প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির সপ্তাহব্যাপী রাষ্ট্রীয় দাফন ও শোকানুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে নজিরবিহীন নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে ইরান। সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কায় রাজধানী তেহরানজুড়ে জারি করা হয়েছে সর্বোচ্চ সতর্কতা। লাখো মানুষের অংশগ্রহণ এবং বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধি ও বিশিষ্ট অতিথিদের উপস্থিতির কারণে স্থল, আকাশ ও গোয়েন্দা নিরাপত্তা একযোগে জোরদার করা হয়েছে। ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির রাষ্ট্রীয় শেষ বিদায় অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় দিনেও রাজধানী তেহরানের ইমাম খোমেনি গ্র্যান্ড মোসাল্লায় লাখো শোকাহত মানুষের ঢল নেমেছে। তীব্র গরম ও তাপপ্রবাহ সত্ত্বেওিআজ রোববার (৫ জুলাই) ভোর থেকেই নারী, পুরুষ, শিশু ও প্রবীণরা দীর্ঘ সারিতে দাঁড়িয়ে খামেনির মরদেহে শেষ শ্রদ্ধা জানাচ্ছেন।
রাষ্ট্রীয় শোকানুষ্ঠানকে ঘিরে তেহরানজুড়ে আজও কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতে অতিরিক্ত নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে এবং অনুষ্ঠানস্থলে প্রবেশের আগে একাধিক স্তরের নিরাপত্তা তল্লাশির ব্যবস্থা করা হয়েছে। নিরাপত্তার স্বার্থে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় যান চলাচলেও নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়েছে। ইরানি কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, নিরাপত্তা বলয়ের আওতায় রাখা হয়েছে অনুষ্ঠানস্থলের আশপাশের এলাকাও। সম্ভাব্য যেকোনো হুমকি মোকাবিলায় বিশেষ নিরাপত্তা ইউনিট, গোয়েন্দা সংস্থা এবং জরুরি চিকিৎসা দলকে প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
শোকানুষ্ঠান শুরুর আগেই কঠোর বার্তা দিয়েছে ইসলামি রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)। বাহিনীটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে কোনো হামলার চেষ্টা হলে তার জবাব আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে আরও কঠোর হবে এবং সেই প্রতিক্রিয়া প্রতিপক্ষের জন্য স্মরণীয় হয়ে থাকবে। এদিকে ইসরাইলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ সম্প্রতি মন্তব্য করেছেন যে, খামেনির ছেলে মোজতবা খামেনি ভবিষ্যতে সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু হতে পারেন। এই বক্তব্যের পর ইরানের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আরও জোরদার করা হয়েছে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও বিষয়টি নিয়ে মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেছেন, ইরানকে খামেনির দাফন ও শোকানুষ্ঠান সম্পন্ন করার জন্য সাত দিন সময় দেওয়া উচিত। তার এই মন্তব্য আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা সৃষ্টি করেছে। নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, খামেনির শেষ বিদায়ের অনুষ্ঠানে লাখো মানুষের পাশাপাশি বিদেশি প্রতিনিধি, ধর্মীয় নেতা ও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের উপস্থিতি থাকায় এটি সম্ভাব্য হামলার ঝুঁকিপূর্ণ একটি আয়োজন। এমন পরিস্থিতিতে হামলা হলে ব্যাপক প্রাণহানির পাশাপাশি ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
এ কারণে রাজধানী তেহরানের বিভিন্ন এলাকায় নিরাপত্তা টহল বাড়ানো হয়েছে। শোকানুষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ দিনে রাজধানীর আকাশসীমা সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে, যাতে আকাশপথে কোনো ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি না হয়। ইসরাইলের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার সাবেক কর্মকর্তা ড্যানি সিট্রিনোউইটজের মতে, আকাশ ও স্থল উভয় দিক থেকেই সম্ভাব্য হুমকি বিবেচনায় রেখে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করছে তেহরান। এদিকে যুদ্ধের প্রথম দিনেই বাবা ও পরিবারের কয়েকজন সদস্যকে হারানোর পর মোজতবা খামেনি প্রকাশ্যে উপস্থিত হবেন কি না, তা নিয়েও জল্পনা–কল্পনা চলছে। তবে এ বিষয়ে ইরানের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো ঘোষণা দেওয়া হয়নি।
বাহ্যিক হুমকির পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার দিকেও সমান গুরুত্ব দিচ্ছে ইরান। নিরাপত্তা সংস্থাগুলো কুর্দি, আরব ও বেলুচ বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী এবং নির্বাসিত সংগঠন মুজাহিদিন–ই খালক (এমইকে)-এর সম্ভাব্য তৎপরতার ওপর কড়া নজরদারি চালাচ্ছে। এদিকে আইআরজিসির প্রধান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আহমদ ভাহিদিসহ কয়েকজন জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তাকে ইতোমধ্যে প্রকাশ্যে দেখা গেছে। বিশ্লেষকদের ধারণা, সম্ভাব্য ঝুঁকি সম্পর্কে অবগত থাকলেও নিজেদের নিরাপত্তা প্রস্তুতি নিয়ে ইরানি নেতৃত্ব যথেষ্ট আত্মবিশ্বাসী। ফলে সপ্তাহব্যাপী রাষ্ট্রীয় শোকানুষ্ঠান শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করতে সর্বাত্মক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে দেশটি।

ডেস্ক রিপোর্ট 




















