সকালের কোমল আলোয় নানাবাড়ির উঠোনে অন্য শিশুদের সঙ্গে খেলা করছিল প্রাণোচ্ছল তিন বছরের আফিয়া খাতুন। কথায় কথায় জানায়, “বাবা মোদাপপর, বিদেদে…” — আধো আধো উচ্চারণে যেন এক মর্মস্পর্শী বাস্তবতার প্রতিধ্বনি।
আফিয়ার বয়স যখন মাত্র আট মাস, তখনই তার মা মনিরা খাতুনকে তালাক দেন স্বামী মোজাফফর হোসেন। কারণ— আফিয়ার ত্বক দুধসাদা, চুল ও ভ্রু হালকা ঘিয়ে রঙের। এই ভিন্ন রঙের কারণেই সন্তানকে নিজের বলে মানতে চাননি মোজাফফর।
সোমবার (১০ নভেম্বর) যশোর সদর উপজেলার রামনগর ইউনিয়নের বাজুয়াডাঙ্গা পশ্চিমপাড়ায় মনিরার বাবার বাড়িতে গিয়ে জানা যায় এই হৃদয়বিদারক কাহিনি। কৃষিমজুর শহিদ মোল্লার মেয়ে মনিরা এখন বাবার ভাঙা ঘরে ছোট্ট মেয়েকে নিয়ে অনিরাপদ জীবনে দিন কাটাচ্ছেন।
মনিরা বলেন, “আফিয়া জন্মের পর থেকেই স্বামী আমাকে অপবাদ দিতে শুরু করে। বলে, এই সন্তান তার নয়। অনেক বুঝিয়েও পারিনি। শেষে ৮ মাস পর তালাক দিয়ে চলে যায় বিদেশে। তখন থেকে কোনো খোঁজও নেয়নি।”
লোকের বাড়িতে কাজ করে কোনো রকমে মেয়ের মুখে খাবার তুলে দিচ্ছেন তিনি। বাবার সামান্য আয়ে চলে তাদের জীবন। দুই বছর আগে স্থানীয় সালিশে মোজাফফরের বড় ভাই প্রতি মাসে ১,৫০০ টাকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন; কিন্তু আজও একটি টাকাও পাননি মনিরা।
প্রতিবেশীরা বলছেন, মা-মেয়েকে বাঁচিয়ে রাখতে তারা যতটা পারেন সাহায্য করেন। আসমা খাতুন বলেন, “সরকারি সহায়তা পেলে তাদের কষ্ট অনেকটা লাঘব হতো।”
রামনগর ইউনিয়নের প্যানেল চেয়ারম্যান রামপ্রসাদ রায় বলেন, “এমন অমানবিক আচরণ মেনে নেওয়া যায় না। ইউনিয়ন পরিষদ থেকে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় মনিরাকে সহযোগিতা করা হবে।”
চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. গোলাম মোর্তুজা জানিয়েছেন, “আফিয়ার অবস্থা কোনো অভিশাপ নয়। এটি অ্যালবেনিজম, একটি জেনেটিক সমস্যা। এর চিকিৎসা নেই, তবে নিয়মিত সানপ্রটেকশন নিলেই সুস্থভাবে বাঁচা সম্ভব।”
এদিকে অভিযুক্ত মোজাফফরের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। তার ভাই সংক্ষিপ্তভাবে বলেন, “আগে সালিশে সমাধান হয়েছে”— তারপর ফোনের লাইন কেটে দেন।
অন্যদিকে তিন বছরের নিষ্পাপ আফিয়া এখনো জানে না, ত্বকের রঙের জন্যই তাকে ‘বাবাহীন’ হতে হয়েছে— এমন এক সমাজে, যেখানে অন্ধকার এখনো আলোর চেয়ে গভীর।

ডেস্ক রিপোর্ট 
























