ্ধ পানি, চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করার দাবি জানান।

 

 

বাঁশখালীর সংসদ সদস্য অধ্যক্ষ মাওলানা জহিরুল ইসলাম জানান, ‘দীর্ঘদিন খাল খনন না হয়ে উল্টো দখল ও ভরাট হয়ে যাওয়ায় এই বন্যা হয়েছে। আমরা নির্বাচিত হওয়ার পরপরই জলকদর খাল খননের কাজ শুরু করেছি এবং অকেজো স্লুইস গেট সংস্কারের বিষয়ে সংসদে বক্তব্য দিয়ে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছি। বন্যা সৃষ্টির পেছনে আরও যেসব কারণ রয়েছে, সেগুলো চিহ্নিত করে সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’

 

 

বন্যাদুর্গত মানুষের সহায়তায় উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ১৭৫ মেট্রিক টন চাল, ১০ হাজার ১০০ প্যাকেট শুকনো খাবার, ৭ হাজার প্যাকেট রান্না করা খাবার, ১ লাখ ৩০ হাজার পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট, ১০০টি হাইজিন বক্স, ১৫৬টি জেরিকেন পানি ও খাবার স্যালাইন বিতরণ করা হয়েছে। বেসরকারিভাবেও প্রায় ৮০ হাজার প্যাকেট শুকনো খাবার এবং ৩৫ হাজার প্যাকেট রান্না করা খাবার বিতরণ করা হয়েছে।

 

 

বাঁশখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রুহুল আমিন বলেন, প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের সমন্বয়ে বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলা করা হচ্ছে। যেখানে পানি আটকে থাকার খবর পাওয়া যাচ্ছে, সেখানে জরুরি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। দুর্গত মানুষের জন্য খাদ্য সহায়তাও অব্যাহত রয়েছে।

 

 

বন্যার পানি নেমে গেলেও বাঁশখালীর হাজারো পরিবারের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হারানো ঘরবাড়ি ও জীবিকা ফিরিয়ে আনা। ধ্বংসস্তূপের মধ্যেও নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখছেন ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ।

ট্যাগস

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

জনপ্রিয় সংবাদ

যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ইরানের আইনি পদক্ষেপ শুরু

বন্যায় মাটিতে মিশে গেছে মাটির ঘর

আপডেট সময় ০৯:৫১:০৯ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬

চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে ১৯৯১ সালের প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের পর এবারই সবচেয়ে ভয়াবহ বন্যার মুখোমুখি হয়েছেন উপজেলার মানুষ। টানা চার দিনের ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট এ বন্যায় শুধু মানুষের ঘরবাড়িই নয়, ভেসে গেছে কৃষকের ধান, লবণ চাষির মাঠ ও মৎস্য খামারিদের স্বপ্ন। পানি নেমে যাওয়ার পর এখন সামনে আসছে ক্ষয়ক্ষতির ভয়াবহ চিত্র।

 

হাজারো পরিবারের মাথা গোঁজার শেষ আশ্রয়টুকু কেড়ে নিয়েছে এই বন্যা। উপজেলা প্রশাসনের হিসাব অনুযায়ী, বন্যায় সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়েছে ৫ হাজার ১১০টি ঘর এবং আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে আরও ৬ হাজার ঘর। কৃষি, মৎস্য, প্রাণিসম্পদ ও অবকাঠামো খাতে মোট ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৭৬ কোটি ৮২ লাখ টাকা।

 

উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে দেখা গেছে, পানি নেমে গেলেও মানুষের দুর্ভোগ কমেনি। অনেক এলাকায় মাটির ঘর মাটির সঙ্গেই মিশে গেছে। একমাত্র আশ্রয় হারিয়ে কেউ খোলা আকাশের নিচে, আবার কেউ ভাঙা ঘরের পাশে দিন কাটাচ্ছেন। কোথাও টিনের চাল উড়ে গেছে, কোথাও শুধু বাঁশের কাঠামো দাঁড়িয়ে আছে। ঘরের ভেতরে জমে থাকা কাদা, নষ্ট হয়ে যাওয়া আসবাবপত্র, খাদ্যশস্য ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র হারিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো এখন নতুন করে জীবন গড়ার লড়াইয়ে নেমেছে।

 

 

বাহারছড়া ইউনিয়নের পশ্চিম চাঁপাহাড়ি গ্রামের বাসিন্দা নূরুল আলম বলেন, ‘আমার পরিবারের সাত সদস্যের মধ্যে ছয়জনই জন্মান্ধ। তাদের দেখাশোনার দায়িত্ব আমার ওপর। ৬৫ বছর বয়সে এসেও আমিই তাদের চোখ, আমিই ভরসা। বন্যার পানিতে আমাদের শেষ সম্বল মাটির ঘরটিও ভেঙে গেছে। এখন আমাদের একটাই চাওয়া—একটি নিরাপদ ঘর।’

 

তিনি বলেন, ‘আমার স্ত্রী, এক বছরের মেয়ে, দুই শ্যালক, এক সম্বন্ধি ও তার ১০ বছরের মেয়েও জন্মান্ধ। তাদের হাত ধরে চলতে হয়। এই পরিবারের জন্য আমিই চোখ ও পা। কিন্তু বন্যা আমাদের শেষ আশ্রয়টুকুও কেড়ে নিয়েছে। এখন কোথায় থাকব, কীভাবে চলব—এটাই বড় চিন্তা।’

 

 

নূরুল আলম আরও বলেন, ‘পানি বাড়ার পর পশ্চিম চাঁপাহাড়ি উচ্চবিদ্যালয়ের আশ্রয়কেন্দ্রে গিয়ে উঠেছিলাম। পানি নেমে যাওয়ার পর অন্যরা ঘরে ফিরেছে, কিন্তু আমাদের ফেরার মতো ঘর নেই। ছয়জনের চোখে আলো নেই, আর এখন মাথার ওপরের ছাদটুকুও নেই। এখন শুধু একটি ঘরের অপেক্ষায় আছি।’

 

 

স্থানীয়রা জানান, এবারের বন্যা বাঁশখালীর মানুষের জন্য ভয়াবহ অভিজ্ঞতা হয়ে এসেছে। ১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিলের প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে বাঁশখালীতে ব্যাপক প্রাণহানি হয়েছিল। তবে ওই দুর্যোগে প্রাণহানি বেশি হলেও এবারের বন্যায় মানুষের ঘরবাড়ি, সম্পদ ও জীবিকার ক্ষতি হয়েছে সবচেয়ে বেশি।

 

 

বাহারছড়া ইউনিয়নের বাসিন্দা নাজমা আক্তার বলেন, ‘কিছুই তো নেই। মাটির ঘর ছিল, সেটাও কেড়ে নিয়ে গেল। মানুষ আসে, ছবি তুলে চলে যায়। কিন্তু আমাদের কষ্ট থেকেই যায়।’

 

 

উপজেলায় সবচেয়ে বেশি বিপর্যস্ত হয়েছে নিরাপদ পানীয় জলের ব্যবস্থা। ঘরবাড়ি, সড়ক ও কৃষিজমির পাশাপাশি হাজার হাজার নলকূপ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় প্রায় ৩ লাখ মানুষ বিশুদ্ধ পানির সংকটে পড়েছেন। ফলে ডায়রিয়া, আমাশয়, টাইফয়েড ও হেপাটাইটিসসহ পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি বেড়েছে।

 

 

জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের (ডিপিএইচই) তথ্য অনুযায়ী, বাঁশখালীর ১৪টি ইউনিয়নে বন্যায় ৮ হাজার ২৬টি নলকূপ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে ৪ হাজার ৫২৩টি সম্পূর্ণ এবং ৩ হাজার ৫০৩টি আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত। এছাড়া ২ হাজার ৪২৭টি টয়লেটও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

 

 

সরল ইউনিয়নের বাসিন্দা নাজমা আক্তার বলেন, ‘পূর্ব সরল ৩ নম্বর ওয়ার্ডের ছলিয়াবাপের বাড়ি-সংলগ্ন নলকূপটি সম্পূর্ণ অকেজো হয়ে গেছে। ওই নলকূপের ওপর প্রায় ৩০–৪০টি পরিবার নির্ভরশীল ছিল। এখন প্রায় ৪০০ ফুট দূরের একটি বাড়ি থেকে খাবার পানি সংগ্রহ করতে হচ্ছে।’

 

 

চট্টগ্রাম জেলার জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী পলাশ চন্দ্র দাস বলেন, ক্ষয়ক্ষতির তালিকা প্রস্তুত করে জরুরি ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত নলকূপ পুনঃস্থাপন, মেরামত ও নিরাপদ পানীয় জল নিশ্চিত করতে কাজ চলছে।

 

 

কাথারিয়া এলাকার বাসিন্দা কবির বলেন, ‘আমার বয়স এখন ৬৯ বছর। ১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিলের ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসও দেখেছি। তখন অনেক মানুষ মারা গিয়েছিল, কিন্তু এভাবে মানুষের ঘরবাড়ি ও সম্পদের ক্ষতি হতে দেখিনি।’

 

 

বন্যায় বাঁশখালীর ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে শুক্রবার (১৭ জুলাই) বিস্তারিত পরিসংখ্যান প্রস্তুত করা হয়। পরে বন্যাকবলিত এলাকা পরিদর্শনকালে এ তথ্য অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী ও সরকারের উচ্চপর্যায়ে হস্তান্তর করা হয়েছে বলে জানা গেছে।

 

 

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাঁশখালীর ২৬ হাজার ৮০০ কৃষকের ৩ হাজার ৪৪৬ দশমিক ৫ হেক্টর কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কৃষি খাতে ক্ষতির পরিমাণ ৫২ কোটি ৭ লাখ টাকা। মৎস্য খাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৪ হাজার ২০০টি পুকুর ও ৩১০টি চিংড়ি ঘের। এ খাতে ক্ষতির পরিমাণ ৫১ কোটি ৬৩ লাখ টাকা।

 

 

প্রাণিসম্পদ খাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ১ হাজার ২৪০টি গবাদিপশুর খামার ও ৭৪০টি পোলট্রি খামার। এ খাতে ক্ষতির পরিমাণ ৯ কোটি ৫০ লাখ টাকা। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে প্রায় ৩৮ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের ৫৮টি সড়ক। ভেঙেছে ৬০টি সেতু ও কালভার্ট। সারফেসসহ মোট ১০৯ কিলোমিটার সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। খানখানাবাদ ও কাথারিয়া ইউনিয়নে ঘরবাড়ির ক্ষতি বেশি হয়েছে।

 

 

বন্যার পর বাঁশখালীর বিভিন্ন এলাকায় নতুন দুর্ভোগ হিসেবে দেখা দিয়েছে সাপের উপদ্রব। পানি নেমে যাওয়ার পর বসতঘর, রান্নাঘর, উঠান ও স্যাঁতসেঁতে জায়গায় আশ্রয় নিয়েছে বিভিন্ন প্রজাতির সাপ। বাঁশখালী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্রে জানা গেছে, শনিবার বেলা ১১টা পর্যন্ত সাপের কামড়ে ২২ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন।

 

 

চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, বন্যার পর পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি বেড়ে যায়। পরিস্থিতি মোকাবিলায় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মাধ্যমে মেডিকেল ক্যাম্প, চিকিৎসাসেবা, ওষুধ ও পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট বিতরণ করা হচ্ছে।

 

 

স্থানীয়দের অভিযোগ, অপরিকল্পিত স্থাপনা নির্মাণ, পানি চলাচলের পথ সংকুচিত হওয়া এবং নদ-নদী ও খাল দখলের কারণে বন্যার ভয়াবহতা বেড়েছে। সাঙ্গু নদী, জলকদর খাল, বড় গুনাগরী ছড়া ও চাম্বল ছড়াসহ বিভিন্ন খালের বড় অংশ দখল হয়ে যাওয়ায় পানি দ্রুত নামতে পারেনি। জলকদর খাল একসময় প্রায় ২০০ ফুট প্রশস্ত ছিল। বর্তমানে দখল ও ভরাটের কারণে অনেক জায়গায় তা ২০ ফুটে নেমে এসেছে। খালের জায়গায় গড়ে উঠেছে বসতবাড়ি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন স্থাপনা। একইভাবে গুনাগরী ছড়ার প্রায় ৯০ শতাংশ দখল হয়ে গেছে। খাল উদ্ধার ও পুনঃখনন করা না হলে ভবিষ্যতে আরও বড় বন্যার ঝুঁকি রয়েছে।

 

 

বন্যার পর উপজেলার ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্রগুলোর অবস্থাও আলোচনায় এসেছে। বাঁশখালীর ১২১টি আশ্রয়কেন্দ্রের মধ্যে ২৮টি ঝুঁকিপূর্ণ এবং ১৯টি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় অনেক আশ্রয়কেন্দ্র এখন ব্যবহার অনুপযোগী। ১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিলের প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে বাঁশখালীতে ৩৫–৪০ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। ওই দুর্যোগের পর উপজেলার ১৪টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভায় ১২১টি সাইক্লোন শেল্টার নির্মাণ করা হয়।

 

 

ছনুয়া ইউনিয়নের বাসিন্দা মুফিজুর রহমান আশিক বলেন, ‘উপকূলীয় এলাকায় মানুষের তুলনায় আশ্রয়কেন্দ্র পর্যাপ্ত নয়। নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য আরও ৩০–৩৫টি আধুনিক সাইক্লোন শেল্টার প্রয়োজন। কিছু অসাধু মাছ ব্যবসায়ী খালে বাঁধ ও স্লুইস গেটে জাল বসিয়ে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত করছেন। পাশাপাশি অবৈধ বালু উত্তোলনে বেড়িবাঁধ দুর্বল হয়ে পড়ছে।’ তিনি ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য ত্রাণ, বিশুদ্ধ পানি, চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করার দাবি জানান।

 

 

বাঁশখালীর সংসদ সদস্য অধ্যক্ষ মাওলানা জহিরুল ইসলাম জানান, ‘দীর্ঘদিন খাল খনন না হয়ে উল্টো দখল ও ভরাট হয়ে যাওয়ায় এই বন্যা হয়েছে। আমরা নির্বাচিত হওয়ার পরপরই জলকদর খাল খননের কাজ শুরু করেছি এবং অকেজো স্লুইস গেট সংস্কারের বিষয়ে সংসদে বক্তব্য দিয়ে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছি। বন্যা সৃষ্টির পেছনে আরও যেসব কারণ রয়েছে, সেগুলো চিহ্নিত করে সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’

 

 

বন্যাদুর্গত মানুষের সহায়তায় উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ১৭৫ মেট্রিক টন চাল, ১০ হাজার ১০০ প্যাকেট শুকনো খাবার, ৭ হাজার প্যাকেট রান্না করা খাবার, ১ লাখ ৩০ হাজার পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট, ১০০টি হাইজিন বক্স, ১৫৬টি জেরিকেন পানি ও খাবার স্যালাইন বিতরণ করা হয়েছে। বেসরকারিভাবেও প্রায় ৮০ হাজার প্যাকেট শুকনো খাবার এবং ৩৫ হাজার প্যাকেট রান্না করা খাবার বিতরণ করা হয়েছে।

 

 

বাঁশখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রুহুল আমিন বলেন, প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের সমন্বয়ে বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলা করা হচ্ছে। যেখানে পানি আটকে থাকার খবর পাওয়া যাচ্ছে, সেখানে জরুরি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। দুর্গত মানুষের জন্য খাদ্য সহায়তাও অব্যাহত রয়েছে।

 

 

বন্যার পানি নেমে গেলেও বাঁশখালীর হাজারো পরিবারের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হারানো ঘরবাড়ি ও জীবিকা ফিরিয়ে আনা। ধ্বংসস্তূপের মধ্যেও নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখছেন ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ।