হবিগঞ্জে ভয়াবহ গ্যাস সংকটে বন্ধ হয়ে গেছে ছোট-বড় ১৭১টি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের উৎপাদন কার্যক্রম। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে চাহিদার তুলনায় অল্প গ্যাস পেলেও বুধবার থেকে জেলার অধিকাংশ শিল্পকারখানায় সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। এতে এসব প্রতিষ্ঠানে কর্মরত লক্ষাধিক শ্রমিক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী কর্মহীন হয়ে পড়েছেন।
শিল্প উদ্যোক্তারা বলছেন, গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকায় প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ উৎপাদন ক্ষতি হচ্ছে। সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠানগুলো। উৎপাদন বন্ধ থাকায় নির্ধারিত সময়ে বিদেশি ক্রেতাদের কাছে পণ্য পাঠানো নিয়ে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা। ফলে অর্ডার বাতিলের আশঙ্কাও করছেন উদ্যোক্তারা।
হবিগঞ্জের যমুনা ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কে রয়েছে ছয়টি কারখানা। এর মধ্যে টায়ার ও পাওয়ার প্ল্যান্ট ছাড়া চারটি প্রতিষ্ঠানই শতভাগ রপ্তানিমুখী। এসব প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন প্রায় ১২ হাজার শ্রমিক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী।
পার্কটির মহাব্যবস্থাপক প্রকৌশলী আবুল হোসেন জানান, প্রতিদিন ১৩ দশমিক ৬ স্ট্যান্ডার্ড মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের অনুমোদন থাকলেও বেশ কিছুদিন ধরে মাত্র ৩ মিলিয়ন ঘনফুট সরবরাহ করা হচ্ছিল। এতে কোনোভাবে উৎপাদন চালু রাখা হলেও বুধবার রাত ১২টা থেকে গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়।
একই অবস্থা স্টার সিরামিক্সেও। প্রতিষ্ঠানটির প্রশাসন বিভাগের কর্মকর্তা পল্লব জানান, কয়েকদিন ধরে চাহিদার এক-তৃতীয়াংশ থেকে এক-চতুর্থাংশ গ্যাস পাওয়া যাচ্ছিল। বুধবার দুপুর থেকে সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হওয়ায় উৎপাদনও বন্ধ রয়েছে।
এসএম স্পিনিংয়ের মহাব্যবস্থাপক আবুল বাশার জানান, প্রতিষ্ঠানটিতে প্রায় সাড়ে ১৩ হাজার শ্রমিক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী কাজ করেন। বুধবার বিকেল পৌনে ৪টা থেকে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। গ্যাসের অভাবে উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় প্রতিদিন প্রায় ১ লাখ ২১ হাজার ৬০০ ডলার, অর্থাৎ প্রায় দেড় কোটি টাকার ক্ষতি হচ্ছে বলে জানান তিনি।
হবিগঞ্জ ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কের প্রাণ-আরএফএল গ্রুপেও একই পরিস্থিতি। সেখানে প্রায় ৩৫ হাজার শ্রমিক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী রয়েছেন। কয়েকদিন ধরে গ্যাস সংকটের পর বুধবার সন্ধ্যা ৬টা থেকে সরবরাহ একেবারে বন্ধ হয়ে যায়। এতে পার্কটির সব কারখানার উৎপাদন বন্ধ রয়েছে।
স্কয়ার ডেনিমের মহাব্যবস্থাপক আব্দুল মাজেদ জানান, বুধবার বিকেল ৩টা থেকে তাদের কারখানায় গ্যাস সরবরাহ বন্ধ। এতে প্রায় তিন হাজার শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। শতভাগ রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠানটির হাতে বিদেশি ক্রেতাদের অর্ডার রয়েছে। সময়মতো পণ্য পাঠাতে না পারলে আন্তর্জাতিক বাজারে সুনাম ক্ষুণ্ন হওয়ার পাশাপাশি ক্রেতা হারানোর আশঙ্কাও রয়েছে।
শ্রমিক-কর্মচারীরাও দীর্ঘস্থায়ী গ্যাস সংকট নিয়ে উদ্বিগ্ন। তাদের আশঙ্কা, উৎপাদন বন্ধ থাকলে আয়-রোজগার বন্ধ হয়ে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়বে।
এদিকে, কয়েকটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানে গ্যাস সরবরাহ চালু থাকলেও অন্যগুলোতে পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়ায় বৈষম্যের অভিযোগ তুলেছেন উদ্যোক্তারা। তাদের দাবি, গ্যাস সংকট যদি জাতীয় সমস্যা হয়ে থাকে, তাহলে সব শিল্পপ্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে সমান নীতি অনুসরণ করা উচিত।
সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, হবিগঞ্জে ছোট-বড় মিলিয়ে ১৭১টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। এর মধ্যে অর্ধশতাধিক প্রতিষ্ঠান শতভাগ রপ্তানিমুখী। এসব কারখানার একটি বড় অংশ ক্যাপটিভ পাওয়ার প্ল্যান্টের মাধ্যমে নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদন করে। ফলে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হওয়ায় শুধু উৎপাদন নয়, বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনাতেও বড় ধরনের সংকট তৈরি হয়েছে।
জালালাবাদ গ্যাস টি অ্যান্ড ডি সিস্টেম লিমিটেডের উপমহাব্যবস্থাপক মো. রুহুল করিম চৌধুরী জানান, গ্যাস সংকট জাতীয় সমস্যা এবং জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহ থেকেই এ সংকট চলছে। বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে গ্যাসের সরবরাহ বাড়ানোর কারণে শিল্পকারখানায় সরবরাহ কমাতে হয়েছে বলে জানান তিনি। তবে আগামী তিন থেকে চার দিনের মধ্যে পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
তবে উদ্যোক্তারা বলছেন, দ্রুত গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক করা না হলে উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও রপ্তানি—সব খাতেই বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। একই সঙ্গে সব শিল্পপ্রতিষ্ঠানে গ্যাস সরবরাহের ক্ষেত্রে স্বচ্ছ, সমান ও অভিন্ন নীতি অনুসরণের দাবি জানিয়েছেন তারা।

ডেস্ক রিপোর্ট 























