এবার পর্যাপ্ত কয়লা মজুত থাকার পরও যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে দিনাজপুরের বড়পুকুরিয়া তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্রের উৎপাদন। বুধবার (২২ এপ্রিল) রাত ১০টা ১০ মিনিটে ১২৫ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতা সম্পন্ন ১নং ইউনিটটি বন্ধ হয়ে যায়। এতে বিদ্যুৎ কেন্দ্রের তিনটি ইউনিটের সবকটিরই উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। ফলে বিদ্যুৎ বিভ্রাটে পড়েছে দিনাজপুরসহ উত্তরের ৮ জেলা। বিষয়টি নিশ্চিত করে বড়পুকুরিয়া তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রধান প্রকৌশলী আবু বক্কর সিদ্দিক জানান, কয়লার সঙ্গে পাথর আসায় ১নং ইউনিটের বয়লার পাইপ ফেটে যায়। এতে বুধবার রাত ১০টা ১০ মিনিটে পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায় তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্রের উৎপাদন।
তিনি বলেন, মেরামত কাজ চলছে, এটি মেরামত করে আবার উৎপাদন শুরু করতে ৪ থেকে ৫ দিন সময় লাগতে পারে। এর আগে দীর্ঘদিন থেকেই বন্ধ রয়েছে ওই বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ১২৫ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন ২নং ইউনিট এবং ২৭৫ উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন ৩নং ইউনিট। দিনাজপুরের বড়পুকুরিয়া কয়লা খনির উৎপাদিত কয়লার উপর ভিত্তি করে খনির পাশেই ২০০৬ সালে গড়ে উঠে কয়লাভিত্তিক বড়পুকুরিয়া তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র। প্রথম অবস্থায় ১২৫ মেগাওয়াট করে মোট ২৫০ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতা সম্পন্ন দুটি ইউনিট স্থাপন করা হয়। এরপর ২০১৭ সালে ২৭৫ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতা সম্পন্ন আরেকটি ইউনিট চালু করে এই বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মোট উৎপাদন ক্ষমতা বেড়ে দাঁড়ায় ৫২৫ মেগাওয়াট। কিন্তু যান্ত্রিক ত্রুটিসহ নানা জটিলতায় কখনই এই বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি একসঙ্গে ৫২৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারেনি।
বড়পুকুরিয়া তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্রের তিনটি ইউনিটের মধ্যে ২৭৫ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন তৃতীয় ইউনিট যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে ২০২৪ সালের ১ নভেম্বর থেকে বন্ধ। ১২৫ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন দ্বিতীয় ইউনিট ২০২০ সালের নভেম্বর থেকে বন্ধ। গত বছরের ৩০ ডিসেম্বর ১২৫ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন প্রথম ইউনিটটি বন্ধ হয়ে যায়। পরে ১৫ দিন পর উৎপাদনে আসে ১৪ জানুয়ারি। বেশ কয়েকমাস ঢিমেতালে চলার পর গত ২২ এপ্রিল রাত ১০টা ১০ মিনিটে আবার ইউনিটটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বর্তমানে পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে বড়পুকুরিয়া তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্রের উৎপাদন।
এদিকে বড়পুকুরিয়া তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি পুরোপুরি বন্ধ থাকায় উৎপাদিত কয়লা নিয়ে বিপাকে পড়েছে বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি কর্তৃপক্ষ। কয়লা রাখার স্থান সংকুলান না হওয়ায় অব্যাহত উৎপাদন নিয়ে শংকায় পড়েছেন তারা। খনির কর্মকর্তারা জানান, সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বড়পুকুরিয়া কয়লা খনির উৎপাদিত কয়লার একমাত্র ক্রেতা বড়পুকুরিয়া তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র। কিন্তু একের পর এক বন্ধ থাকায় খনির উৎপাদিত কয়লা ব্যবহার করতে পারছে না বড়পুকুরিয়া তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র। এতে মজুত অস্বাভাবিক বেড়ে কয়লা রাখার জায়গা সংকট দেখা দিয়েছে। হিসেব অনুযায়ী, বড়পুকুরিয়া তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্রের তিনটি ইউনিট একসঙ্গে চালাতে প্রতিদিন কয়লার প্রয়োজন পড়ে প্রায় ৫ হাজার ২শ টন। কিন্তু যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে তিনটি ইউনিট একসঙ্গে কখনো চালাতে না পারায় কোল ইয়ার্ডে জমেছে কয়লার বিপুল মজুত। এতে অব্যাহত উৎপাদন নিয়ে শঙ্কায় পড়েছে বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি কর্তৃপক্ষ।
এ বিষয়ে বড়পুকুরিয়া কোল মাইনিং কোম্পানি লিমিটেড (বিসিএমসিএল) এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী মো. শাহ আলম বলেন, খনিতে বর্তমানে দৈনিক গড়ে ২ হাজার ৭শ টন কয়লা উত্তোলন করা হচ্ছে। খনির ইয়ার্ডে কয়লা রাখার সর্বোচ্চ ধারণ ক্ষমতা ২ লাখ ২০ হাজার টন হলেও বর্তমানে ইয়ার্ডে মজুত বেড়ে দাঁড়িয়েছে সাড়ে ৫ লাখ টন। তিনি বলেন, ইয়ার্ডে কয়লা রাখার জায়গা নেই। এজন্য তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সঙ্গে আলোচনা করে বিকল্প স্থানে কয়লার রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। এদিকে জাতীয় গ্রিড থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হলেও উত্তরাঞ্চলে চাহিদা পূরণে বড়পুকুরিয়া তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। একদিকে বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ, অন্যদিকে সরবরাহে ঘাটতি। এতে মারাত্মক ভোগান্তিতে পড়েছেন উত্তরাঞ্চলের মানুষ। জাতীয় গ্রিড থেকেও মিলছে না চাহিদামাফিক বিদ্যুৎ। এক সপ্তাহ ধরে বেড়েছে ভ্যাপসা গরম। ৩৫ থেকে ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পুড়ছে অঞ্চলটি। এই গরমে সেখানে বেড়েছে বিদ্যুৎ বিভ্রাট। সকাল, ভোর কিংবা গভীর রাতে চলে এই বিদ্যুৎ বিভ্রাট।

ডেস্ক রিপোর্ট 






















