জামালপুর জেলা খাদ্য বিভাগে অনিয়ম, দুর্নীতি এবং সরকারি খাদ্যশস্য ব্যবস্থাপনায় লুটপাটের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গড়ে ওঠা কথিত সিন্ডিকেটের কাঠামো ও কর্মকৌশলে বড় কোনো পরিবর্তন হয়নি; শুধু নিয়ন্ত্রণের হাত বদল হয়েছে।
তাঁদের অভিযোগ, সরকারি ধান-চাল সংগ্রহ, কেয়ারিং-হ্যান্ডলিং, দরপত্র, গুদাম থেকে চাল সরবরাহ ও খাদ্যশস্য পরিবহন—প্রায় সব ক্ষেত্রেই পুরোনো পদ্ধতিতে অনিয়ম চলছে। এমনকি ভুয়া মিল মালিকদের নামে বরাদ্দ এবং প্রকৃত কৃষকদের সরকারি ধান সংগ্রহ কার্যক্রমে অংশগ্রহণে বাধা দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, সিংহজানী খাদ্যগুদাম থেকে ১৫ মেট্রিক টন সরকারি চাল শেরপুরের একটি অটো রাইস মিলে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল। গত ২২ এপ্রিল খাদ্য মন্ত্রণালয়ের এক যুগ্ম সচিব জামালপুর সফরে আসার দিন গুদামের এক কর্মকর্তা তাঁর সফরসঙ্গী হিসেবে ব্যস্ত থাকার সুযোগে চালগুলো সরানোর চেষ্টা করা হয় বলে অভিযোগ।
অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, চালবোঝাই ট্রাকটি শেরপুর ব্রিজ এলাকায় র্যাব-১৪-এর জামালপুর সদস্যরা আটক করেন। পরে ট্রাকচালক শামছুল হককে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। অভিযোগকারীদের দাবি, জিজ্ঞাসাবাদে তিনি সরকারি চাল ট্রাকে তোলার ঘটনায় খাদ্য বিভাগের উপসহকারী খাদ্য পরিদর্শক একরামুল ইসলামের সম্পৃক্ততার কথা জানিয়েছেন। তবে এ বিষয়ে র্যাব বা তদন্তকারী কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
ঘটনাটি তদন্তে বকশীগঞ্জ উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক ও কারিগরি খাদ্য পরিদর্শক শামীমা নাসরিনকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগকারীরা জানিয়েছেন। তাঁদের অভিযোগ, তদন্ত চলাকালে ঘটনার দায় খাদ্য পরিদর্শক আব্দুল হাকিমের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। পরে তাঁকে শেরপুরে বদলি করা হলেও সরকারি চাল কীভাবে গুদাম থেকে বের হলো এবং কার নির্দেশে তা ট্রাকে তোলা হয়েছিল—এসব বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে দাবি তাঁদের।
এদিকে, সরকারি চাল পাচারের অভিযোগ ওঠার পর একরামুল ইসলামকে দুই মাসের জন্য চট্টগ্রাম বন্দরে দায়িত্ব পালনের ভ্রমণাদেশ দেওয়া হলেও তিনি সেখানে যোগদান না করে জামালপুরেই দায়িত্ব পালন করছেন বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা।
এ বিষয়ে জেলা খাদ্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান খানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি সাংবাদিকদের জানান, বিষয়টি খাদ্য অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের এখতিয়ার। কাউকে রাখা বা বদলি করার ক্ষমতা তাঁর নেই বলেও জানান তিনি। তবে বিস্তারিত বিষয়ে তিনি মন্তব্য করতে রাজি হননি।
অন্যদিকে, ধান-চাল সংগ্রহ কার্যক্রমেও অনিয়মের অভিযোগ করেছেন কৃষক ও মিল মালিকেরা। তাঁদের দাবি, সরকারি গুদামে ধান-চাল সরবরাহ করতে গিয়ে নানা ধরনের হয়রানি ও আর্থিক লেনদেনের চাপের মুখে পড়তে হয়। এতে প্রকৃত কৃষক ও ক্ষুদ্র মিল মালিকেরা সরকারি সংগ্রহ কার্যক্রম থেকে পিছিয়ে পড়ছেন এবং প্রভাবশালী একটি সিন্ডিকেট সুবিধা নিচ্ছে।
কেয়ারিং-হ্যান্ডলিং, দরপত্র, ধান-চাল সংগ্রহ, গুদাম থেকে চালের ডেলিভারি ও সরকারি খাদ্যশস্য পরিবহন নিয়েও দীর্ঘদিনের অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।
অভিযোগের বিষয়ে উপসহকারী খাদ্য পরিদর্শক একরামুল ইসলামের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তিনি কোনো বক্তব্য দেননি। অভিযোগগুলো সম্পর্কে জানতে চাইলে ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন এবং পরে ক্ষুদে বার্তা পাঠিয়েও তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
কৃষক ও মিল মালিকদের দাবি, সরকারি খাদ্যশস্য ব্যবস্থাপনায় অনিয়মের অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে প্রকৃত দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হোক। একই সঙ্গে খাদ্য বিভাগের কথিত পুরোনো সিন্ডিকেটের সঙ্গে বর্তমানে কারা যুক্ত এবং সরকারি খাদ্যশস্য ব্যবস্থাপনা থেকে কারা সুবিধা নিচ্ছেন—তাও তদন্তের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।

ডেস্ক রিপোর্ট 






















