এবার ২০২৬ সালের ফিফা বিশ্বকাপকে এখন পর্যন্ত আয়োজিত সবচেয়ে বড় ফুটবল মহোৎসব হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। প্রথমবারের মতো ৩২টির বদলে ৪৮টি দেশ এই আসরে অংশ নেবে। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোজুড়ে আয়োজিত এই টুর্নামেন্টে প্রায় ছয় সপ্তাহ ধরে অনুষ্ঠিত হবে মোট ১০৪টি ম্যাচ। আর্থিক দিক থেকে দেখলে, এটি ইতোমধ্যেই বিশাল সাফল্যের পথে রয়েছে। ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা গেছে। এপি’র এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সম্প্রচার স্বত্ব, স্পনসরশিপ ও টিকিট বিক্রি থেকে ফিফার আয় প্রায় ৯ বিলিয়ন ডলার (১ লাখ কোটি টাকার বেশি) ছুঁতে পারে, যা হবে রেকর্ড। এমনকি ফাইনালের প্রিমিয়াম টিকিটের পুনর্বিক্রয় মূল্যও পৌঁছে গেছে আকাশছোঁয়া পর্যায়ে।
তবে, এই উচ্ছ্বাসের আড়ালে বিশ্লেষক, সম্প্রচার সংস্থা এমনকি সাবেক খেলোয়াড়দের মধ্যেও বাড়ছে এক ধরনের উদ্বেগ—ফিফা কি বিশ্বকাপকে অতিরিক্ত বড় করে ফেলছে? কারণ ম্যাচের সংখ্যা বাড়লেই যে দর্শকদের উত্তেজনাও সমান হারে বাড়বে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। ফিফার যুক্তি অবশ্য বেশ সরল। বেশি দল মানে বেশি ম্যাচ, বেশি টেলিভিশন স্লট, বেশি স্পনসরশিপ সুযোগ এবং শেষ পর্যন্ত বেশি আয়। কিন্তু খেলাধুলা সব সময় প্রচলিত ব্যবসায়িক নিয়মে চলে না। বিশ্বের সবচেয়ে মূল্যবান অনেক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা বরং সফল হয়েছে সীমিত পরিসর বজায় রাখার কারণেই। যুক্তরাষ্ট্রের এনএফএলকে প্রায়ই এর সেরা উদাহরণ হিসেবে ধরা হয়। সেখানে প্রতিটি দল নিয়মিত মৌসুমে মাত্র ১৭টি ম্যাচ খেলে। ফলে প্রায় প্রতিটি ম্যাচই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এই স্বল্পতাই দর্শকদের মনোযোগ বাড়ায়, আর সেই মনোযোগই টেলিভিশন রেটিং ও বিশাল সম্প্রচার চুক্তি এনে দেয়।
অন্যদিকে ফুটবল ধীরে ধীরে ঠিক উল্টো পথে হাঁটছে। ঘরোয়া লিগ বড় হচ্ছে, আন্তর্জাতিক সূচি আরও ব্যস্ত হয়ে উঠছে। খেলোয়াড়রা ইতোমধ্যেই অতিরিক্ত ক্লান্তির অভিযোগ করছেন। এখন বিশ্বকাপও আরও দীর্ঘ হচ্ছে। ফলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে— অতিরিক্ত সরবরাহের কারণে ফুটবল হয়তো একসময় নিজের সবচেয়ে বড় আসরটির বিশেষত্বই হারিয়ে ফেলবে। বিশ্বকাপের আসল জাদুর বড় অংশ ছিল এর তীব্রতা। আগের ৩২ দলের ফরম্যাটে ভুলের সুযোগ ছিল খুবই কম। একটি খারাপ ম্যাচই শক্তিশালী দলগুলোকেও সংকটে ফেলে দিতে পারত। “গ্রুপ অব ডেথ”-এর মতো স্মরণীয় মুহূর্তগুলো শুরু থেকেই তৈরি করত চাপের আবহ। নতুন কাঠামোয় সেই উত্তেজনা অনেকটাই কমে যেতে পারে। এখন প্রতিটি গ্রুপ থেকে শীর্ষ দুই দল এবং সেরা আটটি তৃতীয় স্থানধারী দল নকআউট পর্বে উঠবে। বাস্তবে এর অর্থ হলো, ঐতিহ্যবাহী শক্তিশালী দলগুলোর প্রথম পর্ব থেকেই বিদায় নেওয়ার সম্ভাবনা এখন অনেক কম। এতে টুর্নামেন্টের আবেগী ছন্দও বদলে যাবে।
শুরু থেকেই হাই–প্রেশারের ফুটবলের বদলে প্রথম দিকের ম্যাচগুলো অনেক বেশি “বাছাই প্রক্রিয়া”র মতো মনে হতে পারে—যেন আসল টুর্নামেন্ট শুরুই হচ্ছে পরে। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক তারকা ক্লিন্ট ডেম্পসি সম্প্রতি এমন আশঙ্কার কথাই বলেছেন। তার মতে, সম্প্রসারিত এই ফরম্যাট শুরুর দিকের ম্যাচগুলোর জরুরিতা ও মান— দুটোই কমিয়ে দিতে পারে। ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্টিনো অবশ্য এই সম্প্রসারণকে ফুটবলকে আরও বৈশ্বিক করে তোলার উদ্যোগ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন এবং অনেক দিক থেকেই তিনি ঠিক। নতুন ফরম্যাটে যেসব দেশ আগে বিশ্বকাপে খেলার কথা ভাবতেই পারত না, তারাও এখন বাস্তব সম্ভাবনা দেখতে পাচ্ছে। উজবেকিস্তান, জর্ডান কিংবা কেপ ভার্দের মতো দেশগুলো এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বিশ্বকাপের অনেক কাছাকাছি।
রাজনৈতিক ও আবেগগত দিক থেকে এসব গল্প গুরুত্বপূর্ণ। ফিফা চায় বিশ্বকাপ আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক ও বৈশ্বিক প্রতিনিধিত্বপূর্ণ হয়ে উঠুক। কিন্তু বাণিজ্যিকভাবে এই সম্প্রসারণ আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জও তৈরি করছে। সম্প্রচার সংস্থাগুলো বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার খরচ করে মূলত উচ্চমানের নাটকীয় ক্রীড়া লড়াইয়ের জন্য। তারা চায় ব্রাজিল বনাম জার্মানি, আর্জেন্টিনা বনাম ফ্রান্স কিংবা ইংল্যান্ড বনাম স্পেনের মতো ম্যাচ। এই ধরনের লড়াইই বিশ্বজুড়ে দর্শক টানে এবং বিজ্ঞাপন আয় বাড়ায়। অন্যদিকে একপেশে ম্যাচে ভরা দীর্ঘ গ্রুপ পর্ব দর্শকদের ক্লান্ত করে তুলতে পারে, টুর্নামেন্ট চূড়ান্ত উত্তেজনায় পৌঁছানোর আগেই।
যদি সাধারণ দর্শকরা প্রথম তিন সপ্তাহের বড় অংশের ম্যাচ দেখা বাদ দিতে শুরু করেন, তাহলে সম্প্রচার অংশীদাররা ভবিষ্যতে প্রশ্ন তুলতেই পারেন—ম্যাচ বাড়ানো সত্যিই কি মূল্য বাড়াচ্ছে? এখানে শারীরিক চাপের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। আধুনিক ফুটবলাররা ইতোমধ্যেই ক্লাব ফুটবল, আন্তর্জাতিক বিরতি, মহাদেশীয় টুর্নামেন্ট ও বাণিজ্যিক সফরে ঠাসা এক ক্লান্তিকর সূচির মধ্যে খেলছেন। সম্প্রসারিত বিশ্বকাপ সেই চাপ আরও বাড়াবে। খেলোয়াড়দের যেন এখন বছরজুড়ে বিনোদন পণ্যে পরিণত করা হচ্ছে। প্রায় ছয় সপ্তাহব্যাপী টুর্নামেন্ট মানে ক্লাব মৌসুম শুরুর আগে বিশ্রামের সময় আরও কমে যাওয়া। আর্থিকভাবে শীর্ষ খেলোয়াড়রা হয়তো মানিয়ে নিতে পারবেন, কিন্তু অতিরিক্ত চাপের কারণে খেলার মানই ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। কারণ বেশি ফুটবল মানেই সবসময় ভালো ফুটবল নয়।
স্বল্পমেয়াদে ফিফা আর্থিকভাবে প্রায় নিশ্চিতভাবেই লাভবান হবে। সম্প্রচার স্বত্ব ইতোমধ্যেই বিক্রি হয়েছে, স্পনসরদের আগ্রহও ব্যাপক, আর এই বিশাল আয়োজন বিশ্বজুড়ে বিপুল মনোযোগ নিশ্চিত করবে। তবে মূল প্রশ্ন হলো—বিশ্বকাপ কি ধীরে ধীরে হারাতে বসেছে সেই বিশেষত্ব, যা একে এতদিন অনন্য করে রেখেছিল? দশকের পর দশক ধরে বিশ্বকাপ ছিল বিরল, ঘনীভূত এবং আবেগে ভরপুর একটি আসর, কারণ প্রতিটি ম্যাচেরই ছিল আলাদা গুরুত্ব। এখন ফিফা বাজি ধরছে—বড় মানেই ভালো। কিন্তু আশঙ্কা হলো, ১০৪ ম্যাচের দীর্ঘ ম্যারাথনে বিশ্বকাপ হয়তো ধীরে ধীরে উৎসবের অনুভূতি হারিয়ে ফেলবে এবং একসময় কেবল “অন্তহীন কনটেন্ট”-এ পরিণত হবে। আর আধুনিক ক্রীড়াজগতে দর্শকরা শেষ পর্যন্ত সেই পার্থক্য ঠিকই বুঝতে পারে।

ডেস্ক রিপোর্ট 
























